যুক্তরাষ্ট্র থেকে সোনা সরিয়ে নিচ্ছে ইউরোপীয় দেশ || বিশ^ অর্থনীতিতে নতুন সংকেত
সিএনএন প্রতিবেদনঃ বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে দেখা দিয়েছে সতর্ক সংকেত। এর কেন্দ্রস্থলে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডবাজার। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে জ্বালানি তেল, পেট্রল, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের দাম। এতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বন্ডবাজারে। বাড়ছে সরকারি ঋণের সুদহার। ফলে ভোক্তা, ব্যবসা ও সরকারের জন্য ঋণ নেয়া আরো ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড গত বুধবার প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। এ ইল্ড মূলত যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ঋণ নেয়ার খরচের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ইল্ড যত বাড়ে, সরকারের নতুন ঋণ নেয়ার খরচও তত বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতিতে।
বিশ্লেষক ম্যাট ইগান বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে। একদিকে ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ এরই মধ্যে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে যুদ্ধের অতিরিক্ত ব্যয়। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর বন্ডবাজারেও সুদহার বাড়ছে। জার্মানিতে ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ড সম্প্রতি ২০১১ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্যে ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড ১৯৯৮ সালের পর সর্বোচ্চ হয়েছে। জাপানেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
জাপানে দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ছিল খুবই কম। এখন সেখানে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ১ সেপ্টেম্বর দেশটির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ড ৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ১৯৯৬ সালের পর এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল।
জ্বালানি থেকে মূল্যস্ফীতির চাপ: ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলছে। যুদ্ধ শুরুর সময় মার্কিন কর্মকর্তারা ধারণা দিয়েছিলেন, সংঘাত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে। কিন্তু তা হয়নি। দীর্ঘস্থায়ী এ সংঘাত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহে বাধা তৈরি করছে।
ফলে বিনিয়োগকারীদের জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি ও বন্ডের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে হিসাব কষতে হচ্ছে। যদিও পারস্য উপসাগর থেকে তেলবাহী জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখার বিভিন্ন উদ্যোগ ও চীনের জ্বালানি তেল আমদানি কমানোর মতো পদক্ষেপ ক্ষতির মাত্রা কিছুটা কমিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো বলছে, জ্বালানির বাজারে এর প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি।
যুক্তরাষ্ট্রে গত মাসে গ্যাসোলিনের দাম ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল আগস্ট তৈরি করেছে বলে জানায় আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন বা এএএ। অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ডিজেলের দামও যুদ্ধ শুরুর পর ৫১ শতাংশ বেড়েছে।
ম্যাট ইগান বলছেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, জ্বালানির দাম তত বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়লে বন্ডের ইল্ডও বাড়তে পারে। এতে পরিস্থিতি একটি চক্রের মতো হয়ে উঠছে।
বি রাইলি ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের প্রধান বাজার কৌশলবিদ আর্ট হোগান বলেন, ‘যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার বিশ্বাসযোগ্য কোনো পথ না পাওয়া পর্যন্ত এ পরিস্থিতি একটি বৃত্তাকার সমস্যায় পরিণত হতে পারে।’
এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) দিকে। চলতি মাসের শেষ দিকে ফেডের নীতিনির্ধারণী বৈঠক রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের একাংশ মনে করছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ফেডকে সুদহার বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হতে পারে।
যুদ্ধ মানেই বাড়তি ব্যয়: প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্ডবাজারে চাপ তৈরির আরেকটি বড় কারণ যুদ্ধের ব্যয়। যুদ্ধ পরিচালনা করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। এ অর্থের বড় অংশই সরকারি বাজেটের বাইরে অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে যুক্ত হয়। ফলে সরকারকে আরো বেশি ঋণ নিতে হয়।
