ফেরদৌস সাজেদীনের হৃদ—গদ্য || ছড়িয়ে রই
লিনিং টাওয়ার অব পিজা ও সিয়েস্তা
কান থেকে পিজা চার পাঁচ ঘন্টার পথ, ইতালিয়ান রিভিয়েরার হাইওয়ে ধরে পিজা পৌঁছাই মধ্যরাতে। পথে যেমন পেয়েছি ঘুটঘুটে অন্ধকার, পিজা শহরে ঢুকে দেখি আলো এখানেও অনুপস্থিত, যেন শহরটা হারিকেনের সলতে নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন এই শহরে এসে আমাদের মনের সলতেটাও দপ করে নিভে গেল। ইউরোপের একটি পর্যটন—প্রিয় শহর রাত বারোটায় শেষ দম ছেড়ে দিয়ে মৃত হয়ে আছে, এটা আগেভাগে কল্পনাও করি নাই। আগে থেকে হোটেল নেয়া হয় নাই, কোথায় যাই! গলির মত একটা রাস্তায় ঢুকে দেখি, একটা বাড়িতে টিম টিম আলো জ্বলছে। বাড়ির সামনে গিয়ে গাড়ি থামাই। স্ত্রীকে বলি, ‘তোমরা গাড়িতেই থাক, দেখি কাউকে পাই কিনা’। বাড়ির সামনে একটি লম্বা—চওড়া বারান্দা। মাঝখানে একটি বড় দরোজা। দরোজার ঠিক ওপরে একটি সাইনবোর্ড দেখে বুঝতে পারি এই বাড়িটা আসলে একটি হোটেল। দরোজা ঠেলে ভেতরে ঢুকি।
দেখি, কেউ একজন কাউন্টারের ওপাশে চেয়ারে বসে ঝিমুচ্ছে। তার চোখ মুখ দেখে মনে হল এখন কেউ আসবে এটা সে প্রত্যাশা করেনি। ঘরের ভেতরেও আলো কম। হাইওয়ে থেকে বের হয়ে টোল দেয়ার পর থেকেই এই শহরে একটা অসামাজিক অন্ধকার তাঁর আয়ু নিয়ে আপাতত নিশ্চিন্ত; হঠাৎ করে আঁধারটা মরে যাবে না। এরমধ্যে লোকটি বলছে, একঘরে দুটো ‘বেড’র রুম নেই, তিনজনের জন্য দুটো সিঙ্গেল বেডের রুম নিতে হবে। পিজায় আগমনের পর থেকে সব সিচুয়েশন নর্মাল ঠেকছে না। একটা অতিলৌকিক ব্যাপার স্যাপারের গন্ধ পাচ্ছি। শরীর অবসন্ন, আরেকটা হোটেল পাব কী পাব না এই অন্ধকারে, সে নিশ্চয়তা নেই আর তার কৌশলও জানি না। এই ‘অবস্কিউর শহরে’ মধ্যরাতে কোথায় যাব! হোটেলের দুই ঘরের দুই চাবি নিয়ে গাড়িতে ফিরে আসি। স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, ‘এটা হোটেল? বোঝাই যায় না। আর সব অন্ধকার অন্ধকার কেন?’ কিছু কিছু প্রশ্ন আছে যার উত্তর প্রশ্নকারীও আশা করে না। যা তুমি দেখছ তা—ই উত্তর। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে স্ত্রী বলল, ভূতুরে!
