টাওয়ার—পোড়া ছাই, মানুষ—পোড়া গন্ধ || নাজনীন সীমন

কে না জানে যে দুর্ঘটনা কখনও বলে কয়ে আসে না। ছোটবেলা থেকে কত বিপদের সামনে যে পড়েছি এবং এখনও পড়ছি, ইয়ত্তা নেই। আর চর্মচক্ষে সাক্ষী হলাম পৃথিবী জুড়ে অগণিত মানুষের অসংখ্য অনাকাক্সিক্ষত বিপর্যয়ের। বইয়ের পাতায় হিরোশিমা, নাগাসাকির কথা পড়তে পড়তে কত ভেবেছি এই ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী মানুষের কথাÑকে কি করছিলো ঠিক আগ মুহূর্তে, বোমা পড়ার পর, তারপর, তারও পর। দুই মহাযুদ্ধ সম্পর্কে জেনে শিউরে উঠেছি তো বটেই, যুদ্ধ যে অমানবিকতার শিকার করে মানুষকে, অসহায় করে তোলে, মৃত্যুকে ঝুলিয়ে রাখে দোরগোড়ায়, ব্যথিত হয়েছি সে কারণে। একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধের কাল, কতটা যে হিংস্রতাপূর্ণ, বর্বর, পৈশাচিক ছিলো, ভাবতেই কুঁকড়ে গিয়েছি ভয়ে। অনিশ্চয়তা আতঙ্কে মানুষ কিভাবে দিন কাটিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধারা কিভাবে মৃত্যুর নিঃশ্বাস ঘাড়ে নিয়েই পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেছেন দিনের পর দিন, অবাক হয়েছি ভেবে। কিন্তু কারো কাছ থেকে শোনা বা বইয়ের পাতায় পড়া আর বাস্তব জীবনে ঘটনার মুখোমুখি দাঁড়ানো সম্পূর্ণ আলাদা। হাতে কলমে হলেই নাকি প্রকৃত শিক্ষা লাভ হয়; কিন্তু এহেন প্রত্যক্ষ শিক্ষা যে কত ভয়াবহ, কতটা যন্ত্রণার হতে পারে, ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারো তা অনুধাবন অসম্ভব। 

সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় মঙ্গলবার। ২০০১। দুই মাসের বেশী স্কুল বন্ধ থেকে সবে খুলেছে। ভোরে উঠে কবিকে মানে হাসানআল আব্দুল্লাহকে বিদায় দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ি প্রতিদিনের মতোই। পাশে দেড় বছরের একক। ওকে কখনও অন্য কারো কাছে রাখিনিÑঅপরের ওপর আমার আস্থার অভাব বেশী। না সেই সময় খুব হিসাব করে চলা সংসারে সেটা কষ্টকর হতো বলে, নাকি দুটোইÑবলতে পারবো না। তবে সবচেয়ে বড় কারণ ছিলো সাধ্যানুযায়ী ছেলেকে পুরোটা সময় দেয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। ফলে সে সময়টা বিকেলে কাজ করতাম। ওর বাবা স্কুল থেকে ফিরে ওকে দেখতো, আর আমার তখন কাজের বেলা হতো। ফলে সকাল বেলাটা একটু দেরীতেই উঠতাম। ২০২৪ প্রকাশিত আমার প্রথম উপন্যাসে লিখেছিলাম:

