উন্নয়নশীল বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—২০ || ড. আনিস রহমান  পেনসিলভেনিয়া

ঈযধঢ়ঃবৎ : উন্নত মেটেরিয়াল সায়েন্স আণবিক বিজ্ঞান

সবুজ রসায়ন: জৈব বর্জ্য থেকে শিল্পপণ্য তৈরির রাসায়নিক সিমুলেশন

সবুজ রসায়ন বা গ্রিন কেমিস্ট্রি হলো এমন একটি বৈজ্ঞানিক দর্শন (ংপরবহঃরভরপ ারংরড়হ) যা রাসায়নিক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশগত প্রভাব সর্বনিম্ন রাখার চেষ্টা করে। বর্তমান বিশ্বে শিল্পের বর্জ্য একটি বিশাল সমস্যা, কিন্তু এআইএর মাধ্যমে এখন এই বর্জ্যকে উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্যে রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় বর্জ্য ভ্যালোরিজেশন বা আপসাইক্লিং।

সবুজ রসায়নে এআইএর সবচেয়ে বড় অবদান হলো সিনথেটিক পাথওয়ে ডিজাইন বা রাসায়নিক সংশ্লেষণ পথের নকশা করা। আইবিএম আরএক্সএন (ওইগ জঢঘ) এবং ডিপমাইন্ডের আলফাফোল্ডের (অষঢ়যধঋড়ষফ) মতো মডেলগুলো এখন জৈব বর্জ্যের জটিল অণুকে ভেঙে কীভাবে নতুন শিল্পপণ্য তৈরি করা যায় তার সঠিক পথ বাতলে দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কাঠের বর্জ্য বা কৃষি অবশিষ্টাংশ থেকে লিগনিন নামক একটি শক্ত পদার্থ পাওয়া যায়। প্রথাগতভাবে এটি ধ্বংস করা কঠিন, কিন্তু এআই সিমুলেশন ব্যবহার করে এখন এমন অনুঘটক বা ক্যাটালিস্ট খুঁজে বের করা হয়েছে যা লিগনিনকে ভেঙে অ্যারোমেটিক যৌগ তৈরি করতে পারে। এই যৌগগুলো পরবর্তীতে সুগন্ধি, ওষুধ বা আঠা তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এআইএর মাধ্যমে পরিচালিতসেলফঅপ্টিমাইজড রিঅ্যাক্টরসবুজ রসায়নের এক অনন্য সংযোজন। এই অটোনমাস বা স্বায়ত্তশাসিত সিস্টেমগুলো রিয়েলটাইমে বিক্রিয়ার তাপমাত্রা, পিএইচ (ঢ়ঐ) এবং অনুঘটকের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। লানজাটেক (খধহুধঞবপয) নামক একটি প্রতিষ্ঠান এআই চালিত বায়োরিঅ্যাক্টর ব্যবহার করে শিল্প কারখানার কার্বনমনোক্সাইড গ্যাসকে ইথানল জ্বালানিতে রূপান্তর করছে। এই প্রক্রিয়ায় এআই অণুজীবের বংশবৃদ্ধি এবং গাঁজন বা ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়াকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যাতে বর্জ্য উৎপাদনের হার সর্বনিম্ন থাকে।

সবুজ রসায়নের আরেকটি চমৎকার উদাহরণ হলো খাদ্য বর্জ্য থেকে বায়োপ্লাস্টিক তৈরি। এআই মডেলগুলো বিভিন্ন অণুজীবের জেনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে বের করতে পারে কোন অণুজীবটি সবচেয়ে কার্যকরভাবে খাবার বর্জ্যকে পিএইচএ (চঐঅ) নামক বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকে রূপান্তর করতে পারবে। এই পদ্ধতিতে তৈরি প্লাস্টিক পরিবেশে মিশে যায় এবং পেট্রোলিয়াম ভিত্তিক প্লাস্টিকের একটি চমৎকার বিকল্প হিসেবে কাজ করে। ডিজিটাল টুইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়াটি প্রথমে ভার্চুয়াল পরিবেশে পরীক্ষা করা হয়, যা কাঁচামালের অপচয় কমায় এবং কারখানার উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি করে।

আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট: দক্ষিণ এশিয়ায় কৃষি বর্জ্য (ধানের তুষ পাট) রূপান্তর

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সবুজ রসায়ন এবং মেটেরিয়াল সায়েন্সের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে ধান এবং পাটের বর্জ্য ব্যবহারের মধ্যে। প্রতি বছর এই অঞ্চলে লক্ষ লক্ষ টন ধানের তুষ এবং পাটের কাঠি পরিত্যক্ত হয় বা জ্বালানি হিসেবে পুড়িয়ে ফেলা হয়, যা বায়ু দূষণ ঘটায়। এআই এখন এই বর্জ্যগুলোকে উচ্চ প্রযুক্তির উপাদানে রূপান্তর করার পথ খুলে দিয়েছে।

