৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্প ঃ ম্যাসাচুসেটস লাভ স্টোরিঃ এরিখ সিগাল || আবদুল্লাহ জাহিদ নিউইয়র্ক
কেমব্রিজ শহরে শরতের বিকেল নেমেছে। হার্ভার্ডের প্রাচীন ভবনগুলোর ইটের গায়ে সোনালি রোদ ঝরে পড়ছে। চার্লস নদীর তীরে বাতাসে উড়ে যাচ্ছে শুকনো পাতা। এই শহরেই শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রেমকাহিনীগুলোর একটিÑখড়াব ঝঃড়ৎু। এরিখ সিগাল এমন এক প্রেমের গল্প লিখেছিলেন, যা কেবল দুই তরুণ—তরুণীর সম্পর্ক নয়; বরং শ্রেণিভেদ, অহংকার, আত্মত্যাগ এবং জীবনের নির্মম সৌন্দর্যের কাহিনী।
অলিভার ব্যারেট চতুর্থÑ হার্ভার্ডের আইন বিভাগের ছাত্র। সুদর্শন, মেধাবী, ধনী পরিবারের উত্তরাধিকারী। তার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু প্রজন্মের ঐতিহ্য। তার বাবা সম্মানিত ব্যবসায়ী; তাদের পরিবারের কাছে সাফল্য যেন জন্মগত অধিকার।
অন্যদিকে জেনিফার ক্যাভিলেরিÑর্যাডক্লিফ কলেজের সঙ্গীতের ছাত্রী। ইতালীয় অভিবাসী পরিবারের মেয়ে। বাবার ছোট্ট বেকারির আয়ে বড় হওয়া জেনিফার বুদ্ধিদীপ্ত, রসিক, স্বাধীনচেতা। সে কাউকে ভয় পায় না, ধনসম্পদকে গুরুত্ব দেয় না, আর নিজের মতামত বলতে কখনো দ্বিধা করে না।
প্রথম সাক্ষাৎ হয় লাইব্রেরিতে। অলিভার একটি বই খুঁজতে আসে। বইটি জেনিফারের ডেস্কে। সাহায্য চাইতেই মেয়েটি এমনভাবে কথা বলে, যেন ছেলেটির নাম—যশ তার কাছে একেবারেই অর্থহীন।
—‘তুমি কি সব সময় এত দাম্ভিক?’
—‘তুমি কি সব সময় এত অভদ্র?’
এই ঠাট্টা, এই কথার লড়াই থেকেই জন্ম নেয় আকর্ষণ।
তাদের সম্পর্ক প্রচলিত প্রেমের মতো নয়। তারা ফুল, চিঠি কিংবা দামি উপহারে নয়, একে অপরকে ভালোবাসে তর্কে, হাসিতে, সঙ্গীতে, দীর্ঘ হাঁটায়।
জেনিফার পিয়ানো বাজায়। বাখ ও মোৎসার্ট তার আত্মার ভাষা। অলিভার বরফের মাঠে আইস হকি খেলে। একজন শিল্পের মানুষ, অন্যজন প্রতিযোগিতার মানুষ। অথচ এই বৈপরীত্যই তাদের সম্পর্ককে সুন্দর করে তোলে।
একদিন অলিভার বুঝতে পারে, সে আর জেনিফারকে ছাড়া নিজের জীবন কল্পনাই করতে পারে না।
যখন অলিভার বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন শুরু হয় আসল সংঘাত।
তার বাবা এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারেন না। তাঁর চোখে জেনিফার যথেষ্ট অভিজাত নয়, যথেষ্ট ধনী নয়, যথেষ্ট ‘যোগ্য’ নয়।
বাবা মনে করেন, ভালোবাসা নয়, বংশমর্যাদা এবং সামাজিক অবস্থানই মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। কিন্তু অলিভার প্রথমবারের মতো বাবার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। সে উত্তরাধিকার, অর্থ, পারিবারিক সুবিধাÑসবকিছু ছেড়ে দেয়।
একটি ছোট্ট গির্জায়, অল্প কয়েকজনকে নিয়ে তাদের বিয়ে হয়। এই বিয়েতে বিলাসিতা নেই; আছে বিশ্বাস।
বিয়ের পর বাস্তবতা কঠিন হয়ে ওঠে। একটি ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্ট। পুরোনো আসবাব।
মাস শেষে টাকা ফুরিয়ে যাওয়া।
জেনিফার স্কুলে কাজ করে সংসার চালায়। অলিভার আইন পড়তে থাকে।
তারা কখনো অভিযোগ করে না। রাতে সস্তা খাবার খেয়েও হাসতে পারে।
কারণ তাদের কাছে সুখের সংজ্ঞা অন্যরকম। একজন অন্যজনের পাশে থাকলেই পৃথিবী সম্পূর্ণ। এই অংশগুলোতেই সিগালের লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি দেখিয়েছেন, ভালোবাসা কখনো সম্পদের ওপর নির্ভর করে না।
অবশেষে অলিভার আইন বিভাগে অসাধারণ ফল করে। একটি নামী প্রতিষ্ঠানে চাকরি পায়।
তাদের জীবনে স্বস্তি ফিরে আসে। এখন তারা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। একটি বড় বাসা। সন্তান। জেনিফারের সঙ্গীতজীবন। সবকিছু যেন নতুন করে শুরু হতে চলেছে।
পাঠকও বিশ্বাস করতে শুরু করেনÑএবার নিশ্চয়ই সুখ আসছে।
