সোশাল মিডিয়ায় আসক্তি

 নতুন সহ¯্রাব্দের, এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সমাজবিবর্তক প্রাপ্তি হলো সোশাল মিডিয়া। পৃথিবীর ৮৩১ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৫৬৬ কোটি মানুষই কোনো না কোনো সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করে। যেমন সর্বাধিক মানুষ ব্যবহার করে ফেসবুক। এর সংখ্যা ৩০৭ কোটি, এরপর রয়েছে ইন্সটাগ্রাম ২৪০ থেকে ২৮০ কোটি মানুষ। অন্য মিডিয়ার মধ্যে হোয়াটসএ্যাপের ব্যবহারকারী ২০০ কোটি, ইউটিউবের ২৫০ কোটি, টিকটকের ১৫৯ কোটি, স্ন্যাপচ্যাটের ৯৪ কোটি ৬০ লক্ষ আর সাবেক টুইটার, বর্তমানে এক্স ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬১ কোটি ১০ লক্ষ।

স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মেয়ো ক্লিনিক সোশাল মিডিয়া ব্যবহারকারী নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের ওপর এর প্রভাব নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাধমীর্ নিবন্ধ প্রকাশ করে গত বছর ডিসেম্বরে। এই গবেষণায় উঠে এসেছে যে বর্তমানে অত্যন্ত ব্যস্ত বিচ্ছিন্নতার সময়ে সোশাল মিডিয়া কিশোর কিশোরীদের মনে একাকীত্ববোধ বিচ্ছিন্নতাবোধের ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে সহায়তা করছে। পাশাপাশি নানাভাবেই বিবিধ জরুরী বিষয় থেকে তাদের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে। তাদের বইপড়া, মুভি দেখা, মিউজিয়মে যাওয়ার প্রবণতা থেকে সরিয়ে নিচ্ছে। ঘুমানোর সময় কমিয়ে এরা সোশাল মিডিয়ায় ব্যয় করছে। ঘুমের সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। খাওয়ার নিয়ম ভেঙে গেছে। খেলাধূলার প্রতি অনাগ্রহের কারণে অনেকের শারীরিক স্থূলতা বেড়ে যাচ্ছে। সোশাল মিডিয়ার মূল উপকরণ হচ্ছে এর উদ্ভাবক এবং বিস্তৃতকারীরা এর মধ্যে মানসিকভাবে তরুণদের দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখার জন্য এমন সব আকর্ষণীয় আসক্তির অনুষঙ্গ সন্তর্পণে ইনজেক্ট করে দিচ্ছে, তা এক ধরনের ট্র্যাপের মত। যারা এই ট্র্যাপে বাধা পড়ে তারা তাদের বন্ধুচক্র থেকেই এমন সব বুলিইং এর শিকার হয় যে এর থেকে বেরিয়ে আসার চেয়ে বরং মানসিক বৈকল্যে নিক্ষিপ্ত হয়। কেবল ব্যবসা বৃদ্ধি এবং মুনাফার লোভের কারণে এর নিয়ন্ত্রকরা পৃথিবীর কোটি কোটি কিশোরকিশোরীকে বিকশিত হতে যেভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, তার প্রতিফল হয়ত বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করবে এক যুগ বা তারও পরে।

মেয়ো ক্লিনিকের গবেষণায় উঠে এসেছে সোশাল মিডিয়া ব্যবহারে তরুণ তরুণীরা যতটা উপকৃত, তার চেয়ে এর ক্ষতিকর দিক বেশি। ভাল দিকগুলির মধ্যে আরো আছে। সেগুলো হচ্ছে নিজেকে প্রকাশ করার প্লাটফর্ম পাওয়া, কাছের এবং দূরের সমবয়সীদের সাথে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ, অন্য সমবয়সীরা কীভাবে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তার আদানপ্রদানের সুযোগ, নিজের সমস্যার বিশেষ করে মানসিক সমস্যার বিষয়েও মতবিনিময় করার সুযোগ।

আর খারাপের মধ্যে তরুণতরুণীদের বৌদ্ধিক এবং মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ করে দেয়া। পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পেরে আমেরিকার ৪৭টি স্টেটের এটর্নি জেনারেলরা সোশাল মিডিয়ার সবচেয়ে বড় প্লাটফর্ম মেটার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ আদায় করেছে। এই অর্থ ব্যয় করা হবে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসায়। এই মামলায় যে মূল অভিযোগ ছিল মেটার বা এর উদ্ভাবক অন্যতম ডিজাইনার মার্ক জাকারবার্গের বিরুদ্ধে তাহলো, সোশাল মিডিয়ায় তারা এডিক্টিভ প্রোডাক্ট বা আসক্তিমূলক অনুষঙ্গ ঢুকিয়ে দিয়েছে। ফলে তরুণতরুণীরা এর মধ্যে ঢুকলে বের হতে পারবে না। এই মামলার শুনানিতে মার্ক জাকারবার্গ বারবার একটি বাক্য ব্যবহার করেছেন তাহলো, আপনারা একে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছেন (ইউ আর মিসক্যারেক্টারাইজিং দিস) এই মামলার ট্রায়াল হয় প্রথমে টেনিসির ন্যাশভিলে, তারপর ক্যালিফোর্নিয়ায়। নিউইয়র্ক টাইমস সোমবার এই মামলার বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন ছেপেছে।

বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়েই নানা অস্থিরতা। সর্বত্র অস্থিরতা, ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং প্রতিবাদ, দেশে দেশে যুদ্ধবিগ্রহ। কিছু বিশ্বমোড়ল পৃথিবীর মানুষদের জীবন এবং জীবনযাপনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সমাজের বিভিন্ন পর্যায়কে নতুন আলো বিচ্ছুরণের পাশাপাশি চরম অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করছে ভবিষ্যতজব মার্কেটবিষয়ে। আর ডিজিটাল বিশ্বে যু্দ্ধ ডিজিটাল হয়ে যাওয়ায় নির্দিষ্ট টার্গেটভিত্তিক হামলা হয়ত জীবনহানি ঘটাচ্ছে কম, কিন্তু স্থাপনা ধ্বংসে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

প্রযুক্তিগত জয়জয়কারের প্রতিধ্বনি নতুন সহ¯্রাব্দের শুরুতে যে যে আশার সুর তৈরি করেছিল, তা এই প্রযুক্তির মাধ্যমেই যেন ধ্বংসের কিনারে এসে পৌঁছেছে। কিছু মানুষের পুঁজির লোভ কোটি কোটি তরুণতরুণীকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি না করে অবলীলায় মানসিকভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বোঝাই যায় যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যে মানব মানবতার বিকাশকে অথর্ব করে দেবে সেখানে আজকের নতুন প্রজন্ম যেন ধ্বংস হয়ে যায় মানসিক বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতায় তারই এক নিপুণ ষড়যন্ত্রের ছক তৈরি হচ্ছে। এই তথ্য কী ভয়াবহ তা কল্পনাও করা সম্ভব নয়।

খুব সাধারণ চোখে দেখলেও বোঝা যায়, সংবাদ মাধ্যমকেফেক নিউজ, ফেক নিউজবলে ধ্বংস করে দিয়ে নতুন এক সত্যকে প্রতিষ্ঠা করারও ষড়যন্ত্র লক্ষণীয়। এই সত্য প্রকৃত সত্য নয়, এই সত্য অল্টারনেটিভ ট্রুথ, হাফ ট্রুথ, ভাচুর্য়াল ট্রুথ। কারণ প্রকৃত সত্যকে প্রমাণ করতে পারলেও তা বিশ্বাস করানো সম্ভব হচ্ছে না সোশাল মিডিয়ার অবাধ, সেন্সরহীন, দায়িত্বহীন, অজ্ঞনতাবশত বা জ্ঞাতসারে ব্যবহারের কারণে। সোশাল মিডিয়ার কারণে ক্ষুদ্রকে অহেতুক বৃহৎ, আর বৃহৎকে অহেতুক ক্ষুদ্র হিসাবে প্রচার করে, প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে বা অল্প বা অর্ধ শিক্ষার কারণে অন্যের চরিত্র হনন, গালিগালাজ, অশ্লীলতা প্রকৃত প্রতিভা বা মননকে বুঝতে শুধু যে অন্যরা বিভ্রান্ত হচ্ছে তা নয়, তাদের অনেকে বিশ্বাসও করছে না।

মানুষ মৌলিকভাবে আত্মপ্রচারপ্রবণ, আগে কেবল টিভি বা সিনেমায় যারা সুযোগ পেত বা যাদের মেধা বা যোগ্যতা আছে তারই কেবল নিজেদের তুলে ধরার সুযোগ পেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করত। এখন সোশাল মিডিয়ার কারণে যে কোনো মানুষের কিচেন বা ডাইনিং টেবিল থেকে লিভিংরুমের ছবিও প্রকাশ করতে পারছে যে কেউ। যারা এসব করছে তারা এই সুযোগ ছাড়বে কেন?

মেটা, ইন্সটাগ্রাম, ফেসবুক, স্ন্যাপচ্যাট, হোয়াটসএ্যাপ, ইউটিউব, টিকটকের নির্বাহীরা মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে বলেছেন, এটা তাদের বাক স্বাধীনতা। ফাস্টর্ এমেন্ডমেন্ট তাদের সাংবিধানিক সুরক্ষা দিয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার এটর্নি জেনারেল রব বন্টা প্রত্যুত্তরে জানান, ‘ঝবপঃরড়হ ২৩০ ধহফ ঃযব ঋরৎংঃ অসবহফসবহঃ ধৎব হড়ঃ রসঢ়বহবঃৎধনষব ংযরবষফ ঃড় যড়ষফরহম গবঃধ ধপপবংংরনষব.’

আর মেয়ো ক্লিনিক তাদের গবেষণায় বলছে, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো অর্ধগৃধ্নু। তারা কোনো না কোনোভাবে আর্থিক লোভের কারণে, নতুন নতুন আসক্তিমূলক কম্পোনেন্ট যোগ করবেই। তাই সচেতনতা তৈরি করতে হবে ঘর থেকেই, পিতামাতাদেরই। এটা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হলেও তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে তাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদÑ সন্তানদের সুরক্ষায়।

Related Posts