টুইন টাওয়ারে আক্রমণের দিনও ঘরেই ছিলাম। ঘুমিয়ে। আটটা পঞ্চাশ কি পঞ্চান্নতে বর ফোন করে বললো বোধ হয় বিমান একটা কোনোভাবে টুইন টাওয়ারে আঘাত করেছে; খুব বড় দুর্ঘটনা। টিভি খুলতে বলেই ফোন রেখে দিলো। রিমোট চেপে টিভি খুলতে না খুলতে আধো বোজা চোখ আমার ছানাবড়া হয়ে গেল। যন্ত্রের মধ্যেই দেখলাম চোখের নিমেষে একটি বিমান দক্ষিণ টাওয়ারে ঢুকে গেল। তারপর কি আর পলক ফেলা যায়! ঠায় বসে রইলাম। বুঝতে পারছিলাম না কিছু। নয়টা ঊনষাট ছাপ্পান্ন মিনিট ধরে জ্বলার পর চোখের সামনে অত্যন্ত সুন্দর টাওয়ারটি ধ্বসে পড়লো যেন বালির প্রাচীরের মতো। যদিও প্রথম আঘাতপ্রাপ্ত টাওয়ারটি তখন জ্বলছিলো। তারপর দীর্ঘ এক ঘণ্টা বেয়াল্লিশ মিনিট জ্বলতে জ্বলতে মানুষদের জ্বালাতে জ্বালাতে, দম বন্ধ করে মারতে মারতে দশটা আটাশে উত্তর টাওয়ারটি ধ্বসে পড়লো। সারাটা দিন টিভি চললো আর ফোনের জন্য বসে রইলাম। নিজে যে যোগাযোগ করবো, তেমন কোনো সুযোগ ছিলো না, এমনকি নম্বরও ছিলো না। অপেক্ষা করতে করতে বিকেল গড়াতে চললো। ভয়ে হাত পা ভিতরে সেঁধিয়ে যাবার মতো অবস্থা তখন। উপায়ন্তর না পেয়ে একটি নম্বরে ফোন করি যিনি একই জায়গায় কাজ করতেন তখন। ফোন তিনি ওঠালেনও এবং স্বস্তির শ্বাস ফেলার আগেই চরম অস্বস্তিতে মনে হলো ফোন না করাটাই ভালো ছিলো। অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে অমন শিক্ষিত মানুষটি আমাকে বোঝালেন এতোক্ষণেও যখন ফেরেনি, হতেই পারে আর ফিরবে না। আজ লিখছি বটে, কিন্তু সেই সময় যেন গ্রীক দেবতার কন্যা নায়োরবি হয়ে গিয়েছিলাম আমিÑশোকে নয়, আতঙ্কে, যেন চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়েছিলাম। নাইন ওয়ান ওয়ান কল করে তখন পুলিশের সাহায্য পাওয়া আমার অসম্ভবই মনে হয়েছিলো; কোলের শিশু নিয়ে কিভাবে, কোথায় খুঁজতে যাবো অচেনা রাস্তায়Ñমাথা ঘুরছিলো। মনে হচ্ছিলো হাসপাতালে ফোন করি। পরে ভাবলাম, ওখানেও তো একই অবস্থা হবে, টিভিতে দেখে তাই মনে হলো। দেশে ফোন করবো, তার উপায় নেই। কার্ড তো ছিলোই না, ফোনও যাচ্ছিলো না সরাসরি নম্বরে। এখনও আমি শিউরে উঠি দমবন্ধ সেই সময়ের কথা মনে করে। তবে এখন সাথে আরো ভাবি, একজন মানুষ কিভাবে বিপদের দিনে অমন কথা নিঃসঙ্কোচে বলে দিতে পারে! আজও তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবি, এই মানুষটিই কি বলেছিলো আমাকে বিধবা জীবনের প্রস্তুতি নিতে? মুখের মানচিত্র মেলাতে পারি না কোনো মতে কেননা এই মানুষটির অত্যন্ত মানবিক, সহমর্মী রূপ আমি দেখেছি বহুবার আজ অবধি। তাহলে সাক্ষাৎ মৃত্যু থেকে বেঁচে যাওয়ার আনন্দে বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়েছিলেন মুহূর্তে কিংবা জীবনকে উদযাপন করতে গিয়ে ভুলে গিয়েছিলেন অন্য জীবনের মর্ম? ফ্ল্যাটের বিপরীত দিকে থাকতেন ভারতীয় এক বৃদ্ধ দম্পতি। ভীষণ স্নেহ করতেন তাঁরা আমাকে। খোঁজ নিয়েছেন কিছুক্ষণ পরপর। ভদ্রমহিলা, মাসী ডাকতাম, আমাকে সান্ত্বনা দিলেন এটা বলে যেপতিকো দেবতা য্যায়সে সেবা যো নারী কারতাহে উসকা পতিকা কুছ নেহি হোগা। ভাগবান হ্যায় না; সব কুছ দেখতা হ্যায় উয়োবলে যিনি আমাকে শেখাতেন নিয়মিত পতিদেবকে কোন প্রকারে খুশী রাখা যায়, কোন কোন দায়িত্ব পালন করতে হয় তার প্রতি যার মধ্যে অন্যতম ছিলোস্বামীনা খাওয়া পর্যন্ত অভুক্ত থাকা.. ..সেই মাসী নিজেই সেদিন আমাকে বসিয়ে খাইয়েছেনফিকার মাত কারোবলতে বলতে। সেদিন সকালের একটি ঘটনা বহু ঘণ্টা ধরে বর্তমান ভবিষ্যতের মধ্যে একটি অলঙ্ঘনীয় দেয়াল তুলে দিয়েছিলো যা ভেদ করে কোনো ক্রমেই ধারণা পর্যন্ত করতে পারছিলাম না কী অপেক্ষা করতে পারেÑফিরে আসতে পারে, লাশ শনাক্তের জন্য ডাক পেতে পারি, দেহ বলে কিছু অবশিষ্ট না থাকতে পারে, পঙ্গু হতে পারে, কখনোই আর খুঁজে না পাওয়া যেতে পারে। এমনই অনতিক্রম্য দেয়াল দিয়েই হয়তো মানুষের জীবনের মানচিত্র আঁকা থাকে।

আমি নিশ্চিত ছিলাম দেশে মাবাবা সহ সবাই ভীষণ দুশ্চিন্তা করছেন। পরে জেনেছি, বহুবার তাঁরা চেষ্টা করেছেন খবর নিতে এবং প্রতিবারই টাকা কেটে নিয়েছে সংযোগ ঘটা ছাড়াই। প্রতিবেশী ভিনদেশী মাসী নিজ থেকেই এগিয়ে আসলেও বিরক্ত না করার চিন্তায় নিজের ঘরেই এসে বসেছিলাম। পরিবার পরিজন ছেড়ে থাকতে এমনিতেই কষ্ট হতো বিদেশ বিভূঁইয়ে, কিন্তু তখনকার মতো অসহায় কখনোই বোধ করিনি। না, একটি মানুষও অর্থাৎ পরিচিত কেউ, যাঁরা বহুবার ঘরে এসেছেন এবং যাঁদের কারো কারো ঘরে হয়তো আমরাও গিয়েছি, কেউই একটি বারের জন্যও খোঁজ করেননি। হতেই পারে, আমার মতো তাঁরাও কারো না কারো ফেরার অপেক্ষায় উদ্বিগ্ন ছিলেন। কিন্তু নিউইয়র্কের বাইরে যাঁরা থাকতেন, তাঁরাও না। এখন ধারণা করি যদি কিছু হয়ে যেতো, কাউকেই পাশে পেতাম না। ভাবি, মানুষ হলো সুখের পায়রা!

টিভি চ্যানেল ছেড়ে, কর্ডলেসটা হাতে নিয়ে একককে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানোর সময়টুকু ছাড়া সারাক্ষণ জানালার পাশে পাতা টেবিলের ওপর বসে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। সূর্য ডুবে অন্ধকার হলো চারপাশ। আমার চতুর্পাশও তখন ঘোর অন্ধকার মনে হতে লাগলো। প্রায় বারো ঘণ্টা পর বাসার সামনের পার্কের ওপাশ দিয়ে কাউকে হেঁটে আসতে দেখলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস না করা মানে কি, সেদিন বুঝেছিলাম। খাদের কিনার থেকে পড়তে পড়তে বেঁচে যাওয়ার অর্থও হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলাম সেদিন। নানা পথ ঘুরে হেঁটে, কিছুটা ট্রেনে চড়ে তিনি ফিরলেন।