ভূত ভূত পরিবেশ আরো ঘন ও ঘনিষ্ঠ হল যখন দেখি ঘরের জানালা খোলা। প্রায় সিলিং থেকে কাঠের একটি সলিড পাল্লা কোমর—উঁচুতে নামা, জানালায় কোন শিক নেই। জানালার পাল্লাটি নিচ থেকে বাইরে হাত খানেক ঠেলে দিয়ে একটা রড দিয়ে আংটায় ঠেকিয়ে রাখা। আংটা থেকে রডটি খুলে জানালার লম্বা পাল্লা ভেতরের দিকে টেনে আনতে গিয়ে দেখি, আংটা থেকে রড আলগা করতে পারছিনা। শক্তি প্রয়োগ করেও জানালা বন্ধ করতে পারছি না। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে বলি, ‘দোতালায় জানালা দিয়ে কেউ আসবেনা। শুয়ে পড় তোমরা।’ বলে আমি পাশের রুমে যেতে উদ্যত হই। স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় যাচ্ছ?’ বলি ‘পাশের রুমে, বিছানায় তিনজনের জায়গা হবে না।’ স্ত্রী বলল, ‘পাগল, আমি একা এখানে থাকব না, অন্ধকার, তারপর জানালা খোলা। আমার ভয় করছে।’ অগত্যা গুটিশুটি হয়ে সকালের অপেক্ষা করি।
সকালেই ঘুম ভেঙে যায়। ওইভাবে এক—কাতে কী ঘুমুনো যায়! ঘরের ভেতর থেকে বাইরে মানুষের শব্দ পাচ্ছি। ভূতগুলো জেগে উঠেছে!! পেট আমাদের চোঁ চোঁ করছে। নটার দিকে নিচে নেমে আসি। কাউন্টার—ঘরে রোদের রেখা এসেছে, অন্ধকার ভাবটা অনেকটাই তিরোহিত। আমরা যে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এসেছি তার বাঁদিকের খোলা দরোজা দিয়ে দেখি ভেতরে লোকজন আহার করছে। আমাদের ব্রেকফাস্টের জন্য আর বাইরে গিয়ে রেস্টুরেন্ট খুঁজতে হলনা। খাবার ঘরটির প্রায় টেবিলেই লোকজন। রাতের বেলায় একটুও যদি টের পাওয়া যেত লোকজনে ঠাঁসা ছিল রাতের হোটেল—বাড়িটি! অকারণ সর্বাঙ্গীন ভূতুড়ে ভয়! তবে শহরটা এত তাড়াতাড়ি রাত না পড়তেই অন্ধকার নিয়ে মেতে ওঠে, কুছ তো হ্যাঁয়।
গাড়িতে নৈশ যাপনের জিনিশপত্তর রেখে গলির মুখে গিয়ে দেখি অন্য জগৎ। ঝক ঝক করছে রোদ। টুরিস্টরা রাস্তা দিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। অনতি দূরেই দেখি, ‘লিনিং টাওয়ার অব পিজা’, চিনতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলনা আমাদের, একটি লম্বা টাওয়ার মাঠের মধ্যখানে হেলে আছে। সবুজ ঘাসের প্রাঙ্গন। টাওয়ারের ভিতের চারপাশে গোল করে ‘কাবলস্টোন’ দিয়ে পাকা করা। টাওয়ারের গোড়ায় চেইন দিয়ে চারপাশ মোড়া। লোকজন একে একে জড়ো হচ্ছে, যেমন আমরা হয়েছি। অবাক হয়ে ভাবছি, এই টাওয়ারটি এরকম সাপোর্ট ছাড়া একদিকে হেলান দিয়ে আছে যূগ যূগ ধরে, কেমন করে! ১১৭৩ সালে ইঞ্জিনিয়াররা, আমাদের পৃথিবীর ভবিষ্যতের শত শত বছরের জন্য, এই অভাবনীয় ‘আর্কিটেকচারাল মিস্টেক’ কেমন করে, ভুল করে হলেও, করতে পারল? নির্মাণকালের শুরুতেই এই জাজ্বল্যমান ভুল; অনুপযোগী মাটি, ভারি ভারি পাথরের স্তুপ আর অগভীর ভিত্তির ওপর স্থাপিত এই টাওয়ারটি এখনো হেলানো অবস্থায় টিকে আছে, টিকে থেকে টানছে হাজার হাজার টুরিস্ট পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে, আমাদের ভেবে ভেবে হয়রান না হয়ে উপায় নেই। রহস্যটা কি? টাওয়ারের সামনেই দেখি, সবুজ লনের ওপাশে ‘দুওমো দি পিজা’, মানে ‘পিজা ক্যাথেড্রাল’। চার্চটির নির্মাণ শুরু হয় ১০৬৪ সালে আর সমাপ্ত হয় ১০৯২ সালে। মধ্যযুগীয় এই প্রকৃত ‘রোমেনেক আর্কিটেকচার’ নির্মিতির দিকে আমরা অবাক ও মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রই। রাতের অন্ধকারের প্রকোপে যে অতিপ্রাকৃতপীড়ন সারা পিজা শহরটিকে বেস্টন করে অযথা আমাদের মন খারাপ করে দিয়েছে, এখন এই ভেবে হাসি পাচ্ছে। দিনের স্পষ্ট আলো, কিন্তু, এখন কী মোহিত—আলোর মতই না লাগছে। চার্চ থেকে বেরিয়ে পিজার লনের ধারে রাস্তার পাশে দেখি, অনেকগুলো সুভেনিয়রের দোকানপাট। ভিড় করে আছে সেসবে ক্রেতারা। একটি জিনিস প্রায় সবাই কিনছে, ‘লিনিং টাওয়ারের রেপ্লিকা’, মনে করিয়ে দিতে, আমি এসেছিলাম এই জায়গায়, দেখেছি এই বিস্ময়!
