৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্প ঃ মিজৌরি গন গার্লঃ জিলিয়ান ফ্লিন || আবদুল্লাহ জাহিদ নিউইয়র্ক

প্রেমের গল্প সাধারণত শুরু হয় দুজন মানুষের পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসার মধ্য দিয়ে। তারপর কাছে আসা, স্বপ্ন, সংসার, কখনো বিচ্ছেদ। কিন্তু গিলিয়ান ফ্লিনের এড়হব এরৎষ এমন এক প্রেমের গল্প, যেখানে ভালোবাসা ধীরে ধীরে পরিণত হয় প্রতারণায়, প্রতারণা প্রতিশোধে, আর দাম্পত্য হয়ে ওঠে এমন এক মনোস্তাত্ত্বিক যুদ্ধক্ষেত্র, যেখান থেকে বিজয়ী হয়েও কেউ সত্যিকার অর্থে ফিরে আসতে পারে না।

আমেরিকার মিজৌরি স্টেটের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাস শুধু একটি রহস্যকাহিনী নয়; এটি আধুনিক বিবাহ, নারীপুরুষের পারস্পরিক প্রত্যাশা, সামাজিক অভিনয়, সংবাদমাধ্যমের ক্ষমতা এবং মানুষের নিজের জন্য নির্মিত মুখোশের এক নির্মম ব্যবচ্ছেদ।

নিউইয়র্ক থেকে মিজৌরি

নিক ডান অ্যামি এলিয়টের পরিচয় নিউইয়র্কে। দুজনেই তরুণ, শিক্ষিত, বুদ্ধিমান। নিক লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত, অ্যামিও লেখক। অ্যামির শৈশব অবশ্য সাধারণ ছিল না। তার বাবামা শিশুদের জন্য জনপ্রিয় বইয়ের সিরিজ লিখেছেনঅসধুরহম অসু। বাস্তবের অ্যামিকে ভিত্তি করেই তৈরি সেই কল্পিত মেয়েটি; কিন্তু বইয়ের অ্যামি যেন বাস্তব অ্যামির চেয়েও বেশি নিখুঁত।

ফলে ছোটবেলা থেকেই অ্যামিকে নিজের আরেকটি আদর্শ সংস্করণের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বড় হতে হয়েছে।

নিকের সঙ্গে পরিচয়ের পর মনে হয়েছিল, সেই চাপ থেকে সে বুঝি মুক্তি পেয়েছে। তাদের প্রেম ছিল ঝলমলে। দুজনেই যেন পরস্পরের সামনে নিজেদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সংস্করণটি তুলে ধরেছিল। নিক হয়েছিল রসিক, বুদ্ধিদীপ্ত, মনোযোগী প্রেমিক; অ্যামি হয়েছিল সুন্দরী, স্বাধীন, উদার, পুরুষের পছন্দ বোঝে এমন এককুল গার্ল

কিন্তু প্রেমের শুরুতে মানুষ যে চরিত্রে অভিনয় করে, সংসারের দীর্ঘ মঞ্চে সেই অভিনয় ধরে রাখা কঠিন।

অর্থনৈতিক মন্দা তাদের জীবন বদলে দেয়। দুজনেই কাজ হারায়। নিকের মা অসুস্থ হয়ে পড়লে তারা নিউইয়র্ক ছেড়ে ফিরে আসে নিকের জন্মস্থান মিজৌরির নর্থ কার্থেজে। অ্যামির কাছে এটি যেন নিউইয়র্কের পরিচিত জীবন থেকে নির্বাসন।

নিক তার যমজ বোন মার্গোর সঙ্গে একটি বার খোলে। বাইরে থেকে জীবন স্বাভাবিক। কিন্তু ঘরের ভেতরে নিক অ্যামির বিবাহ ইতিমধ্যেই ক্ষয়ে যেতে শুরু করেছে।

কাহিনী শুরু হয় তাদের পঞ্চম বিবাহবার্ষিকীর দিনে।

প্রতি বছর অ্যামি বিবাহবার্ষিকীতে নিকের জন্য সূত্র ধাঁধাঁর এক খেলা তৈরি করে। সেই সূত্র ধরে নিককে খুঁজে নিতে হয় উপহার। যেন তাদের প্রেমের পুরনো স্মৃতি নতুন করে আবিষ্কারের আয়োজন।

কিন্তু এবার সকালটি অন্য রকম।

নিক বাড়িতে ফিরে দেখে দরজা খোলা। ঘরের কিছু জিনিস এলোমেলো। অ্যামি নেই।

সে কোথায় গেল?

