যা দেখেছি যা বুঝেছি—২৩ || মনিরুল ইসলাম সাবেক রাষ্ট্রদূত

হত্যালীলা

স্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে আমার কোনো কথা নেই। প্রতিমুহূর্তে কোটি কোটি প্রাণের জন্ম হচ্ছে, মৃত্যু হচ্ছে। প্রাণের জীবনকাল এক মুহূর্ত থেকে শুরু করে কয়েক শত বছর হয়ে থাকে। বিজ্ঞজনেরা যা বলুক, আমি মৃত্যুকে কোনো স্বাভাবিক ঘটনা মনে করি না। স্বাভাবিক হলে কেউ মরলে বা মারলে তাতে মানুষ কেন অঁাতকে ওঠে? জন্মও একটি অস্বাভাবিক ঘটনা। এতবড় মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র এক পৃথিবীতে এমন অপরূপ এক জিনিসের নামপ্রাণ’, যার জন্ম হয়, বর্ধিত পরিণত হয়ে ক্রমান্বয়ে নিস্তেজ হয়, নির্দিষ্ট মেয়াদের জীবনকাল শেষে সেইপ্রাণচলে যায়। প্রাণীর জন্মবর্ধনবিলীন হওয়ার চেয়ে বড় আশ্চর্য আর কি আছে চরাচরে? নিত্য চোখের সামনে সংঘটিত হচ্ছে বলে এদেরকে আমরা স্বাভাবিক করে নিয়েছি। যাক, তাও সেটা মেনে নিলাম কিন্তুহত্যাকে মেনে নিতে আমার মন রাজি নয় বলে মনের তাগিদে কিছু লিখতে বসলাম।

. মানবহত্যা (ঐড়সরপরফব)

জীবনকালে প্রত্যেক প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করে। কিন্তু সবাই বাঁচে নাÑপ্রকৃতি মারে, একে অন্যকে মারে। হত্যা কি একটি সাধারণ স্বাভাবিক অনিবার্য প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া? নিয়তি প্রকৃতি বিশ^পতির ইচ্ছায় জগতের রঙ্গমঞ্চে মানবের সব কর্মই যেন অবলীলায় সংঘটিত হয়ে যাচ্ছে। মানবহত্যা তথা প্রাণীহত্যাও কি তারই একটি অংশ? আমরা ধরে নিই একটি প্রাণের জন্ম হলে বর্ধিত পরিণত হয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করবে। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। সৃষ্টির শুরু থেকে অদ্যাবধি প্রতিনিয়ত দেখি চারদিকে চলছে হত্যালীলা। এত যে বুদ্ধিমান হৃদয়বান দয়ালু মানুষ, সে শুধু অন্যপ্রাণী নয়, তার সহপ্রাণীকেও নির্দ্বিধায় হত্যা করে সম্মুখ সমরে, গোপনে হিংসায়। বড় ছোটকে, সবল দুর্বলকে, ধূর্ত সরলকে হত্যা করছে। মানুষ ছাড়াও মানুষের হত্যাকারী হল ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া মশা সাপ কুকুর শামুক ছারপোকা মাছি কৃমি কুমির বাঘ সিংহ হাতি ইত্যাদি।  শুধু ফুডচেইনের প্রক্রিয়ায়খাদ্যহিসাবেই নয়, রাগ বিদ্বেষ প্রতিযোগিতার অংশ হিসাবেও চলছে। অর্থাৎ যে যেভাবে পারে, একে অন্যকে হত্যা করতে উদ্যত, রাজি।

ফ্রয়েড তাই সব রকম সহজাত প্রবৃত্তিকেজীবনমরণ দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন। জীবনপ্রবৃত্তি ব্যক্তির অস্তিত্ব রক্ষায় তৎপর। সৃষ্টি, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, যৌনতৃপ্তি ইত্যাদি এর মধ্যে পড়ে। যে শক্তির বলে জীবনপ্রবৃত্তি তার উদ্দেশ্যকে চরিতার্থ করে তার নাম লিবিডো (খরনরফড়) মরণেচ্ছার নাম মৃত্যুতৃষ্ণা (ঞযধহধঃড়ং), গভীর রাত নিদ্রার প্রতীক, যখন মানুষ জীবনাবসানকে শ্রেয় মনে করে।  