দুপুরের একটু পরে আমরা আবার ইতালিয়ান হাইওয়েতে গাড়ি নিয়ে ছুটতে থাকি। এবার লক্ষ্য রোম। ঘন্টা চার, সাড়ে চারেকের পথ। কিছুক্ষণ পরেই একটা বড় শহর আসে, পোর্ট শহর ‘লিবর্নো’; থামিনি। এখানে অনেক কিছু দেখার আছে, এমনিতেই এখানকার সমুদ্র—ঘেঁষা অঞ্চলগুলো নয়নে—মনে ব্যাকুল—আকুল—আগ্রহ উপুড় করে ঢেলে দেয়, তবুও, থামব থামব করেও থামিনি। সন্ধ্যার আগেই পেঁৗছতে চাই রোমে, ইতিহাস সেখানে তার ‘সমগ্র’ নিয়ে অচিন্ত্য হয়ে আছে। একটু পরেই ধীরে ধীরে সেসব উন্মোচিত হবে আমাদের চক্ষুসম্মুখে, এই ভাবনায় অধীর হয়ে আছি।
তখন অপরাহ্ন। আমাদের খিদে পেয়েছে। গাড়িতেও পেট্রোল নিতে হবে। ‘গ্রসেতো’ নামের এক শহরে হাইওয়ে থেকে বের হই। রোমের প্রায় উপকন্ঠেই, রোমে যেতে বড়জোর ঘন্টা দুয়েকের পথ বাকি। এতক্ষণ পরে সৈকত—সড়ক থেকে একটু ভেতরের দিকে ঢুকি। হাইওয়ে থেকে বের হয়ে গাড়ির জানালা খুলে দেই। বাতাসের সঙ্গে একটা ঝাপ্টা পাই চোখে মুখে, বেশ আরাম লাগল। একটা চেনা সুবাস, অলিভের। অনুভব করি, এই সমুদ্র, এই বাতাস, এই নির্মলতা, জলপাই সুবাসে আত্মহারা এই ভূখন্ড, কী উদার—মাধুর্যই না এখানকার মানুষের জীবনকে উপহার দিচ্ছে!
কিন্তু, একী! শহরে ঢুকে দেখি সমস্ত শহর বন্ধ। রাস্তাঘাট ফাঁকা, লোকজন নেই, দোকানপাটের ঝাঁপ টানা। যেন শহরটা চোখ বুজে আছে। একটি গ্যাস স্টেশন চোখে পড়ল। বন্ধ। গাড়িতে তেলের কাঁটা সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আরেকটা গ্যাস স্টেশনে যাই, সেটিও বন্ধ। পরেরটাও বন্ধ। মহা বিপদ। একটা দোকানও খোলা না! মৃত নগরীর সকল লক্ষণ স্পষ্ট। উপায়!
