নিউইয়র্কে কালচারাল ক্রিয়েশন মেরিল্যান্ডের || সতীদাহ বিরোধী নাটক বহ্নিশিখা মঞ্চস্থ

বাঙালী প্রতিবেদনঃ পৃথিবীতে নারী নির্যাতনের যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট এবং নিষ্ঠুর সামাজিক ব্যবস্থা চালু ছিল অষ্টাদশ শতকের বঙ্গদেশে সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে তার নাম সতীদাহ। অর্থাৎ স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হতো। এই অত্যন্ত অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা নিয়ে সাহসের সাথে দাঁড়িয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়। শত শত বছর ধরে চলে আসা এই নিয়ম বাতিল করার জন্য রাজা রামমোহন রায়ের দূরদশীর্, মানবিক, সাহসী বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের মত একটি আধুনিক চেতনাবাহী ঘটনাকে যুগের মানুষদের কাছে তুলে ধরার উদ্দেশ্য নিয়ে মেরিল্যান্ডের কালচারাল ক্রিয়েশন নিউইয়র্কে মঞ্চস্থ করল নাটক বহ্নিশিখা। সরাসরি রামমোহন রায়ের জীবনীভিত্তিক এই নাটক গত শনিবার মঞ্চস্থ হয় জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে। নাটকটির লেখক অনুতোষ সাহা। তাঁর নির্দেশনায় অনেক বড় কাস্ট নিয়ে নাটকটি সময়ের দর্শকদের হৃদয়ে দাগ কেটেছে বলে জানান অনেক দর্শক।

বহ্নিশিখায় রামমোহনের শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনকাহিনী আসে, আসে সেই সময়ের সমাজ ব্যবস্থা, সমাজ ব্যবস্থার নানা কুসংস্কার এবং কূপমন্ডুকতা। এই সবের বিরুদ্ধে রামমোহনকে লড়াই করতে হয়। নানা প্রতিবন্ধকতা শেষে বৃটিশ শাসকদের সহায়তায় সতীদাহ প্রথা বিলোপের আইন পাশ হয়। এরই মধ্যে রামমোহনের পরিবারের সদস্যদেরও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। মঞ্চে চিতা তৈরি করে সতীদাহ দেখানোর দৃশ্যটি ছিল ভয়ংকর সুন্দর। এছাড়াও নাটকে প্রপস ব্যবহারের পাশাপাশি পশ্চাদপটের মঞ্চের সমান স্ক্রিনে ভিজুয়ালের ব্যবহার, সেই ভিজুয়ালের সাথে ফিজিক্যাল অভিনয়কে একাকার করে দেয়ায় কোনো কোনো দৃশ্য ছিল মনে দাগ কাটার মত। এসব ছাড়া অনুতোষ সাহা নাটকে অন্যান্য থিয়েট্রিকেল ট্রিটমেন্ট সে অর্থে ব্যবহার করতে পারলে ভাল হতো।

এই নাটকের সবচেয়ে দুর্বল দিক অভিনয়। তবে সকলের নয়, অনেকের। তাদের অনেকেই অভিনয়কালে হাত নিয়ে বড় বিড়ম্বনায় ছিলেন বলে মনে হয়েছে। লেখক নাটকটিকে আরো সম্পাদনা করতে পারতেন। এই নাটকের আবহসংগীত কখনো কখনো মনে দাগ কাটলেও উচ্চ নিনাদে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক মেলোড্রামাটিক আবেগ সৃষ্টি করে।

বহ্নিশিখানারী মুক্তির অসামান্য কাহিনী বলে, এবং বাঙালি হিন্দু সমাজে এর ভয়াবহতার আতংক এখনও প্রতিধ্বনি তোলে বলে এমন বিষয় নিয়ে নাটক মঞ্চে আনায় কালচারাল ক্রিয়েশন মেরিল্যান্ড প্রশংসিত হয়েছে। বিষয়বস্তুর কারণে নিউইয়র্কেও প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু যেহেতু নাটক একটি শিল্প, তাই এই দিকটির প্রতিও নজর দিলে ভাল হতো।

রাজা রামমোহন রায় চরিত্রে অভিনয় করেছেন একেএম খায়রুজ্জামান (লিটন), দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চরিত্রে দেবানন্দন বিশ্বাস, কেশব সেন মামা চরিত্রে অনুতোষ সাহা। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেন অত্যন্বী ভট্টাচার্য, নবনীতা নাগ, সঞ্জিত মুখার্জি, হিবার সিলভার, তাহমিনা মল্লিক, মাসুদ হাসান, শুকলা বিশ্বাস, আরিহান ভট্টাচার্য, ঐক্য বড়য়া, অদ্রিকা ভৌমিক সেন, তিলক কর, রঞ্জন গুহ, দেবাশীষ বিশ্বাস, নিরবান সেনগুপ্ত, শুভাঙ্গিনী চক্রবতীর্ রিমা, শুকলা  বিশ্বাস, সৌমিনি চক্রবতীর্, অভীক দাস, সুপ্রিয় পাইন, আদিত্য চক্রবতীর্, অনীক সাহা, অনুরাগ বিশ্বাস লুসি সিলভার।

নাটকে দৃষ্টিনন্দন নৃত্যে অংশ নেন অত্যন্বি ভট্টাচার্য, আনুষ্কা ভট্টাচার্য, ঈশানা মুখার্জি, তৃষা ভট্টাচার্য, আরিয়ানা মুখার্জি চক্রবতীর্, শুভাঙ্গিনী চক্রবতীর্ সৃজনী চক্রবতীর্।

অডিওভিজুয়াল নির্দেশনায় ছিলেন দেবাঞ্জন বিশ্বাস, আলোক নির্দেশনায় অরূপ চক্রবতীর্, কোরিওগ্রাফি শ্রেয়া মুখার্জি ভট্টাচার্য। এই নাটকের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কস্টু্যম। কস্টু্যম ম্যানেজমেন্টে ছিলেন শামীমা খন্দকার (শিমু) রূপা মুখার্জি।

আজকের পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশে নারী সমাজ যে মুক্তির স্বাদ পাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই নারী অধিকার প্রতিষ্ঠিত এবং নারী নির্যাতন অন্যভাবে এলেও সতীদাহ মত সামাজিক সংস্কার থেকে যে বেরিয়ে আসতে পেরেছে তার মূলে ছিল তিনটি ইস্যু, একটি সতীদাহ প্রথা বিলোপ, বিধবা বিবাহ অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নারী শিক্ষার অধিকার উন্মুক্ত হওয়া। এইসবের পিছনে যাদের যা অবদান তাকে ইতিহাসের পাতা থেকে বারবার তুলে আনতে হবে। বহ্নিশিখা নাটকের মধ্য দিয়ে সেই বিষয় তুলে আনার জন্য কালচারাল ক্রিয়েশন মেরিল্যান্ড প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছে।

Related Posts