অপহরণ?

দুর্ঘটনা?

নাকি হত্যা?

পুলিশ আসে। তদন্ত শুরু হয়। আর খুব দ্রুতই সন্দেহের কেন্দ্রে চলে আসে স্বামী নিক।

কারণ নিকের আচরণ একজন উদ্বিগ্ন স্বামীর মতো নয়। স্ত্রীর নিখোঁজ হওয়ার পরও কখনো সে অদ্ভুতভাবে হাসছে, কখনো প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছে, কখনো আবার এমন তথ্য গোপন করছে যার ব্যাখ্যা সহজ নয়।

সংবাদমাধ্যম ঘটনাটি লুফে নেয়। সুন্দর, শিক্ষিত, জনপ্রিয়অসধুরহম অসুনিখোঁজ যেন টেলিভিশনের জন্য তৈরি গল্প। ক্যামেরার সামনে নিকের প্রতিটি হাসি, প্রতিটি ভুল শব্দ, প্রতিটি মুখভঙ্গি বিচার হতে থাকে।

ধীরে ধীরে আবিষ্কৃত হয় অ্যামির ডায়েরি।

সেই ডায়েরিতে ফুটে ওঠে অন্য এক বিবাহের ছবি। সেখানে নিক ক্রমে রূঢ়, দূরবর্তী, কখনো ভীতিকর। অ্যামি যেন স্বামীর কাছেই নিরাপত্তাহীন বোধ করছে। পাঠকের মনেও প্রশ্ন জন্মায়Ñনিক কি সত্যিই তার স্ত্রীকে হত্যা করেছে?

গন গার্ল সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেইÑপাঠক যখন একটি সত্যকে বিশ্বাস করতে শুরু করেন, ফ্লিন সেই সত্যের নিচ থেকে মাটি সরিয়ে দেন।

উপন্যাসের মাঝামাঝি এসে জানা যায়, অ্যামি মৃত নয়।

সে বেঁচে আছে।

আর তার নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা কোনো দুর্ঘটনা নয়। পুরো ঘটনাটিই তার পরিকল্পনা।

অ্যামি আবিষ্কার করেছিল নিকের অন্য এক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক আছে। তার কাছে এই বিশ্বাসঘাতকতা শুধু দাম্পত্যের ভাঙন নয়, তার আত্মমর্যাদার বিরুদ্ধে অপরাধ। তাই সে এমন এক প্রতিশোধের পরিকল্পনা করে, যাতে নিক শুধু তাকে হারাবে না, সমাজের চোখে স্ত্রীর হত্যাকারী হয়ে উঠবে।

মাসের পর মাস ধরে সে প্রস্তুতি নেয়। ডায়েরিতে বানানো ভয় নির্যাতনের গল্প লেখে, অর্থনৈতিক লেনদেনের চিহ্ন তৈরি করে, ঘরে সংঘর্ষের আলামত সাজায়, নিজের রক্তের চিহ্ন রেখে যায়। বিবাহবার্ষিকীর ধাঁধাঁগুলোকেও সে ব্যবহার করে নিককে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে, যেখানে আরও সন্দেহজনক প্রমাণ পাওয়া যাবে।

যেন নিজের হত্যার নাটক নিজেই লিখে যাওয়া, শুধু মৃতদেহটি নেই।

অ্যামির পরিকল্পনা ভয়াবহ, কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত। সে জানে পুলিশ কীভাবে চিন্তা করবে। তার চেয়েও ভালো জানে সংবাদমাধ্যম কী চায়।

একজন সুন্দর, ভীত, নিখোঁজ স্ত্রী এবং তার মিথ্যাবাদী, অবিশ্বস্ত স্বামীÑআমেরিকার টেলিভিশন দর্শকের জন্য এর চেয়ে আকর্ষণীয় গল্প আর কী হতে পারে?

