মক্কা চুক্তি নিয়ে উচ্ছ্বাস বাস্তবতা নয় || ব্রি. জে. মো. জাহেদুর রহমান (অব.)
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি, যা ‘মক্কা চুক্তি’ নামে অধিক পরিচিত, এরই মধ্যে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বুদ্ধিজীবী সমাজ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
কেবল এই দৃশ্য দেখা বাকি যে কেউ আর্কিমিডিসের মতো নগ্ন দেহে দুই বাহু শূন্যে উত্তোলন করে ‘ইউরেকা, ইউরেকা’ বলে রাজপথে নৃত্য করছে।
কিন্তু উচ্ছ্বাস বাস্তবতা নয়। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো হলোঃ কেন এই তিনটি দেশ একটি ত্রিপক্ষীয় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে উপনীত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে? এই চুক্তির কৌশলগত কাঠামো কী? এর লক্ষ্য, বাধ্যবাধকতা এবং সহযোগিতার প্রক্রিয়াগুলো কী? চুক্তিটির স্বাতন্ত্র্য কোথায়? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটি কী বার্তা বহন করে?
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত পরিবেশ ক্রমেই অস্থির ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল প্রথমবারের মতো গালফ কো—অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) সদস্য রাষ্ট্র কাতারের রাজধানী দোহায় হামাসের প্রতিনিধিদলের ওপর সরাসরি বিমান হামলা চালায়।
এই হামলা উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়, বিশেষত যেসব রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র—ইরান—ইসরায়েল সংঘাত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতাকে আরো স্পষ্ট করে তোলে। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকলেও উপসাগরীয় মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রদানের ক্ষেত্রে তার সক্ষমতা কিংবা আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রস্তাবিত তথাকথিত ‘হেক্সাগন জোট’, যার মধ্যে ইসরায়েল, ভারত, গ্রিস, সাইপ্রাস এবং অনুল্লিখিত আরব, আফ্রিকান ও এশীয় রাষ্ট্রসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে উদীয়মান প্রতিযোগিতার আরেকটি দিক নির্দেশ করে।
যদিও প্রস্তাবিত জোটে কোন কোন রাষ্ট্র থাকবে এবং এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কী হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবু এর প্রস্তাব মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত কৌশলগত বাস্তবতার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক।
ওয়াশিংটন তার উপসাগরীয় মিত্রদের পরিত্যাগ করেছে। তবে সামপ্রতিক ঘটনাবলিতে মিত্র রাষ্ট্রগুলোর ওপর আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা কিংবা আগ্রহের সীমাবদ্ধতা দৃশ্যমান হয়েছে। এর ফলে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
অন্যদিকে বিশ্বের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোও সংকটবহুল মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থেকেছে কিংবা অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে। ফলে অঞ্চলটিতে একটি নিরাপত্তা—অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাস্তবতা হলো, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে উদ্ভূত সব ধরনের হুমকি ও ঝুঁকি এককভাবে মোকাবেলা করা কঠিন। এই প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা—শূন্যতা মোকাবেলায় একটি সম্মিলিত ও সমন্বিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো কিংবা প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে গঠিত এই ত্রিপক্ষীয় কাঠামোটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনটি রাষ্ট্রেরই নিজস্ব সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ও কৌশলগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সৌদি আরব ও পাকিস্তান যেমন দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদার, তেমনি তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যেও দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক বিদ্যমান। অন্যদিকে সৌদি আরব ও তুরস্ক আঞ্চলিক প্রভাব ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত বলে প্রতীয়মান হয়। ইরান ও ইসরায়েলও একই বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে মক্কা চুক্তি বিভিন্ন কারণে একটি কৌতূহলোদ্দীপক সংমিশ্রণ। এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের পরিপূরক সক্ষমতা ধারণ করে। সৌদি আরব এই কাঠামোয় আর্থিক ও জ্বালানি শক্তি জোগায়, তুরস্ক জোগায় সামরিক শক্তি ও একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষাশিল্প উৎপাদনভিত্তি; আর পাকিস্তান সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতায় একটি পারমাণবিক মাত্রা যুক্ত করে। মক্কা চুক্তি পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতার বিষয়ে কৌশলগত অস্পষ্টতা বজায় রেখেছে। তার পরও এই সক্ষমতা যে জোটটির সামগ্রিক কৌশলগত ওজন বৃদ্ধি করে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
