দহনের দিন—সেপ্টেম্বর ১১ সাবিনা নিরু
পাতাল ফুঁড়ে ট্রেনটি যখন ইস্ট রিভারের ওপর ম্যানহ্যাটান ব্রিজে উঠে এলো, তখনই জানালা ছাড়িয়ে সব যাত্রীর চোখ আটকে গেল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সুউচ্চ ভবনের দিকে। ঘড়িতে তখন সময় সকাল ৮টা ৪৬ মিনিট হবে। পাখির মতো একটা প্লেন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উঁচু ভবনে আঘাত করেছে। কুন্ডুলি পাকানো কালো ধোঁয়া দেখে আমার বুকটা অজানা আশংকায় ধ্বক করে উঠলো। কিছু না বুঝেই মনের অজান্তে স্রষ্টার কাছে বিড়বিড় করে প্রার্থনা করলামÑ রক্ষা করো, কোন মানুষের যেন ক্ষতি না হয়। সেদিনটা ছিলো সেপ্টেম্বর ১১, ২০০১। অন্য আট—দশটা দিনের মতোই শুরু হয়েছিলো মঙ্গলবারের সকালটা। কে জানতো পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ত শহর নিউইয়র্কের সেই রৌদ্রোজ্জ্বল ও কর্মময় সকালটি মুহূর্তের মধ্যেই এক নরককুন্ডে পরিণত হবে! ট্রেনে বসা যাত্রীদের কোনো ধারণাই ছিলো না, কী হচ্ছে কিংবা কী ঘটে গেছে! সেদিন সকালে ঘর থেকে বের হওয়া হাজার হাজার সাধারণ মানুষ জানত না যে তারা আর কখনো তাদের স্বজনদের কাছে ফিরে যাবে না। কর্মজীবী মানুষগুলো নিশ্চয়ই আদরের সন্তানকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে কপালে চুমু দিয়ে বলেছিলোÑ ‘আই লাভ ইউ’। প্রতিদিনের মতোই কফি হাতে অফিসে ঢুকেছিলো, সহকর্মীদের ‘সুপ্রভাত’ জানিয়ে ডেস্কে বসে কাজ গুছিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করছিলো। ট্রেন থেকে নেমে দেখলাম চারপাশ থমথমে। পুলিশ, এম্বুলেন্সÑচেনা শহরটা কেমন থমথমে। অচেনা দুঃস্বপ্নের মতো লাগছে। দুরুদুরু বুকে অফিসে ঢুকলাম। সবার মুখে আতংক। টিভিতে সারাক্ষণই দেখানো হচ্ছেÑকী হয়েছে, কারা করতে পারে। পরে জেনেছি সন্ত্রাসীদের দ্বারা ছিনতাই করা চারটি যাত্রীবাহী বিমানের তিনটি দিয়ে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর, দক্ষিণ টাওয়ার এবং পেন্টাগনে আঘাত হেনেছে। চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভেনিয়ার স্যাক্সভিলে ফাঁকা মাঠে বিধ্বস্ত হয়। চাকুরিস্থলে আমি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও কারো আচরণে কোনোদিন কোন বৈরিতা দেখিনি, বরং একটু বেশিই সহযোগিতা, সম্মান পেয়েছি সবসময়। কিন্তু সেদিন যেন দৃশ্যপট পাল্টে গেল। ওদের চোখে কেমন জানি অবিশ্বাস, কথার টানে বিদ্রুপ শ্লেষ মেশানো। আমার নিজেকেই অপরাধী মনে হচ্ছিলো। প্রচন্ড কষ্টে বুকটা ভেঙে যাচ্ছিলো যেন। টিভি পর্দায় নিখোঁজ স্বজনদের আহাজারিতে সব শূন্য লাগছিলো। আমার দু’বছরের মেয়ের মুখটা মনে পড়ছিলো শুধুÑ আমিও তো ওদের একজন হতে পারতাম! ২৯৭৭টি নিরপরাধ তাজা প্রাণ সন্ত্রাসী হামলায় নিমিষেই খুন হলো যারা তাদের প্রিয়জনকে সকালে বিদায় নেওয়ার সময় হয়তো বলেছিলো ‘সন্ধ্যায় দেখা হবে’। মৃত্যুর আগে শেষবারের মতো প্রিয়জনের কন্ঠ শোনার জন্য ফোন করেছিলো, বলেছিলো— ‘আই লাভ ইউ’। আহা..তারা আর কেউ ফেরেনি। ‘যে শহর কখনো ঘুমায় না’ সেই ইমিগ্রান্টদের শহর নিউইয়র্কের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি দেখার দুর্ভাগ্য আমার হয়েছে। বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং কলকাকলিতে মুখরিত শহরটি সেদিন ভরদুপুরেই ঘন আঁধারে ডুবে অচেনা হয়ে উঠেছিলো। এবং সেদিন থেকেই বদলে গেছে সবকিছু। সহমর্মিতা, সহানুভূতি, সহযোগিতার স্থান রাতারাতি দখল করে নিয়েছে সন্দেহ, অবিশ্বাস, বৈষম্য, বর্ণবাদী আক্রমণ, ইসলামোফোবিয়া। বিভীষিকাময় সেই দিন সারা জনমের জন্য ক্ষত হয়ে আছে বুকে। জানিনা কে কোথায় কী পেলো, বিশ্ব রাজনীতিতে কে কোথায় লাভবান হলোÑ শুধু জানি ২৯৭৭ নিরপরাধ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থের জন্য। এই মানুষগুলোকে জড়িয়ে ছিলো আরো হাজার হাজার মানুষ। কত শত সংসারে নিমিষে নেমে এলো ট্রাজেডি। স্বজন হারানো মানুষরা কি কখনো বিস্মৃত হবে এই দিনটির কথা? সেপ্টেম্বর ১১’র মতো বিভৎস আঁধার দিন যেন পৃথিবীর আর কোথাও কোনদিন না আসেÑ কায়মনোবাক্যে এই প্রার্থনা করি। যারা সেদিন চলে গেছেন তাদের আত্মার চিরশান্তি কামনা করছি।