অ্যামিকে শুধুখলনায়িকাবললে গন গার্ল গভীরতা ধরা যায় না।

তার সবচেয়ে বিখ্যাত চিন্তাগুলোর একটিকুল গার্লধারণা। অ্যামির মতে, বহু নারী প্রেমিক বা স্বামীর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য এমন এক নারীর চরিত্রে অভিনয় করে, যে সুন্দর কিন্তু নিজের সৌন্দর্য নিয়ে সচেতন নয়; পুরুষের পছন্দের খাবার খায়, তার পছন্দের খেলা দেখে, তার রসিকতায় হাসে, কখনো বেশি দাবি করে না।

অ্যামিও নিকের জন্য সেই চরিত্রে অভিনয় করেছিল।

নিকও কি অভিনয় করেনি?

প্রেমের শুরুতে সেও তো নিজের সবচেয়ে সুন্দর সংস্করণটি অ্যামির সামনে হাজির করেছিল।

তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, তারা কি সত্যিই পরস্পরকে ভালোবেসেছিল, নাকি ভালোবেসেছিল পরস্পরের অভিনীত চরিত্রকে?

এখানেই গন গার্ল একটি অপরাধরহস্যের সীমানা ছাড়িয়ে যায়।

অ্যামি গোপনে অন্য জায়গায় নতুন পরিচয়ে বাস করতে শুরু করে। তার ধারণা, পুলিশ শেষ পর্যন্ত নিককে গ্রেপ্তার করবে এবং সে দূরে বসে নিজের পরিকল্পনার সফলতা দেখবে।

কিন্তু বাস্তবতা পরিকল্পনা মতো চলে না।

তার টাকা চুরি হয়ে যায়। নিরাপদ আশ্রয় হারিয়ে সে বাধ্য হয় পুরনো প্রেমিক ডেসি কলিংসের সাহায্য নিতে।

ডেসি বহু বছর ধরেই অ্যামির প্রতি আসক্ত। সে অ্যামিকে নিজের বিলাসবহুল বাড়িতে আশ্রয় দেয়। কিন্তু সেই আশ্রয়ও এক ধরনের বন্দিত্বে পরিণত হয়।

এদিকে নিকও বুঝে গেছে অ্যামি বেঁচে আছে এবং সেই তাকে ফাঁসিয়েছে। কিন্তু প্রমাণ নেই।

তখন নিক অন্য খেলা শুরু করে।

টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে সে অ্যামির উদ্দেশে এমনভাবে কথা বলে, যেন এখনো স্ত্রীকে ভালোবাসে। সে জানে অ্যামি তাকে দেখছে। যে মানুষটি তাকে সবচেয়ে ভালো চেনে, সেই মানুষটিকেই তার অহংকারের জায়গায় আঘাত করতে হবে।

যেন দূর থেকে চলা দাবার খেলা।

নিকের কৌশল কাজ করে।

অ্যামি সিদ্ধান্ত নেয়, সে ফিরে আসবে।

কিন্তু ফিরে আসার জন্যও তার প্রয়োজন আরেকটি নিখুঁত গল্প।

ডেসিকে হত্যা করে অ্যামি। তারপর নিজের শরীরে এমন আলামত তৈরি করে যাতে মনে হয় ডেসি তাকে অপহরণ নির্যাতন করেছিল এবং সে প্রাণ বাঁচাতে তাকে হত্যা করেছে।

একদিন রক্তমাখা অবস্থায় সে নিকের বাড়ির সামনে ফিরে আসে।

আর মুহূর্তের মধ্যে নিক হত্যাকারীর সন্দেহ থেকে পরিণত হয় স্ত্রীর ফিরে আসায় আনন্দিত স্বামীতে।

নিক জানে অ্যামির গল্প মিথ্যা।

অ্যামি জানে নিক সত্য জানে।

কিন্তু পুলিশ জনমতের সামনে অ্যামি এখন প্রায় নায়িকা। তাকে অভিযুক্ত করার মতো প্রমাণ নিকের হাতে নেই।

নিক প্রথমে এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যেতে চায়। কিন্তু অ্যামি আবারও তাকে আটকে ফেলার পথ খুঁজে নেয়। নিকের সংরক্ষিত শুক্রাণু ব্যবহার করে সে গর্ভবতী হয়।

এবার নিকের সামনে নতুন প্রশ্ন, সে কি নিজের সন্তানকে অ্যামির হাতে রেখে চলে যাবে?

