উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বাংলাদেশে জমির নামজারিতে পরিবর্তন এল

বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনঃ বাংলাদেশে ক্রয় বা উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিকানা পাওয়ার পর যেমন রেজিস্ট্রেশন করতে হয়, তেমনি নামজারি বা মিউটেশনের মাধ্যমে সরকারি রেকর্ডে মালিকানা নথিভুক্ত করাও বাধ্যতামূলক। কারণ নামজারি ছাড়া জমি কেনাবেচা, দান এমনকি খাজনা দেওয়াও সম্ভব নয়। সম্প্রতি নামজারির এই প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তন এনেছে ভূমি মন্ত্রণালয়।

ভূমি নামজারি বা মিউটেশনের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিতে ভাগবাটোয়ারা না হলে কোনো আলাদা খতিয়ান হবে না, বরং একই খতিয়ানে সবার নাম যৌথভাবে থাকবে।

এক্ষেত্রে ওয়ারিশদের যৌথ নামজারির জন্য আলাদা করে কোনো বণ্টননামা দলিলের প্রয়োজন নেই। তবে, আলাদা খতিয়ান করতে চাইলে বা পৃথকভাবে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে চাইলে নিবন্ধিত আপোষবণ্টননামা দলিল থাকতে হবে।

নতুন নিয়মে কেবল যৌথ নামজারির ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ যথেষ্ট হলেও জমি ভাগ করে আলাদা আলাদা খতিয়ান চাইলে রেজিস্টার্ড বণ্টননামা লাগবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নিয়মের মাধ্যমেবিশেষ করে ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রেআগে যৌথ, পরে আলাদানীতি চালু হয়েছে।

এর ফলে সরকারি রেকর্ডে প্রকৃত মালিকের নাম নিশ্চিত করা এবং ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ কমানো সম্ভব হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

এছাড়া যৌথ নামজারির বাধ্যবাধকতা ওয়ারিশদের মধ্যে স্বচ্ছতা আনবে এবং নামজারি ছাড়া জমি বিক্রি বন্ধ হওয়ার ফলে, অবৈধ দখলও কমবে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।

নামজারি কী এবং কেন জরুরি?

ক্রয় বা উত্তরাধিকার সূত্রে একটি জমির মালিকানা পাওয়ার ক্ষেত্রে কেবল রেজিস্ট্রেশন করলেই কাজ শেষ না, নামজারির মাধ্যমে সরকারি রেকর্ডে মালিকের নামও নথিভুক্ত করতে হয়।

বাংলাদেশে বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ভূমিসেবা পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনেই নামজারির আবেদন করা যায়। নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে ২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যেই এই প্রক্রিয়ার নিষ্পত্তি করা হয়।

সহজ কথায়, জমি কেনা বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার পর সরকারি রেকর্ড বা খতিয়ান থেকে আগের মালিকের নাম বাদ দিয়ে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করাকেই নামজারি বলে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জমির নামজারি করা না হলে বেশ কিছু সমস্যা তৈরি হতে পারে।

এক্ষেত্রে মালিকানার ঝুঁকি তৈরির শঙ্কা রয়েছে এবং রেকর্ডে নাম না থাকলে অবৈধ দখলদার বা অন্য ওয়ারিশ জমির দাবি করতে পারে।

নতুন আইনে নামজারি বা খতিয়ান ছাড়া কোনো জমি রেজিস্ট্রি, দান বা হেবা করা যাবে না।

এছাড়া ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা দিতে গেলেও নিজ নামে খতিয়ান লাগবে।

নতুন নিয়মে যেসব পরিবর্তন

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের জারি করা এই সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে থাকা পরিবর্তিত নিয়ম এখন থেকে কার্যকর করা হয়েছে।

যেখানে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিতে ওয়ারিশদেরসবার নাম একসাথেথাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ আগে বাবা মারা গেলে পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে একজন নিজের নামে আলাদা নামজারি করে নিতে পারতেন। এখন থেকে সেটি আর হবে না। নতুন নিয়মে মৃত ব্যক্তির সব ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করে যৌথভাবে নামজারি করতে হবে। যেটিকোশেয়ারারহিসেবে দেখানো হবে।