জোটের তিন রাষ্ট্রের লক্ষ্যও অভিন্ন নয় বলে ধারণা করা যায়। সৌদি আরবের প্রাথমিক প্রেরণা হতে পারে তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের সম্ভাব্য ধ্বংসাত্মক পরিণতি থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা। তুরস্কের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রভাব এবং লেভান্ত অঞ্চলের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হতে পারে। পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরাসরি কোনো ভৌগোলিক নিরাপত্তা হুমকি বা ঝুঁকির সম্মুখীন নয়। তবে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক পাকিস্তানকে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে নিরাপত্তা অংশীদারত্ব আরো জোরদার করতে উদ্বুদ্ধ করেছে বলে বিশ্লেষণ করা যায়।
পাকিস্তানের আরেকটি লক্ষ্য হতে পারে সৌদি আরবের আর্থিক শক্তি এবং তুরস্কের প্রতিরক্ষা—শিল্প উৎপাদনভিত্তি থেকে উল্লেখযোগ্য কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করা। তুরস্ক ও পাকিস্তান উভয়েই ইন্ডিয়া—মিডল ইস্ট—ইউরোপ ইকোনমিক করিডরের (আইএমইসি)বাইরে থাকায় এই ত্রিপক্ষীয় কাঠামো থেকে তারা কিভাবে সুবিধা নিতে পারে, সেটিও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে সেই সুবিধার প্রকৃতি ও পরিধি চুক্তির আরো বিস্তারিত সম্প্রসারণ ও স্পষ্টীকরণের পরই পরিষ্কার হবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জোটটির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দায়বদ্ধতার পরিধি এবং সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশিত হয়নি। ফলে এ পর্যন্ত যে আলোচনা ও বিশ্লেষণ হয়েছে তার একটি বড় অংশই তত্ত্ব, বর্তমান ভূ—রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং অনুমানের ওপর নির্ভরশীল। অতএব, চুক্তিটির দীর্ঘমেয়াদি চরিত্র সম্পর্কে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন হবে না।
তবে জোটটির কাছ থেকে যে বার্তাটি পাওয়া যায়, তা মোটামুটি পরিষ্কার। এটি কোনো ধর্মভিত্তিক জোট নয়; একইভাবে এটিকে সরাসরি ইসরায়েল কিংবা ইরানকে লক্ষ্য করে গঠিত কোনো সামরিক জোট হিসেবেও দেখা উচিত নয়। জোটের সদস্য রাষ্ট্রগুলো জোর দিয়ে বলেছে যে জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় এই চুক্তি যৌথ সংহতির একটি প্রকাশ। অন্যান্য রাষ্ট্রের জন্য ভবিষ্যতে এতে যোগদানের সুযোগও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
এই বৈশিষ্ট্যগুলো বিবেচনায় অনেক বিশ্লেষক চুক্তিটিকে একটি নমনীয় নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে দেখছেন, যা দুর্বল হয়ে পড়া মার্কিন নিরাপত্তা—আবরণকে সরাসরি প্রতিস্থাপন করছে না; বরং আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যৌথ নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করছে। একে কৌশলগত ঝুঁকি—হ্রাস বা ‘স্ট্র্যাটেজিক হেজিং’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। অর্থাৎ সদস্য রাষ্ট্রগুলো একদিকে অন্যান্য রাষ্ট্র ও সংস্থার সঙ্গে তাদের বিদ্যমান সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে নিজেদের সম্মিলিত সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নতুন নিরাপত্তা অংশীদারত্ব গড়ে তুলছে। এর তাৎপর্য হলো—সদস্য রাষ্ট্রগুলো একই সঙ্গে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, কৌশলগত স্থিতিশীলতা এবং যৌথ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। ভবিষ্যতে মিসর, কুয়েত কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্র এতে যোগ দিলে চুক্তির প্রকৃতি ও শর্তাবলিতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে রাজনৈতিক প্রতীকী গুরুত্বের চেয়ে মক্কা চুক্তির প্রকৃত কার্যকারিতা ও সাফল্য নির্ভর করবে এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং বাস্তবায়ন ব্যবস্থার