শেষ পর্যন্ত নিক থেকে যায়।

তারা আবার জনসমক্ষে আদর্শ দম্পতি।

কিন্তু পাঠক জানে, সেই ছবির পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ভয়, ঘৃণা, আকর্ষণ, প্রতিশোধ, নির্ভরতা এবং এক অদ্ভুত পারস্পরিক বন্দিত্ব।

তাদের বিবাহ ভেঙেও ভাঙে না।

কারণ তারা সম্ভবত পৃথিবীর সেই দুজন মানুষ, যারা একে অপরের সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যটি জানে।

গন গার্ল পাঠের পর তাই প্রশ্নটি আর থাকে না—‘অ্যামিকে কে হত্যা করেছিল?’

বরং প্রশ্ন হয়একটি বিবাহকে কে হত্যা করেছিল?

নিক? নাকি অ্যামি? অর্থনৈতিক সংকট? বিশ্বাসঘাতকতা?

নাকি সেই প্রত্যাশা, যেখানে আমরা ভালোবাসার মানুষের সামনে নিজের প্রকৃত সত্তা না দেখিয়ে এমন একজন হয়ে উঠতে চাই, যাকে সে ভালোবাসবে?

উপন্যাসে মিজৌরির কার্থেজ একটি কাল্পনিক শহর, কিন্তু তার সামাজিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ। নিউইয়র্কের ঝলমলে জীবন থেকে নিক অ্যামির অর্থনৈতিক মন্দায় বিধ্বস্ত মিডওয়েস্টে ফিরে আসা তাদের সম্পর্কের পরিবর্তনের সঙ্গেও যুক্ত।

একসময় যে দম্পতি ব্রুকলিনের নাগরিক জীবনে নিজেদের সফল আকর্ষণীয় বলে ভাবত, তারা এখন অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অসুস্থতা, পারিবারিক দায়িত্ব ছোট শহরের সীমাবদ্ধ বাস্তবতার মুখোমুখি।

তাই মিজৌরি এখানে নিছক মানচিত্রের একটি স্টেট নয়। এটি হারিয়ে যাওয়া আমেরিকান স্বপ্নেরও প্রতীক। নিক অ্যামির দাম্পত্যের মতো তাদের চারপাশের জগতও যেন বাইরে থেকে অক্ষত, ভেতরে ক্ষয়িষ্ণু। অদ্ভুত শোনালেওহ্যাঁ, এটি প্রেমের গল্প।

তবে সুখী প্রেমের নয়; ভালোবাসা যখন অধিকারবোধে পরিণত হয়, প্রত্যাশা যখন অভিনয়ে পরিণত হয়, আহত অহংকার যখন প্রতিশোধ হয়ে ফিরে আসেÑ সেই প্রেমের গল্প।

নিক অ্যামি একে অপরকে ধ্বংস করতে চায়, অথচ একে অপরের কাছ থেকেই পুরোপুরি মুক্ত হতে পারে না।

লেখক গিলিয়ান ফ্লিন এর সংক্ষিপ্ত জীবনী:

গিলিয়ান ফ্লিন ১৯৭১ সালে মিজৌরির ক্যানসাস সিটিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবামা দুজনেই শিক্ষক ছিলেন। বই চলচ্চিত্রের মধ্যে বেড়ে ওঠা ফ্লিন ইউনিভার্সিটি অব ক্যানসাসে ইংরেজি জার্নালিজম পড়েন এবং পরে নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে জার্নালিজমে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

Related Posts