আবেদনের সময় সব ওয়ারিশের তথ্য, ওয়ারিশ সনদ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র একসঙ্গে দাখিল করা বাধ্যতামূলক। এক্ষেত্রে কোনো ওয়ারিশ যদি বাদ পড়ে, তাহলে আবেদনটি নামঞ্জুর হতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলছেন, অনেক সময় এক বা দুইজন ওয়ারিশ বাকিদের বাদ দিয়ে জমি নিজের নামে করে নিতেন, এখন সবাইকে একসাথে আনায় সেই সুযোগ বন্ধ হলো।

তবে, শুধু বণ্টননামা না থাকার কারণে যৌথ নামজারির আবেদনও আর নামঞ্জুর করা যাবে না।

মিস হাসান বলছেন, ‘আগে অনেক ভূমি অফিস বণ্টননামা না থাকলে যৌথ নামজারিও নামঞ্জুর করত। এখন মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে, শুধু এই কারণে আবেদন বাতিল করা যাবে না।

এই পরিবর্তনের ফলে নামজারি সহজ দ্রুত হবে বলেই মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী।

এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র বা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনারের কাছ থেকে ওয়ারিশ সনদ নিতে হবে বলেও নতুন নিয়মে উল্লেখ করা হয়েছে।

আলাদা খতিয়ান চাইলে যা লাগবে

পৈতৃক বা যৌথ মালিকানাধীন কোনো সম্পত্তি যখন অংশীদাররা নিজেদের মধ্যে আপসমীমাংসার মাধ্যমে যার যার অংশ বুঝে নেন এবং সেটি সরকারিভাবে নিবন্ধন করান, তখন সেই লিখিত চুক্তিপত্রকে বলা হয় রেজিস্টার্ড বণ্টননামা।

এক্ষেত্রে ওয়ারিশরা যদি নিজেদের মধ্যে জমি ভাগবাটোয়ারা করে নেন, তাহলে আলাদা আলাদা খতিয়ান করা যাবে।

তবে এখানেও একটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে শর্ত হলোনিবন্ধিত বণ্টননামাবাআপোষবণ্টননামা দলিলথাকতে হবে।

অর্থাৎ এখন থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারির দুইটি পথ।

প্রথমত, যৌথ নামজারিসবাই মিলে এক খতিয়ানে নাম উঠবে। যেখানে প্রত্যেকের প্রাপ্য হিস্যাও উল্লেখ থাকবে।

অথবা পৃথক নামজারিনিবন্ধিত বণ্টননামা অনুযায়ী প্রত্যেকে নিজ নামে আলাদা খতিয়ান পাবেন।

নামজারি ছাড়া রেজিস্ট্রেশন হবে না

অতীতে অনেক সময় নামজারি ছাড়াই জমি কেনাবেচা হতো। এখন আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, নামজারি বা খতিয়ান ছাড়া কোনো জমি কেনাবেচা, দান বা হেবা করা যাবে না।

এর ফলে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধনের সময় নামজারির খতিয়ান দেখানো বাধ্যতামূলক।

এক্ষেত্রে অনেকের প্রশ্ন রয়েছে যে, আগে নামজারি করা থাকলে আবারও নামজারি করতে হবে কি না?

অর্থাৎ কারো জমি ২০১৫ সালে নামজারি করা আছে, আবার করতে হবে কি না?

এক্ষেত্রে নতুন করে নামজারির প্রয়োজন নেই। যাদের নামজারি আগেই সম্পন্ন হয়েছে এবং খতিয়ান সঠিক আছে, তাদের নতুন করে নামজারি করতে হবে না।

তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, পুরোনো রেকর্ডগুলো ডিজিটাইজড হয়েছে কিনা, সেটি অনলাইনে যাচাই করে নেওয়া ভালো।

ডিজিটাল সিস্টেমে না থাকলে ভবিষ্যতে খাজনা বা বিক্রিতে সমস্যা হতে পারে।

Related Posts