ধানের তুষ পুড়িয়ে যে ছাই পাওয়া যায় (জরপব ঐঁংশ অংযজঐঅ), তাতে প্রায় ৮০৯০% সিলিকা থাকে। এআই সিমুলেশন ব্যবহার করে গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, এই সিলিকা সমৃদ্ধ ছাই কংক্রিটের মিশ্রণে ব্যবহার করলে ভবনের স্থায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়। এআই অ্যালগরিদম যেমন সাপোর্ট ভেক্টর মেশিন (ঝঠগ) এবং গাউসিয়ান প্রসেস রিগ্রেশন (এচজ) ব্যবহার করে দেখা গেছে যে, সিমেন্টের ১০১৫% যদি এই তুষের ছাই দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়, তবে কংক্রিটের শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং কার্বন নিঃসরণ কমে। এই পদ্ধতিটি বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব নির্মাণ সামগ্রী তৈরির এক বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

অন্যদিকে, পাটের আঁশ বা জুট ফাইবার দিয়ে তৈরি বায়োকম্পোজিট ইলেকট্রনিক্স এবং অটোমোবাইল শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। পাটের আঁশ হালকা অথচ অত্যন্ত মজবুত। এআই মডেলগুলো এখন পাটের আঁশের সাথে বিভিন্ন পলিমারের মিশ্রণ পরীক্ষা করে দেখছে কোন অনুপাতটি সবচেয়ে বেশি ঘর্ষণ এবং তাপ সহ্য করতে পারে। মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে পাটের আঁশের উপরিভাগের রাসায়নিক পরিবর্তনের (ঝঁৎভধপব গড়ফরভরপধঃরড়হ) এমন সব নতুন ফর্মুলা তৈরি করা হচ্ছে যা আঁশ এবং প্লাস্টিক ম্যাট্রিক্সের মধ্যে বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে এমন সব বায়োকম্পোজিট যা কাঁচের তন্তুর বা গ্লাস ফাইবারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। বাংলাদেশের গবেষকরা এখন এআইএর সাহায্যে পাটের সেলুলোজ থেকে ন্যানোসেলুলোজ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন, যা নমনীয় ইলেকট্রনিক্স এবং ৩ডি প্রিন্টিংয়ে ব্যবহৃত হবে।

কৃষি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই তথ্যগুলো যদি আমরা পরিমাণগতভাবে বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যায় যে ধানের তুষের ঘনত্ব সাধারণত . থেকে . গ্রাম প্রতি ঘন সেন্টিমিটার হয়ে থাকে এবং এর পানি শোষণ ক্ষমতা ১০১৫% এর মধ্যে থাকে। অন্যদিকে পাটের আঁশের টেনসাইল স্ট্রেংথ বা টান সহ্য করার ক্ষমতা সাধারণত ৫০৭০ মেগাপ্যাসকেল পর্যন্ত হতে পারে। এআই এই ভৌত বৈশিষ্ট্যগুলোকে কাজে লাগিয়ে নতুন পদার্থের নকশা তৈরি করে যা ওজনে হালকা অথচ বাস্তবে অত্যন্ত কার্যকর। এই রূপান্তর কেবল বর্জ্য কমায় না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান এবং আয়ের উৎস তৈরি করে।

উপসংহার এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা

উন্নত মেটেরিয়াল সায়েন্স এবং আণবিক বিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ কেবল একটি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি নয়, এটি একটি টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি। ন্যানোস্ট্রাকচারড অণুর শক্তি স্থানান্তরের মডেলিং থেকে শুরু করে গ্রীষ্মমন্ডলীয় জলবায়ুর উপযোগী ব্যাটারি এবং সাশ্রয়ী পানি বিশুদ্ধকরণ মেমব্রেনপ্রতিটি ক্ষেত্রেই এআই গবেষণার সময় খরচ কমিয়ে আনছে। সবুজ রসায়নের মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করবে।

তবে এই অগ্রগতির পথে কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। এআই মডেলগুলোর কার্যকারিতা মূলত উচ্চমানের ডেটার ওপর নির্ভরশীল। অনেক সময় পরীক্ষামূলক গবেষণার উপাত্তের অভাব এআইএর প্রশিক্ষণকে বাধাগ্রস্ত করে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার মতো অঞ্চলে স্থানীয় উপকরণ যেমন ধান বা পাটের ওপর পর্যাপ্ত ডিজিটাল ডেটাবেস নেই। ভবিষ্যতে এই ধরনের ডেটাবেস তৈরি এবং আন্তঃদেশীয় সহযোগিতার মাধ্যমে এআইচালিত মেটেরিয়াল সায়েন্স গবেষণাকে আরও বেগবান করা সম্ভব।

পরিশেষে বলা যায়, মেটেরিয়াল সায়েন্সে এআইএর ভূমিকা এখন একটি অপরিহার্য বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ যেমন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য নিরাপদ জল জ্বালানি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এটি একটি বিশাল সুযোগ যাতে তারা তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং কৃষি বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক উদ্ভাবনের মানচিত্রে নিজেদের স্থান করে নিতে পারে। এআইএর মাধ্যমে অণুর গভীরে লুকিয়ে থাকা শক্তির রহস্য উন্মোচনই হবে আগামীর চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি। (ক্রমশ)

যোগাযোগ: ধহরং@ধহরংৎধযসধহ.ড়ৎম 


Related Posts