ওপর। এর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্যবিনিময়, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে সহযোগিতা, কমান্ড ও কন্ট্রোল ব্যবস্থা, আন্ত সক্ষমতা, সমন্বিত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা, লজিস্টিক সহায়তা, যৌথ প্রশিক্ষণ ও সামরিক মহড়া/অনুশীলন এবং সম্ভাব্য যৌথ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব ব্যবস্থা কার্যকরভাবে গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং উল্লেখযোগ্য সম্পদের প্রয়োজন হবে। তিন দেশ এরই মধ্যে সৌদি আরবে একটি সচিবালয় স্থাপনে সম্মত হয়েছে, যা আগামী তিন বছর একজন পাকিস্তানি সেক্রেটারি জেনারেলের অধীনে পরিচালিত হবে। তাদের প্রথম কৌশলগত, রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা পর্ষদের সভায় সহযোগিতার কাঠামো নিয়েও আলোচনা হয়েছে। অর্থাৎ চুক্তিটির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের প্রক্রিয়া এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।
নিবন্ধের শুরুতেই বাংলাদেশের জনপরিসরে মক্কা চুক্তি নিয়ে উচ্ছ্বাসের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছিল। এই উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি বিপরীতমুখী দুটি মতও স্পষ্ট—একদিকে দ্রুত জোটে যোগদানের তাগিদ, অন্যদিকে জোটে যোগ না দেওয়ার সতর্কবার্তা। যোগদানের পক্ষে যুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে : প্রথমত, জোটের সম্মিলিত সক্ষমতা বাংলাদেশের প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে; দ্বিতীয়ত, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে; তৃতীয়ত, সৌদি আরবসহ অন্যান্য রাষ্ট্রে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ আরো সহজ হতে পারে; এবং চতুর্থত, বাংলাদেশ বৃহত্তর ইসলামিক সংহতির সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত হতে পারে।
অন্যদিকে যোগ না দেওয়ার পক্ষে যুক্তিগুলোও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এর ফলে বাংলাদেশ অন্য দেশ বা অঞ্চলের সংঘাত ও নিরাপত্তা সমস্যায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, জোটের বাইরেও উপসাগরীয় অঞ্চলে আরো অনেক রাষ্ট্র রয়েছে, যাদের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি, জনশক্তি রপ্তানি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ জড়িত। তৃতীয়ত, জোটের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সুনির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। চতুর্থত, বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে একটি সক্রিয় সামরিক জোটে অংশগ্রহণ কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সুতরাং, মক্কা চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে যোগদানযোগ্য কোনো জোট কিংবা সরাসরি প্রত্যাখ্যানযোগ্য কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে দেখা সমীচীন হবে না; বরং এটিকে পরিবর্তিত মধ্যপ্রাচ্য ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের উদীয়মান নিরাপত্তা বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির আলোকে এখনই কোনো সামরিক জোটে আবদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে পরিস্থিতির ক্রমবিকাশ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ, চুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রকৃত দায়বদ্ধতা মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, জ্বালানি, জনশক্তি ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ অনুসন্ধান করাই অধিক বিচক্ষণ কৌশল। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো একটি শক্তির নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া নয়; বরং পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের মধ্যে নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। মক্কা চুক্তি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর ও স্থায়ী আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় রূপ নেবে তা সময়ই নির্ধারণ করবে; তবে এর আবির্ভাব যে মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার বিকল্প ও পরিপূরক ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে—এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
লেখক : ডিরেক্টর জেনারেল, ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ
