ফেরদৌস সাজেদীনের হৃদ—গদ্য ছড়িয়ে রই
জুরিখ হয়ে অবশেষে
আমরা সুইজারল্যান্ডের জুরিখ সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশনের মেইন হলরুমে ঢুকে দেখি লোকে—লোকারণ্য। চারিদিকে একধরনের ফেস্টিভ ফেস্টিভ মুড। হলরুম জুড়ে অজস্র বেলুন, লোকজনের গায়ে রং—বেরঙের জামাকাপড়। ভিড় ঠেলে একটু একটু করে সামনের দিকে যাই। দেখি একটি সার্কেলের মত জায়গায় সার্কাস হচ্ছে। আমরা বেশ মজা পাই।
স্টেশনটি জুরিখের প্রাণকেন্দ্রে। মিলান থেকে সুইজারল্যান্ডের এই রাজধানী শহরে ঢুকে প্রথমেই ‘লিমাথ’ নদীর তীরে পৌঁছই। তখনও আমাদের ফেলে আসা পথের সৌন্দর্যের ঘোর কাটেনি। প্রকৃতির মোহে আমি আগেও পড়েছি, কিন্তু এইমাত্র আল্পসের পাশ দিয়ে আসতে আসতে প্রকৃতির যে শাসন চলছে আমাদের নয়নের গহীনে, এর থেকে মনপ্রাণ এখনও মুক্তির অবসর পায়নি; এরই মধ্যে আবার লিমাথ নদীর দেখা পাই জুরিখে এসে, আর সহসাই এই নদীর বহমান স্বচ্ছ জলের ওপর আমাদের দৃষ্টি এক অবর্ণনীয় আসক্তিতে আটকে গেল। লিমাথ এসেছে জুরিখের ‘লেক জুরিখ’ থেকে; জুরিখের বুক চিরে বিসর্জিত হয়েছে ‘আর্য়া’ নদীতে। সময় ফুরুচ্ছে, আমরা গাড়িতে উঠি। তারপর এখন এই বিখ্যাত স্টেশনের হলরুমে আর অপ্রত্যাশিতভাবে এই চলমান সার্কাসের সুযোগ—সারিতে।
দেখি, একজন শক্ত সামর্থ পুরুষের দুই কাঁধে একটি চেয়ারের দুই পা, চেয়ারটির ওপর বসে আছে একটি সুন্দরী তরুণী, তারপর যা ঘটছে তা আমরা হা করে দেখছি, সেই একটি চেয়ারের ওপর আরেকটি চেয়ারের দুপা রাখছে মেয়েটি, তারপর আরেকটি চেয়ার রাখছে, সে—ও চেয়ার বেয়ে ওপরে উঠছে। তারপর আরেকটি চেয়ার, এই করে করে কয়টি চেয়ার হবে, গুনে গুনে বুঝি শেষ হবে না; সিলিং অনেক উঁচুতে, দেখি, সিলিং—এ গিয়ে প্রায় মাথা ঠেকেছে চেয়ারে বসা মেয়েটির, আমরা এই ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট দেখে বিস্মিত। মাত্র একজন লোকের কাঁধের ওপর সমস্ত ভর! আমাদের ছেলের দুই চোখের বিস্ময় বড়ই বিশিষ্ট বিস্ময়; অমন জিনিশ হতে পারে, সে কেন, আমাদেরও বিশ্বাস হয়না!
জুরিখে আমি এর আগে এসেছি দুবার। কর্মসূত্রে, এয়ারপোর্ট থেকে ঘন্টা দেড়েক দূরের শহরে। এর মধ্যে একটি আবার পড়েছে জার্মানিতে। হোটেলে থেকেছি সুইজারল্যান্ডের ‘লেনযবার্গ’ (জার্মান উচ্চারণ— লেন্টস—বুর্গ্) শহরে, কিন্তু কাজে গিয়েছি দশ মিনিটের দূরের শহর, জার্মানির ‘ডটিকন’ শহরে। তারপর ডটিকনের কাজ শেষ করে দুদিন পরে গিয়েছি সুইজারল্যান্ডের আরেক শহর ‘শাফহাউজেন’—এ। সুইজারল্যান্ডের জাতীয় ভাষা চারটি। জার্মান, ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান আর রোমানচ। আমাদের জন্য এইসব ভাষার শব্দ বেশ শক্ত মনে হয়। শাফহাউজেন বাংলায় যত অক্ষর ইংরেজিতে লিখতে গেলে লাগে তার দ্বিগুণ অক্ষর। শাফহাওজেন, লেনযবার্গ থেকে মাত্র পনের মিনিটের ড্রাইভ আর জুরিখ এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি ঘন্টা খানেকের পথ। প্রথমবার যখন এয়ারপোর্ট থেকে লেনযবার্গ যাই, ট্যাক্সিতে কিছুক্ষণ যেতেই দেখি হাইওয়ে উঁচুতে উঠে মেঘের ভেতর ঢুকে গেছে। আমাদের ট্যাক্সি সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। ট্যাক্সিতে বসে ভাবছি, আমিও বিলীন হব মেঘের ভেতর; সেই মেঘ, যে মেঘ বৃষ্টি দেয় না, কেবল ভেসে বেড়ায়, শাদা, খন্ড খন্ড, তুলোর মত আর এই আশু সম্ভাবনায় আমি চাতকের মত তৃষিত হই। শেষবার এরকম হ্যাংলা চাতক হই দার্জিলিং গিয়ে। ‘ঘুম’ স্টেশনের ধারে কাছেই শুরু হয়, মেঘ মেঘ খেলা; গাড়ির কাচ নামিয়ে মেঘ ছুঁতে যাই, কিন্তু না, ছোঁব কী, অনুভব করি ‘মেঘ’—এর ভেতরেই তো আছি; আবার পরক্ষণেই মনে হয় ‘মেঘ’—এর ভেতরে নেই, মেঘ কিছুতেই ধরা দেয় না। খেলা নয় তো কী!
কী বলতে কী বলছি! কী করি, আমার চৈতন্য যে এই মুহূর্তের পুরোহিত হয়ে আছে।
এরপর আমরা যাই জুরিখ শহরের সম্ভবত সবচে’ বিখ্যাত সড়ক, ‘বানহোবস্ট্রাটা’য় যেখানে গাড়ি চালানোর অনুমতি নেই। রাস্তার দুপাশে বিখ্যাত ও সুন্দর সুন্দর দোকানপাট, সড়কে চলছে ধীর গতিতে ট্রাম, রাস্তার দুপাশে মানুষের পদচারণা। মাইল খানেক রাস্তায় ‘সপিং—খনি’। আমার হাতের আঙ্গুলে আমার ছেলের হাত—ধরা। সে মজা পাচ্ছে না এখানে, আমার আঙ্গুল টানছে আর বলছে ‘আর কতদূর হাঁটব বাবা? পা ব্যথা করছে’। আমার মাথায় তখন খেলা করছে অন্য কিছু। সন্ধ্যা—উত্তর আলোতে রাত্রির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আমি বলি, ‘খিদে পেয়েছে’। আমার স্ত্রীও বলল, ‘আমারও’। আমি বলি, ‘চল, গাড়িতে চল’। স্ত্রী অবাক, বলল, ‘গাড়িতে কেন? এখানে রেস্টুরেন্ট নেই?’ আমার মতলব অন্য, ‘বলি, আহা চলই না, এইত কিছুক্ষণের পথ!’ রহস্যটা রেখে দেই।
ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই লেনযবার্গে পৌঁছুব। আমার জন্য স্মৃতির পথে ফেরা। আগেরবার আমি যে হোটেলটায় ছিলাম, তার গা—ঘেঁষা একটি রেস্টুরেন্টে এক দুপুরে লাঞ্চ করেছি। ভারি সুন্দর এই ছোট্ট শহরটি। হোটেলের সামনের সরু সড়কের একটু দূরেই একটি চার্চ, চারদিক শুনশান, কিন্তু আশ্চর্য রকম ভাবে সরব শহরটির সৌন্দর্য! রাস্তার ধারে সারবেঁধে একেকটি বাড়ি, প্রায়—অর্ধ—চাঁদের—আকারের মত তিনতলা অবধি উঠে গেছে; প্রত্যেকটি জানালায় টবে টবে ফুটে আছে নানা রঙের ফুল, পরিপাটি সব; মাঝে মাঝে শান্ত—সৌম্য—ভেসে—আসা চার্চের একটি কী দুটি ঘন্টা—ধ্বনিঃ ঢং ঢং; আমি সুইজারল্যান্ডের এই ছোট্ট বসতি—শহরটির মায়ায় সেবার মজে যাই। সেই মায়ার টানে আজ আমার আপনজনদের নিয়ে এসেছি আবার এই শহরে। কিন্তু এই রাতে, প্রায় গ্রামের মত এই শহরে, আমার একদার দেখা ও অনুভবের সৌন্দর্যের ছিটেফোঁটা কী এদের দেখাতে পারব? জানি না। রেস্টুরেন্টটির খুব কাছেই একটি ক্যাসেল আছে, এই নিশুতিতে তাও দেখা হবে না! আমি রক্ষা পেতে পারি এত দূরে এসে, কেবল একটিমাত্র ভরসায়!, আর তা হল আমার সেইবারের লাঞ্চ! সে উপলক্ষেই যদি উতরে যেতে পারি!