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয় বেড়েছে। এর অর্থ হলো সরকারের ঋণের প্রয়োজনও বাড়ছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বের অন্যান্য বড় অর্থনীতিও প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেন সোনা সরিয়ে নিচ্ছে
এদিকে নিউজউইক জানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে রাখা সোনা সরিয়ে নিচ্ছে নেদারল্যান্ডস। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, নিউইয়র্ক ও কানাডায় থাকা ৮৬ টন সোনা লন্ডনে নেওয়া হচ্ছে। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধির কারণেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডি নেদারল্যান্ডসে ব্যাংক (ডিএনবি) বলছে, সোনার মজুত উত্তর আমেরিকা, যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডসে ভাগ করে রাখলে ঝুঁকি কমবে। পাশাপাশি কোনো সংকট দেখা দিলে সোনা দ্রুত কাজে লাগানোও সহজ হবে।
ডিএনবি বলেছে, লন্ডনে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে রাখা সোনাকে আধুনিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। ফলে এটি বিশ্বের সবচেয়ে সহজে লেনদেনযোগ্য সোনা হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই সংকটের সময় ডিএনবির জন্য এই সোনা সবচেয়ে দ্রুত ব্যবহারযোগ্য হবে।
এই স্থানান্তরের আগে নেদারল্যান্ডসের মোট সোনার মজুতের ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল নিউইয়র্কে এবং ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল কানাডার অটোয়ায়। স্থানান্তরের পর নিউইয়র্ক ও অটোয়া—দুই জায়গাতেই নেদারল্যান্ডসের সোনার ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ করে থাকবে। অন্যদিকে লন্ডনে থাকা সোনার অংশ ১৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ হবে। বাকি ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ সোনার মজুত থাকবে নেদারল্যান্ডসে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সোনা সরিয়ে নেওয়া ইউরোপীয় দেশগুলোর তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে নেদারল্যান্ডস। এর আগে জানুয়ারিতে একই ধরনের পদক্ষেপ নেয় ফ্রান্স।
ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক দ্য ফ্রান্স গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জানুয়ারির মধ্যে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা ১২৯ টন সোনা বিক্রি করে দেয়। এই পরিমাণ ছিল দেশটির মোট সোনার মজুতের প্রায় ৫ শতাংশ।
সোনা বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে ব্যাংকটি ইউরোপে সমপরিমাণ নতুন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণকারী সোনা কেনে। এসব সোনা এখন প্যারিসে ফ্রান্সের অন্যান্য মজুতের সঙ্গে রাখা হয়েছে। ফ্রান্সের মোট সোনার মজুতের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৪৩৭ টন।
অবশ্য ইউরোপীয় দেশগুলোর সোনা দেশে ফিরিয়ে আনার ঘটনা একেবারে নতুন নয়। ২০১৭ সালের গ্রীষ্মে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বুন্দেসব্যাংক নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে ৩০০ টন সোনা ফ্রাঙ্কফুর্টে ফিরিয়ে নেয়।
জার্মান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনার অংশ ছিল, দেশের অধিকাংশ সোনার মজুত জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের ভল্টে রাখা। এরপরও তাদের মোট সোনার মজুতের ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রয়ে যায়। অন্যদিকে ফ্রান্সের ব্যাংক দ্য ফ্রান্সে রাখা জার্মানির ৩৭৪ টন সোনার পুরোটাই দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
গত বছর বাণিজ্যিক উত্তেজনা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়কার মার্কিন মুদ্রানীতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রাখা সোনা দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য নিজ নিজ দেশে চাপ বাড়লেও জার্মানি ও ইতালি সেই চাপের কাছে নতিস্বীকার করেনি। নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের ভল্টে এই দুই দেশের প্রায় ২৪৫ বিলিয়ন ডলারের সোনা রয়েছে।
জার্মানি ও ইতালি বিশ্বের যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৃহত্তম সোনার মজুতধারী দেশ। দেশ দুটির সোনার মজুত যথাক্রমে ৩ হাজার ৩৫২ টন এবং ২ হাজার ৪৫২ টন। ইতালির মোট সোনার প্রায় এক—তৃতীয়াংশ নিউইয়র্কে রাখা আছে। সবচেয়ে বেশি সোনার মজুত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের, ৮ হাজার ১৩৩ টন।
