যা দেখেছি যা বুঝেছি—২৭ || মনিরুল ইসলাম
সুখ—দুঃখ
Most people are about as happy as they make up their minds to be- Abraham Lincoln
শান্ত মনে তৃপ্ত হওয়ার অবস্থাই সুখ, সৃষ্ট আনন্দকে উপভোগ করাই সুখ। আমরা যখন ‘ভালো’ বোধ করি, সন্তুষ্ট অবস্থায় থাকি, আনন্দানুভূত হয়, সেটাই সুখ। যথারীতি এর বিপরীতটা হল দুঃখ। যেদিন সুখের জন্ম, সেদিন দুঃখেরও আবির্ভাব যমজভাই হিসাবে। যেমন এসেছে প্রেমের সাথে হিংসা, ঈশ্বরের সাথে ইবলিস। মহাবিশ্বের ‘আধাআধি’তে জোড়ায় জোড়ায় বিপরীতমুখী জিনিসের সহাবস্থান থাকে। তাহলে সুখ—দুঃখ দুই ভাইয়ের পরিচয়টা কি? এদের জন্মদাতার নাম ‘আবেগ’ এবং জননীর নাম ‘অনুভূতি’, এদের বাড়ির ঠিকানা ‘মন’ ও ‘মস্তিষ্ক’।
সুখ আর দুঃখ দুই ভাই, আসা—যাওয়া করে কখনো একসাথে, আবার পালাক্রমে। এরা প্রতিযোগিতা করে মানুষের জীবনে প্রাধান্য বিস্তার করতে চায়, অসহায় মানুষ শুধু তাকিয়ে দেখে। মানুষের মনে সুখ এবং দুঃখ দুটোই আসে কিন্তু সুখ বসে থাকে না, দুঃখ শুধু মনের কোণে লুকিয়ে জমে থাকে, সরে যেতে চায় না। দীর্ঘস্থায়ী অনুভূতি হল শোক, দুঃখ হয় মাঝারি স্থায়ী, ক্ষণস্থায়ী হল সুখ। নির্মল নিরবচ্ছিন্ন শান্তির সুখ মানুষের মনে স্থায়ী হয় না। সুখ বড় পাজিÑহঠাৎ আসে মনে, বিজলির মতো। কখন কোন দিক দিয়ে আসে, কতক্ষণ বসে, কখন কিভাবে চলে যায়, কিচ্ছু বুঝতে দেয় না।
মানুষ আনন্দ প্রকাশ করতে চায়, দুঃখ নয়। দুঃখ একা নীরবে ভোগ করা যায়, সুখ ভোগ করতে হয় সঙ্গীসাথে মিলেমিশে উৎসবে। কিন্তু দুঃখ—বেদনা হয় একা নিভৃতে। আনন্দকে প্রকাশ্যে চারপাশে বিলিয়ে দেয়, দুঃখকে লালন করে একান্তে নীরবে। আনন্দের প্রকাশ/ধরন বহুবিধ কিন্তু দুঃখের চেহারা এক অভিন্ন। দুটোর মধ্যে মিল কী? উভয়েরই তেজ আছে, ভারও আছে। এদেরকে চেপে বা লুকিয়ে রাখা কঠিন, সুযোগ পেলেই বেরিয়ে আসে। সুখ—দুঃখ হল বায়ুর মতো অদৃশ্য কিন্তু অনুভূত। একই সাথে দরকারী, আবার ধ্বংসাত্মকও। যতবেশি শেয়ার, উভয়ের পরিমাণই বেড়ে যায় ততবেশি। সুখ—শান্তি আসে পরার্থে, দুঃখ আসে স্বার্থে।
জীবন কখনো সোজা যায়, কখনো পথ বাঁকা—তেড়া হয়। উত্থান হয়, পতনে পড়ে কখনো সমতলে চলে কিছুদিন। দুঃখ হল রশি, যা দিয়ে সাগর গভীরে চলে যাওয়া যায়। সুখ হল মই, যা দিয়ে গিরিশিখরে ওঠা যায়। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই সমতলে বসবাস করে। অর্থাৎ ভাসাভাসা সুখ—দুঃখ সমভাবে অনুভূত হয় তার জীবনে। সবার সুখ এক, দুঃখ একÑঅনুভবের মাত্রাটা ভিন্ন। সর্বোচ্চ সুখ বা সর্বোচ্চ দুঃখ কোনটা? তাও ব্যক্তিনির্ভর। একই ‘সুখ’ অন্যের বেলা বড়, নিজের ক্ষেত্রে ছোট মনে হয়। একই দুঃখ নিজের বেলা বড়, অন্যের হলে ছোট করে দেখা হয়। অন্যের সুখ হিংসার জন্ম দেয়, অন্যের দুঃখ স্বস্তি/শিক্ষা দেয়।
অন্যের সাথে নিজের তুলনাই সুখ—দুঃখের কারণ। যদি কেউ জঙ্গলে একা বাস করে অথবা নিজেকে সংসার থেকে সরিয়ে রাখে, তাহলে সুখ—দুঃখের বোধ তাকে আলোড়িত করবে না। আমার দুঃখ আমি বাড়াই না, অন্যেরা বাড়ায়। আমি চুপচাপ হজম করলেও অন্যেরা বলতে থাকে: আহা, তোমার এই দশা কেন! ফলাফল ভালো হল না, চাকরি যে কবে হবে তোমার, পদোন্নতিটা হল না, বদলি হচ্ছে না, বিয়েটা ভালো হল না। সেজন্য দুঃখে পতিত হয়েও আমি বলি, ভালো আছি, ভালো আছি! পৃথিবীতে মধ্যবিত্তরাই সুখী হয়, দুঃখ পায়। গরিব—ধনীর সুখ—দুঃখ বোধ এত তীক্ষè নয়। কর্মই সুখ, অকর্মই দুঃখ। সুখ অর্জন করতে হয়, ফ্রী সুখ সুখ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের ধনী সমাজে নর—নারী সুখী নয়, অনার্জিত পয়সা অকর্মণ্যদের সুখ তিতা করে ফেলে।
এই পৃথিবীর সবকিছু সবার জন্য নয়Ñদুঃখ নয়, সুখও নয়। আনন্দ—বেদনা যা কিছু আসে জীবনে, তা—ও আবার সবসময়ের জন্য নয়। কে সুখী? কে দুঃখী? সবাই সুখী, সবাই দুঃখীÑকখনো কখনো। নিজের নয়, অন্যের সুখ—দুঃখ দেখাও একধরনের উপভোগ। মানুষ তাই কানাঘুষা করে, উসকে দেয়, ‘চুপি’ মারে।
সুখ হল তুলার মতো, সহজেই উড়ে যায়। দুঃখ হল ধুলার মতো, উড়ে যায় কিন্তু দাগ রেখে যায়। সুখের আবেশ সরে যায় কিন্তু দুঃখের অঁাচড় মোছে না। সুখের রেশ মুছে যায়, দুঃখের ক্ষত শুকায় না। দুঃখ দাগ কাটে, সুখ মজে যায়। দুঃখ আসে মনে কাঁটা হয়ে, তারপর বুকে জমে চেপে বসে থাকে পাথর হয়ে। সুখ যত গভীরে যায়, দুঃখ যায় তারও চেয়ে গহিনে।
একই সুখ ফিরে আসে না কিন্তু একই দুঃখ ফিরে ফিরে আসে খেঁাচাতে। সুযোগ দিলেও সুখ বড় হয় না কিন্তু ফাঁক পেলে দুঃখ বাড়তে থাকে লকলকিয়ে। সুখ আসে প্রাণে সৌরভ ছড়িয়ে, উঠে উড়ে চলে যায় বাষ্প হয়ে।
দুঃখ নীচে তাকায়, ঘরে অন্ধকারে মুখ লুকায়। সুখ চায় বাইরের আলোতে ঘুরে বেড়াতে, তাই মুখ বের করে ঊর্ধ্বে তাকায়। কারণ দুঃখ হয় অন্তমুর্খী, সুখ বহিমুর্খী। সুখ ঘুম পাড়িয়ে রাখে, দুঃখ জাগিয়ে রাখে। সুখ দোহন করে, দুঃখ দহন করে। যেখানেই যাই, দুঃখ বলে সাথে আছি ভাই। কারণ দুঃখ রবাহুত, সুখ আমন্ত্রিত। ঘরে আনন্দ নেই বলেই আনন্দের খোঁজে মানুষ পথে বের হয়, দুঃখ বেচারা চোরের মতো ঘরে লুকিয়ে থাকে বলেই তার খোঁজে বাইরে যেতে হয় না।
ঘরে সুখ নেই বলে মানুষ বাইরে সুখ খুঁজতে আসে, আনন্দর খুেঁজ যায় সমুদ্রতীরে, জনসমাবেশে, সিনেমা বা কনসার্টে। তাও একাকীত্বে নয়, অন্যের আনন্দ দেখে সে আনন্দের সন্ধান করে। ভাগাভাগি ছাড়া আনন্দ নেই, দুঃখও নয়। সেবার ইথিওপিয়ার প্রাদেশিক শহর মেকেলে গেলাম তাদের আশেন্দা উৎসব দেখতে। আধো অন্ধকারে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেও শহরে মানুষের ঢল, আনন্দ বিলাসে যোগ দিতে আমিও নামলাম পথে। আনন্দিত মানুষের মুখ দেখিÑএর চেয়ে বড় সুখ আর কী আছে জগতে ? সুখ—দুঃখ সমান হলেও মানুষ দুঃখের কথা শুনতে বা বলতে চায় না, অন্যায় অবিচারের কথাও নয়। সবাই চায় সুখের কাহিনী শুনতে, সুন্দর আশা সম্ভাবনার গল্প জানতে।