কিন্তু জীবন সব সময় মানুষের পরিকল্পনা মেনে চলে না। সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করেও তারা সফল হয় না। চিকিৎসকের কাছে গেলে ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় এক ভয়াবহ সত্য।
জেনিফার ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত। তার সামনে সময় খুবই অল্প।
এই সংবাদ উপন্যাসটিকে সম্পূর্ণ অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়।
অলিভার পৃথিবীর সব বড় আইনজীবী, সব চিকিৎসক, সব হাসপাতালের সামনে অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার অর্থ আছে। জ্ঞান আছে। ভালোবাসা আছে।
কিন্তু মৃত্যুকে থামানোর ক্ষমতা নেই। জেনিফার মৃত্যুকে ভয় পায় না। সে চায় না অলিভার তাকে করুণা করুক। শেষ দিনগুলোতেও সে হাসে। ঠাট্টা করে।
অলিভারকে সাহস দেয়। হাসপাতালের সাদা দেয়ালের মাঝেও তারা যেন আবার সেই প্রথম দিনের মতো কথা বলে। এই দৃশ্যগুলো পাঠকের হৃদয় ভেঙে দেয়।
কারণ এখানে কান্না খুব কম, কিন্তু নীরবতা অসীম।
একদিন জেনিফার চলে যায়।
কোনো নাটকীয়তা নেই।
শুধু এক গভীর শূন্যতা।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসা অলিভার বুঝতে পারে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্ষতি অর্থ দিয়ে পূরণ করা যায় না।
সে দীর্ঘদিন পর বাবার মুখোমুখি হয়।
বাবা কাঁদতে কাঁদতে বলেন—
‘ও’স ংড়ৎৎু.’
অলিভারের উত্তর আসে শান্তভাবে—
‘খড়াব সবধহং হবাবৎ যধারহম ঃড় ংধু ুড়ঁ’ৎব ংড়ৎৎু.’ যার বাংলা অর্থ ‘ভালোবাসা এমন এক বন্ধন, যেখানে অনুশোচনার ভাষা নয়, বোঝাপড়াই সবচেয়ে বড়।’
এই একটি বাক্য সাহিত্য ও চলচ্চিত্র—উভয় জগতেই কিংবদন্তি হয়ে আছে।
কেন এই উপন্যাস আজও অমর?
— খড়াব ঝঃড়ৎু মূলত প্রেমের গল্প হলেও, এর ভেতরে রয়েছে শ্রেণিবৈষম্য, পারিবারিক অহংকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আত্মসম্মান এবং মৃত্যুর মুখে মানুষের মর্যাদার গল্প।
— ম্যাসাচুসেটসের হার্ভার্ড ও র্যাডক্লিফের শিক্ষাঙ্গন শুধু পটভূমি নয়; তারা যেন এই প্রেমের নীরব সাক্ষী।
— এরিখ সিগালের ভাষা সহজ, সংলাপ প্রাণবন্ত, আবেগ সংযত। তাই গল্পটি অতিনাটকীয় না হয়েও গভীরভাবে হৃদয় স্পর্শ করে।
— উপন্যাসটি মনে করিয়ে দেয়, সত্যিকারের ভালোবাসা সুখের নিশ্চয়তা দেয় না; বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে অর্থপূর্ণ করে তোলে।
লাভ স্টোরি এমন এক উপন্যাস, যেখানে প্রেম কোনো রূপকথার পরিণতি নয়; বরং মানুষের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং সবচেয়ে বেদনাময় অভিজ্ঞতা। হার্ভার্ডের ইটের দেয়াল, চার্লস নদীর বাতাস, র্যাডক্লিফের সঙ্গীত, ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টের অভাব, হাসপাতালের নীরব করিডোরÑসব মিলিয়ে এরিখ সিগাল এমন এক প্রেমের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছেন, যা প্রকাশের অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর আজও পাঠকের চোখ ভিজিয়ে দেয়।
উপন্যাসটি শেষ করার পর মনে হয়, মানুষের জীবন হয়তো দীর্ঘ নয়; কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা থাকলে একটি সংক্ষিপ্ত জীবনও অনন্ত হয়ে উঠতে পারে।
লেখক পরিচিতি:
এরিখ উলফ সিগাল (১৬ জুন ১৯৩৭—১৭ জানুয়ারি ২০১০) ছিলেন একজন মার্কিন ঔপন্যাসিক, চিত্রনাট্যকার, ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের গবেষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। নিউইয়র্কের ব্রুকলীনে জন্মগ্রহণকারী সিগাল শৈশব থেকেই গ্রিক ও রোমান সাহিত্য, ইতিহাস এবং ভাষার প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। তিনি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক এবং ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীকালে ইয়েল ইউনিভার্সিটিসহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রিক ও লাতিন সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেন।
