আলী সিদ্দিকীর একগুচ্ছ কবিতা

ব্যথারও আছে জয়গান

তুমি তো রইলে না প্রিয়

আক্ষেপটুকু না হয় থাক

থাক তোমাকে হঠাৎ হারিয়ে ফেলার মর্মবেদনা 

শোকাগ্নিতে পুড়ে পুড়ে খাক হয়ে যাক হৃদয়পুর।


তুমি না হয় ছেড়ে দিয়েছো হাত নিজেরই অজান্তে

স্পর্শহীন আঙুলগুলো জমে জমে হোক মৃত পাথর

হৃদয় কুসুম সংক্রান্তি হয়ে যাক বোধহীনতায় নিথর

মোহমায়ার পঞ্চ ব্যঞ্জন বিস্বাদের সমুদ্রে তলিয়ে যাক


তুমি না হয় চলে গেছো বন্ধু 

আমাকে করে গেছো নিরাশ্রয়

নিজ বাসভূমে হয়ে গেছি নীরবতার জমাট পাহাড়

তোমার যাপিত প্রহরগুলো উন্মাতাল নৃত্যে মশগুল।


তুমি হয়তোবা ভুলে গেছো তোমার সকল বিনির্মাণ 

উদ্বেল বসন্তে যৌথ রচনার অনবদ্য সব পঙতিমালা

খোদার আরশে সমর্পিত কল্যাণের সব অনুচ্চ গান

হয়তো ভুলে গেছো তোমার ব্যথারও আছে জয়গান।


শূন্যতায় নূপুর হয়ে বাজো

তোমার শূন্যতায় যখন আমি মূহ্যমান 

হরেকরকম ঢেউ নিয়ে তুমি 

আন্দোলিত হও

যেখানে হাত রাখি সেখানেই মর্মরিত 

তোমার স্পর্শের মোহ ঘ্রাণ 

আরশিতে তোমার কায়া প্রস্ফুটিত হতো

সেখানে নিজের দেখি নিঃস্ব অবয়ব

বালিশের যে পাশটায় ঘুমাতে

এখনো তুমি সরব সেখানে

সিঁড়ি ভাঙার যে শব্দরাশি বেজে উঠতো

সেই পদধ্বনি আমাকে সচকিত করে

আমি কান পেতে শুনি গুনগুনানো 

রবি নজরুল কিংবা লালন

শূন্যতার ভেতর বেজে চলো অহর্নিশ 

উজ্জ্বল নূপুরের মতো

আমি অন্ধ হয়ে যাওয়া প্রেমিক 

শূন্যতায় খুঁজে ফিরি ফুরিয়ে যাওয়া গল্প।


আরজি

তোমার সুবাস নিয়ে দিনের অভিষেক করি

সূর্যের মুখ দেখে তোমার হাসির ঝর্ণা আঁকি

আলোর মিছিল ছোটে ফুলেদের কলহাস্যে 

তোমাকে দেখি না বহমান দিনের ক্যানভাসে;


দিবসের দেবতা, আলোর ঈশ্বর, বায়ুর প্রভু

বিস্তৃত করে দাও আমার হৃদয়রঞ্জনের কায়া

অমুদ্রিত স্পৃহায় মুছে দাও নিগূঢ় কারাবাস

অচল সময়ের পায়ে পরাও অবিনশ্বর ঘুঙুর।


মৃত্যুদিনের সুগন্ধি নিয়ে বিষাদের চাষ করি

আগরবাতির ধোঁয়ায় অপার নাচে শোকাগ্নি

শূন্যতার খোরাক হয়ে আঁধারের সাথে লড়ি

অস্ফুট প্রচ্ছদ তুমি প্রতিভাত মোমের শিখায়;


নৈঃশব্দের প্রতিপালক, শূন্যতার মহান রাজা

মৃত নক্ষত্রদের সংসারে শব্দের ফোয়ারা দাও

বিগত আলোর পৃথিবীতে আনো নবজাগরণ

আমার প্রিয়ার তৃষিত ঠোঁটে এঁকে দাও জীবন।


বিদগ্ধ জলরাশি 

নিকষ রাত নিয়ে আসে তোমার নিঃশ্বাসের প্রতিধ্বনি

নৈঃশব্দের রুদ্ধ দুয়ারে বেজে চলে হৃদস্পন্দনের বাঁশি 

দূরের কলরোল নিশি ডাকা পাখির ভাঙা পালক যেন

ঢেউ তোলে বুকে ছলাৎ ছলাৎ বেদনা বিদগ্ধ জলরাশি।


প্রলয়

একটা পৃথিবী হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়লো।


যারা সমুদ্র স্নানে ছিলো তারা দেখলো 

বলা নেই কওয়া নেই পৃথিবী ফুঁস করে 

ডুবে গেলো সমুদ্রে


পাহাড়ের পর্যটকরা অবাক হয়ে দেখলো

অমাবস্যার অন্ধকারে ধপাস তলিয়ে গেলো

আস্ত একটা পৃথিবী


যারা বাজারে গেছে সওদা পাতি করতে

তারা দেখলো মৃগী রোগীর মতো কেঁপে কেঁপে 

সকল বাজারীসমেত হারিয়ে গেছে পৃথিবী


যারা যারা প্রেমের তীব্রতায় ভুলে গেছে চারপাশ 

তারা অকস্মাৎ দেখলো তাদের পৃথিবী 

বিদ্যুৎ চমকে দুভাগ হয়ে ঢেকে গেছে অন্ধকারে


যারা যারা দাবার ঘর সাজিয়ে নিমগ্ন হয়ে আছে

তাদের দাবার ছকে লুটিয়ে আছে আস্ত পৃথিবী।


Related Posts