মানুষ মৃত্যু কামনা করে বলে মরণপ্রবৃত্তিকে ফ্রয়েড ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি বলেছেন। তিনি বলেন, ‘ঞযব এড়ধষ ড়ভ ষরভব রং ফবধঃয হত্যা আত্মহত্যা করার প্রবৃত্তি কমবেশি সবার মধ্যেই রয়েছে। আত্মশাস্তি রাগ ক্ষোভ ঈর্ষা যুদ্ধ ধ্বংসমনোবৃত্তি সবই মরণপ্রবৃত্তির কারণ। ১৯১৪১৮ সালের বিশ^যুদ্ধ ফ্রয়েডকে বলতে বাধ্য করেছিল যে মরণপ্রবৃত্তি, যৌনপ্রবৃত্তির চেয়ে কম শক্তিশালী নয়। মানুষ তার স্বার্থ রক্ষায় মত প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করতে যেমন প্রস্তুত তেমনি যৌনাবেগ চরিতার্থ করতেও কম জেদি নয়। এজন্যই যুদ্ধনারীমদ একই সঙ্গে চলে। জীবন মরণ প্রবৃত্তি একসাথে দ্রবীভূত হতে পারে অথবা একে অপরকে নিরপেক্ষ করে তুলতে পারে, অথবা একে অপরকে অপসারণ করতে পারে। যেমন, খাদ্য গ্রহণে ক্ষুধা নিবৃত্তি হল জীবনপ্রবৃত্তি, অথচ খাদ্য বস্তু কামড়ানো, চোষা, গলধঃকরণ হল মরণপ্রবৃত্তি। খাদ্য গ্রহণে তাই উভয়বিধ বিপরীতমুখী প্রবৃত্তি মিশ্রিত রূপ পরিগ্রহ করে। যৌনাকাক্সক্ষা হল জীবনপ্রবৃত্তি, যার বহিঃপ্রকাশ হল ভালোবাসা। ভালোবাসা মরণপ্রবৃত্তির হিংসাশত্রুতাকে জয় করতে পারে। আবার ভালোবাসা হিংসাকে এবং হিংসা ভালোবাসাকে অপসারণ করতে পারে। 

সভ্যতার উত্থান পতন এবং ব্যক্তিত্বের গতিশীলতা জীবন মরণ প্রবৃত্তির ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। কোনোকিছু সৃষ্টি, উন্মেষ, বিকাশ বিস্তৃতি জীবনপ্রবৃত্তির তাগিদেই। আবার তার ধ্বংস, লয় বিনাশ মরণপ্রবৃত্তির প্রভাবে। সৃষ্টি ধ্বংস হচ্ছে জীবনের অন্যতম বাস্তবতা, যার মাধ্যমে ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠে গতিশীল।

হত্যাকান্ড প্রাকৃতিক এবং মানবিক কারণে হতে পারে। মানুষ অন্য মানুষকে হত্যা করে, নিজেকেও মারে, অন্যসব প্রাণীকে নিরুদ্বেগে মারেÑকিলিং যেন মানুষের একটা নেশার খেলা। এই পৃথিবীতে মানুষ কত মানুষকে মেরেছে তার হিসাবটা ভয়াবহ। প্রতিদিন কত অছিলায় এক মানুষ আরেক মানুষকে মেরে ফেলছে। শান্তির জন্য যুদ্ধ কথাটাও অসত্য, অসম্ভব দুর্বাসনাÑসবাই নিজস্বার্থে যুদ্ধ করে। অশোক (ভারত ২১৬ খ্রি.পূর্ব), চেঙ্গিস খান (১২০০ মোঙ্গল), হালাকু খান (১২৬০), ইসমাইল এনভার (অটোমান, ১৯২০), জোসেফ স্টালিন (সোভিয়েত ১৯৩২), এডলফ হিটলার (জার্মানী ১৯৪২), হিডেকি তোজু (জাপান ১৯৩৮), মাও সে তুং (চীন, ১৯৬৫), পলপট (কম্বোডিয়া, ১৯৭৫), ইয়াহিয়া খান (পাকিস্তান, ১৯৭১), হুতু টুটসি (রুয়ান্ডা ১৯৯৪), জর্জ বুশ (যুক্তরাষ্ট্র ২০০৩) কতলোক মেরেছে? প্রত্যক্ষ হন্তারক ছাড়াও যারা পরোক্ষভাবে মানুষ মারে, তাদের কি বিচার? একজনকে মারলেই যদি মৃত্যুদন্ড/নরকে নিক্ষিপ্ত হয়, তাহলে এদের কী শাস্তি হবে

সবল দুর্বলকে খায়, ¯্রষ্টার এই খেলাও বুঝি না একদম।

Related Posts