ঠিক এর পরের দিনই বাসার সামনে পার্ক করা গাড়ির টায়ার কেউ সযত্নে ফেঁড়ে দিয়ে গিয়েছিলো। চোখে দেখা নয়, তথাপি হয়তো ঘটনা পরম্পরায় দুয়ে দুয়ে চার করতে শুরু করলামÑধর্মীয় সম্পৃক্ততার কারণে বেছে বেছে আমাদের গাড়িরই এই দশা করা হয়েছে ইচ্ছাকৃত। তাছাড়া ভিন্ন একটি কারণ ছিলো এটা যে এলাকাটি ছিলো অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন নিরাপদ এবং সাড়ে চার বছরে প্রথম। ফলে সেদিন, বুধবারও কাজে যাওয়া হলো না। হেঁটে যেতেই পারতাম, মিনিট চল্লিশেক খরচ করে, কিন্তু রাতে ফিরে আসার দুশ্চিন্তায় যাওয়া বাদ দিতে হলো। পরের দিন থেকে রাইট এইডের ম্যানেজার ফোন দিতে শুরু করলেন। দুটো বিল্ডিং ধ্বসে পড়েছে, কত মানুষ নিহত, আহত হয়েছে, তার সঠিক সংখ্যা তখনও মেলেনি। কিন্তু তার জন্য কি জীবন পড়ে থাকে! কখনও কোনো দিন কারও জন্য কিছু পড়ে ছিলো

সেই থেকে কত বার যেটেরোরিস্টশব্দটি ছুঁড়ে দিয়েছে কেউ কেউ! তারও চেয়ে বড় কথা, নিজেকে কেন যেন অপরাধী মনে হতে লাগলো। অথচ আমি তাদের কেউ নই, তাদের গোত্রভুক্ত নই, সন্ত্রাস তো দূরের কথা, জাতধর্মবর্ণলিঙ্গসম্পদ ইত্যাদি নানা কারণে মানুষে মানুষে ভেদাভেদের বিপক্ষে আমার অবস্থান বরাবরই। কিন্তু বলতে পারিনি আমিও ভুক্তভোগী। কাউকে জানাতে পারিনি আমার দমবন্ধ, গভীর অন্ধকার, অথৈ জলে হাবুডুবু খাওয়ার বারো ঘণ্টার কথা। কাউকে বলতে পারিনি টিভির পর্দায় মানুষের ছোটাছুটি, অসহায় মুখ, আহত শরীর, বিধ্বস্ত উদ্ধারকর্মীর চেহারাÑসব মিলিয়ে এই ভয়াবহ দৃশ্য মানসিকভাবে কতটা ন্যূন করে তুলেছে, কতখানি কষ্ট দিয়েছে আমাকে! কাউকে বলার সুযোগ হয়নি যে একটি মৃত্যু কেবল একটি শরীরের প্রস্থান নয়, এর সাথে জড়িত থাকে আরও অনেক মানুষের জীবন। ফলে ব্যক্তির শারীরিক মৃত্যু আরও অনেকের মানসিক মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

খুব করে চাই পৃথিবীতে আর কারও জীবনে এমন সময় যেন কখনও না আসে! অকালে কোনো প্রাণ যেন আর না যায়! মানুষ যেনমানুষহয়ে ওঠে। এই সন্ত্রাসী ঘটনার কারণ, ফলাফলÑএতে কার ঠিক কতটুকু লাভ হলো, ক্ষতি কার কতখানি, ভাবলে ভালো হতো। কিন্তু আমার ভাবনায় কি আসে যায়! কার কথা কে ভাবে, আর কে বা শোনে! তবে নাইন ইলেভেনকে একটি জরুরী সঙ্কেত ভেবে উপযোগী ব্যবস্থা নিলে, পরিশুদ্ধ হলে হয়তো মানুষ হিসাবে কিছুদিন এই নীল গ্রহে শান্তিতে সবাই থাকতে পারতাম! অন্তত যদি কিছু শিখতাম! ঘটনাস্থলে না থেকেও এখনও মনে হয় টাওয়ারপোড়া ছাই আমাকে আপাদমস্তক ঢেকে ফেলছে, মানুষপোড়া গন্ধ এখনও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।


Related Posts