রাস্তা পর্যন্ত টানা ক্যানোপি রেস্তোরাঁর সামনে। ইউরোপে যেমনটি হয়। এরা খোলামেলা জায়গায় খেতে খেতে, গল্পে গল্পে আহার করতে ভালোবাসে। তবে এখানে ক্যানোপির নিচে চারপাশ ঘেরা। আমরা রেস্তোরাঁয় ঢুকে দেখি গমগম করছে লোকজনে। একটি টেবিল পেয়ে যাই। চেয়ারে বসতে না বসতেই আমার স্ত্রী বলল, ‘ডিনারের জন্য এদ্দুর এলে?’ আমি বলি, ‘এদের খাবারের তারিফ না করে পারবে না’। আমরা ওয়েটারের জন্য অপেক্ষা করছি, এই ফাঁকে স্ত্রীকে বলি এই শহরের কথা, পাশের হোটেলের কথা, হোটেলের যে রেলিং থেকে আমি শাদা নিঃসঙ্গ গির্জার ঘন্টা শুনে তন্ময় হয়েছি, সেসব কথা। বলি, কত শত ফুল দেখেছি জানালার টবে টবে ফুটে আছে, সেসব কথা। তুচ্ছ, হয়ত অতি তুচ্ছ, কিন্তু, এইসব তুচ্ছতাই একদিন আমার অন্তরে এই শহরের নিত্যদিনের নির্জনতার মহোৎসবটি উপহার দিয়েছে, এই অনুভবটি প্রকাশ করি।
একটু পরেই খাবার এল। আমাদের ছেলের চোখে ঘুম অনতিদূর। বেচারা, বাবা মায়ের সাথে সাথে সেও কখন থেকে ঘুরছে। আমাদের দুজনের প্লেটে একই খাবার, ‘গ্রিল্ড স্যামন অ্যান্ড পীচেস’ আর ছেলের পাতে হ্যাম্বার্গার ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাইজ। স্যামনে কামড় দিয়ে আমার স্ত্রী বলল ‘এই জন্য এতদূর?’ আমি পালটা জিজ্ঞেস করি, ‘কেমন লাগল’? স্ত্রী বলল, ‘এত স্বাদের স্যামন আর খাইনি। দারুণ’। আমি বলি, ‘এর কারণ কী জান?’ দুজনেই একসঙ্গে বলি ‘পীচ’। স্ত্রী যোগ করে, ‘ফ্রুটি, কিন্তু পারফেক্ট’। আমি বলি, ‘আমি অনেক জায়গায় মেনুতে দেখলেই এটা অর্ডার দেই, কিন্তু, এমন স্বাদের হয় না। এদেরটা তুলনাহীন। এখন বুঝতে পারছ কেন এদ্দুর এসেছি! কিন্তু আফসোস রয়ে গেল, তুমি দিনের বেলার লেনয্বার্গ দেখতে পারলে না’।
রেস্তোরাঁয় বসে বসে প্ল্যান করছি, আজ জুরিখেই থাকব না চলে যাব। ইউরোপে আমাদের দিন ফুরিয়ে এসেছে। মাত্র আর দুটো দিন। কী করি কী করি! মাত্র দুইদিন, তারপর যে পথে ইউরোপে ঢুকেছি সেই পথেই ফিরে যেতে হবে, ‘ক্যালে’তে গিয়ে ফেরি ধরে লন্ডন। ফেরির রিটার্ন টিকিট, দিন তারিখ ও সময়সহ কাটা রয়েছে। স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করি, ‘পারবে সারারাত গাড়িতে থাকতে’? উত্তর শুনি, ‘গাড়ি চালাবে তুমি!’
পরেরদিন, দূর থেকে দেখি ‘আইফেল টাওয়ার’। রেস্ট এরিয়ায় থেমে থেমে, সারারাত ড্রাইভ করে প্যারিসের সকালের আলো ফুটতে দেখি। (চলবে)
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
লং আইল্যান্ড, নিউ ইয়র্ক