এলোপাথারিভাবে একটি রেস্তোরাঁ বা কিছু একটা খেতে পারব এইরকম দোকান খুঁজছি। ‘পেট্রোল পাম্প’ পাচ্ছি, কিন্তু বন্ধ। একসময় একটা গলিতে ঢুকে পড়ি। যেন আমাদের মফস্বলের একটি পাড়ার গলি। দেখি কএকজন লোক একটি দোকানের সামনের রোয়াকে বসে আছে। দোকানটি খোলা। ধড়ে প্রাণ এল। ভেতরে গিয়ে বুঝতে পারি এটি একটি মুদির দোকান। দোকানদার লোকটি আমাকে খুব আন্তরিকভাবে বলল, ‘বুয়োর্দির্নো সিনি—ওর’। ইতালি ভাষায় আমার নলেজ গোল্লা। তবুও ভাসা ভাসা আন্দাজ করেছি, হেসে কেবল একটু মাথা নাড়াই। পরে জেনেছি শব্দ দুটির মানে হচ্ছে, ‘শুভ দুপুর মিস্টার’ বা এই জাতীয় কোন সম্বোধন। একটি কাচের শো কেসে কিছু খাবার দেখি। বেশি কিছু না, একটি কেক জাতীয় কিছু, কয়েকটি রুটি, আমাদের বন্ রুটির মত, কয়েকটি মাফিন জাতীয় কিছু— এই—ই। কাউন্টারের উপরে রশিতে ঝুলে আছে কয়েকটি পাকা কলা। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করি, ‘আর কিছু নেই লাঞ্চের জন্য?’ উত্তর দিল, ‘এখানে নেই, তবে ঘন্টা খানেক পরে পাশের রেস্টুরেন্টটি খুলবে। জিজ্ঞেস করি, ‘তোমাদের কোনো ছুটি টুটি চলছে? সব বন্ধ?’ ভাঙা ইংরেজিতে বলল, ‘ছুটি না ‘রিপসো’ চলছে’। পরে বুঝি, এদের মধ্যদিনের কএকঘন্টার অবসর চলছে। যেমন স্পেনের ‘সিয়েস্তা’। দুপুরে এরা সব দোকানপাট বন্ধ করে, খেয়ে—দেয়ে একটু দিবানিদ্রা দিয়ে, বিকালে আবার ফিরে এসে দোকানপাটের ঝাঁপ খোলে। জীবন যাপনের জন্য মহা আরামদায়ক ব্যবস্থা। এরা জীবনকে আদর দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে বাঁচে! ‘ছুট্ ছুট্’ আরো জলদি ‘ছুট’—এর আমাদের দেশে এই ব্যবস্থা অকল্পনীয়। আমেরিকায় এই লম্বা অবসর নেই, সবাই আমরা দৌড়ের ওপর থাকি; এই ছুটে চলাতেই আমরা অভ্যস্ত। আগে শুনেছি এই দেশের এই সংস্কৃতির কথা; আজ দেখি এই প্রথম, পরিস্থিতির শিকারও হই প্রথম।
জুলাই—শেষের পড়ন্ত—দিনের সাতটার মত হবে। সূর্যের আলো তখনও পৌরহিত্য করছে আমার রোমের প্রবেশ পথে। আমার স্ত্রীর কাজিন ফোনে বলে রেখেছে আমি যেন ‘রোমা টার্মিনি’ স্টেশনে যাই। অল্প কিছুক্ষণ পরেই স্টেশনের বাইরের রাস্তার ধারে তাকে দেখি। তপন, আমার স্ত্রীর ভাই, আমাকে জড়িয়ে ধরে এবং প্রায় একইসঙ্গে আমার ছেলেকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিয়ে বলল, ‘মামা টায়ার্ড?’ স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপা শেষ পর্যন্ত আসলেন?’ এত উষ্ণ কন্ঠ কবে শেষ শুনেছি! গাড়ি কিছুক্ষণ এগুতেই তপন বলল, ‘দুলাভাই, এটা ‘পিয়াজজা ভেনিজিয়া’, অইযে ব্যালকনিটা দেখছেন, এখানে মুসোলিনি তার ভাষণ দিয়েছে।’
আমি জানি, ইতিহাসের পৃষ্ঠা খোলার প্রণয়নে এই শহরে এসেছি। তবে, এত তাড়াতাড়ি, রোমে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে এটা শুরু হয়ে যাবে ভাবিনি। অফিস থেকে বাড়ি ফেরতা মানুষ আর গাড়ির ভিড় বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে এগুচ্ছি আর ভাবছি, রোমে ইতিহাস তো ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়ে আছেই, অড্রে হেপবার্ন আর গ্রেগরি পেকের ‘রোমান হলিডে’ও এখানেই নির্মিত হয়েছে, মুভিটিতে অনবদ্যভাবে চিত্রিত হয়েছে এই নগরী। রোমে আমার কতকিছু দেখার অপেক্ষা! এই শহরে একদিন আসব বলে কত স্বপ্নই না রঙিন করে ধরে রেখেছি আজ অবধি।
চোখের সামনে দেখছি নতুনের ফাঁকে ফাঁকে পুরনো ইতিহাস জীবন্ত হয়ে আছে। মনে হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই উদয় হল, সত্যিই রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজিয়েছে? নাকি বাজায়নি? সম্রাটরা সব পারে। তাই বলে, এটা কেউ পারে? মিথ?
কে জানে! তপনকে জিজ্ঞেস করি, বাড়ি আর কতদূর? (চলবে)
জুলাই ২৭, ২০২৬
লং আইল্যান্ড, নিউইয়র্ক