সুখী হওয়ার জন্য দূরদশীর্ তৎপর হতে হয়, নিষ্ক্রিয় উদাসীন হলে দুঃখরা এসে ভিড় জমায়। সুখ নিজে আসে না, ধরতে হয়। দুঃখ নিজেই এসে জবরদখল করে। সুখের সা¤্রাজ্যে কোনদিকে দিয়ে ফুটো করে দুঃখ ঢুকে পড়ে, তারপর বড় হতে থাকে। কখনো ঝঞ্ঝার বেগে উল্কার মতো সহসা ঢুকে পড়ে, সাজানো সুখের বাগান তছনছ করে দিয়ে যায়। আমি এত সুখী ছিলাম, হঠাৎ আমাকে দুঃখী বানিয়ে কর্তার কি লাভ হল সেই রহস্যটা বুঝি না।
দুঃখ সৃষ্টি করে, সুখ ধ্বংস করে। মানুষের সৃষ্টিশীলতা কোনো একটা দুঃখকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। অন্ধ হোমার, সন্তানহারা রবীন্দ্র/নজরুল, পত্নীহারা শাহজাহান। সুখের দ্বারা কিছুই অর্জিত হয় না, সুখ বড়জোর হিংসার উদ্রেক করে।
সবাই দুঃখ দূর করতে চায় কিন্তু তারা কি জানে দুঃখ ছাড়া সুখানুভূতি নেই? যেমন ক্ষুধা ছাড়া স্বাদ নেই, অন্ধকার ছাড়া আলোর প্রয়োজন নেই, শ্রান্তি বিনে ঘুম নেই। আগুন ছাড়া জগতের অগ্রগতি নেই, মৃত্যু আছে বলেই জন্মোৎসব হয়। সুখ হাওয়ায় মিলিয়ে যায় কিন্তু দুঃখ মনোমন্দিরে বসে থেকে সৃষ্টি করে কবিতার ছন্দ, গানের সুর, চিত্রের অঁাচড়, নৃত্যের ছন্দ, সঙ্গীতযন্ত্রের মূর্ছনা। দুঃখকে বরণ করে তাকে জয় করতে হবে, নইলে সে দুঃখীকে পুড়ে ছাই করে দেয়, সোনায় পরিণত করে না। দুঃখ ধ্বংসাত্মক, আবার ¯্রষ্টাও। দুঃখ হল জীবন—যন্ত্রের জ্বালানী, জীবন—নৌকায় পালের বাতাস। সুখ হল খেয়াঘাটের বিরতি।
সংসারের ক্রিয়া—প্রতিক্রিয়া থেকে যেমন গরল উঠে, অমৃতও পাওয়া যায়। অর্ধেক অর্ধেক হলেই জীবন সার্থক। যারা চিরসুখী, তারা সুখের স্বাদ পায় নাÑপ্রতিদিন পাওয়ায় স্বাদ নেই, মাঝেমধ্যেই স্বাদ। জগতের দুইধারা: হাসির রোল এবং কান্নার সুর। যে শুধু একটা শুনেছে, তার জীবন অর্ধেক, যে দুটোই শুনেছে সে পূর্ণাঙ্গ। জীবনের সংগ্রাম শেষে প্রতিষ্ঠালাভ হয়, সুখভোগ শেষ হয়Ñজীবন নিজেই শেষ হয়ে যায় কিন্তু দুঃখ, সে বড় বেয়ারা, সে তার অস্তিত্ব বজায় রাখে মৃত্যুক্ষণ অবধি। আমার দুঃখ তাই গেল না। সব ছেড়ে বৈরাগী উদাসীন নিরাসক্ত হলেও সে আছে পেছনে পেছনে, তাড়া করে আমাকে সারাক্ষণ।
সংসারে এখন আমি ভারমুক্ত নিশ্চিন্ত স্বাধীন। অনিকে নিয়ে চিন্তা করতে হয় না, আম্মার কথা ভাবতে হয় না, ভাইবোনদের চাহিদা মেটাতে হয় না, কারো জন্য অর্থব্যয় করতে হয় না, কেউ বাসায় এসে ধর্না দেয় না। তাহলে কি আমি এখন খুব বেশি সুখী? না, আমি বরং আগের চেয়ে অসুখী অশান্ত। সংশ্লিষ্টতায় (involvement) সুখ, বিচ্ছিন্নতায় অসুখ।
