৯/১১ এবং সালাউদ্দিনের রেখে যাওয়া ছায়া আখতার আহমেদ রাশা
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরÑঅন্য আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই শুরু হয়েছিল সকালটা। ম্যানহ্যাটানে কর্মস্থলে যাওয়ার উদ্দেশে প্রতিদিনের মতো বের হলাম। কিন্তু সাবওয়ে থেকে বের হয়ে সিক্সথ অ্যাভিনিউ ও টুয়েন্টি থার্ড স্ট্রিটের মোড়ে পা রাখতেই চমকে উঠতে হলো। ফুটপাথে অগুণতি মানুষ থমকে দাঁড়িয়ে আছে, সবার চোখ স্থির ডাউনটাউনের দিকে। কী ঘটছে তখনও অজানা, সামান্যতম ধারণাও ছিল না যে মানব ইতিহাসের অন্যতম বর্বর এক ট্র্যাজেডির মুখে দাঁড়িয়ে আছি আমরা।
তখন কেবল দেখছি ডাউনটাউনের আকাশে ঘন কালো ধোঁয়া। ঠিক সেই মুহূর্তেই একটি বিমান খুব নিচ দিয়ে উড়ে গিয়ে একটি ভবনে সরাসরি আঘাত করল। চেলসি থেকে আমরা পরিষ্কার দেখতে পেলাম সেই দৃশ্যÑসেটি ছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে দ্বিতীয় বিমানটির আঘাত। চারপাশ কান ঝালাপালা অ্যাম্বুলেন্সের বিকট সাইরেনের আওয়াজে।
সেদিন অফিসে গিয়ে আর কোনো কাজ হলো না, আমরা সকলেই হতভম্ব হয়ে বসে রইলাম। অফিসের টেলিভিশনের পর্দায় একের পর পর ভয়াবহ দৃশ্য আর বিস্তারিত তথ্য দেয়া হচ্ছিল।
পথঘাট স্তব্ধ, প্যাথ (চঅঞঐ) ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সন্ধ্যার দিকে ফেরিতে চড়ে জার্সি সিটির উদ্দেশে রওনা হলাম। ফেরি থেকে নামতেই চোখে পড়ল এক ভিন্ন দৃশ্যÑএকদল ফায়ার সার্ভিসের কর্মী দাঁড়িয়ে সবাইকে জিজ্ঞেস করছেন আমরা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ২০ ব্লকের ভেতরের এলাকা থেকে এসেছি কি না। বিষাক্ত ধূলাবালি বা কেমিক্যালের আশঙ্কায় কেউ ‘হ্যাঁ’ বললেই তার সারা শরীরে পানি দিয়ে স্প্রে করে ধুয়ে দেওয়া হচ্ছিল। আমাকে জিজ্ঞেস করায় আমি ‘না’ বললাম, তাই রেহাই পেলাম। কিন্তু আমার এক সহকর্মী, যে আমার সাথেই মিডটাউনে কাজ করত, কী মনে করে যেন বলে বসল ‘হ্যাঁ’! ব্যস, আর যায় কোথায়! ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাকে সামনে—পেছনে ভালো করে পানি স্প্রে করে ভিজিয়ে দিল। চেলসিতে কাজ করেও অহেতুক এমন স্প্রে খাওয়ার কথা মনে হলে আজও ভীষণ হাসি পায়। বিষাদ আর আতঙ্কের সেই দুঃসহ দিনটি আজও এক বিস্ময়কর স্মৃতি হয়ে মনে আটকে আছে।
কিন্তু সেই রাতের আসল আঘাতটা অপেক্ষা করছিল একটু পরেই। বাসায় বসে টিভিতে একের পর এক বিভীষিকা দেখছি, ঠিক তখনই এক বন্ধুর ফোন এলোÑ‘সালাউদ্দিন নিখোঁজ’। সালাউদ্দিন, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সুদর্শন এবং খুব সহজ—সরল একটা মানুষ। স্ত্রীর ডেলিভারির দিন ঘনিয়ে আসায় সে তো ছুটিতেই ছিল। কিন্তু সেদিন খুব ভোরে বসের ফোন পেয়ে জরুরি প্রয়োজনে কাজ করতে গিয়েছিল নর্থ টাওয়ারের উঁচুতে থাকা ‘উইন্ডোজ অন দ্য ওয়ার্ল্ড’—এ। আর সেই যাওয়াটাই যে তার শেষ যাওয়া হবে, তা কে জানত!
দুদিন পর, ১৩ সেপ্টেম্বর সালাউদ্দিনের স্ত্রী এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। সেদিন সন্ধ্যায় জ্যামাইকা হাসপাতালে যখন আমরা বন্ধুরা তার স্ত্রী ও নবজাতক সন্তানকে দেখতে যাই, তখনও সে তার স্বামীর মৃত্যুর সংবাদটা জানত না; শুধু জানত সালাউদ্দিন নিখোঁজ। আমেরিকায় আসার পর প্রথম এত কাছের একজন মানুষকে হারালাম। তখন আমাদের বয়স অনেক কম, প্রবাসে বন্ধুরাই ছিল আমাদের মূল শক্তি আর আনন্দের উৎস। সেই ৪—৫ জন বন্ধুর ছোট দলটি এমন আকস্মিক শোকে ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। ৯/১১—এর সেই অভিশপ্ত দিনে কত মানুষ যে আপনজনদের হারিয়েছে! এক নিমেষে বদলে গিয়েছিল পুরো বিশ্ব। জানি না এসব ধ্বংসলীলা দিয়ে কার কী লাভ হয়।
২৫ বছর পেরিয়ে গেছে। ট্রেড সেন্টারের সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর আজ গড়ে উঠেছে ‘ফ্রিডম টাওয়ার’ ও ৯/১১ মেমোরিয়াল। মেমোরিয়ালের ফলকে প্রায় ৩ হাজার নিরপরাধ মানুষের নামের সাথে স্পষ্ট অক্ষরে খোদাই করা রয়েছে আমাদের প্রিয় সালাউদ্দিনের নামও। সালাউদ্দিনের স্ত্রী পরবর্তী সময়ে নিউইয়র্ক ছেড়ে ওকলাহোমায় পাড়ি জমান। আর সেই ১৩ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া শিশুটি আজ কত বড় হয়ে গেছে! তার বড় বোনটি পেশায় আইনজীবী, দু’বছর আগে তার বিয়েও হয়েছে। শৈশবে বাবাকে হারানো ছোট মেয়েটি আজও বাবার বন্ধুদের কাছে পেলে আগ্রহ নিয়ে জানতে চায় তার বাবার কথা, শুনতে চায় পুরনো স্মৃতি।
সালাউদ্দিনের পরিবার আজও সেই বেদনার ভার বয়ে বেড়াচ্ছে। আর আমরা, তার পুরনো বন্ধুরা, মাঝে মাঝেই একত্র হয়ে পরম ভালোবাসায় তাকে স্মরণ করি। পৃথিবী থেকে চিরতরে বন্ধ হোক এমন ধ্বংস আর হিংসাÑআমাদের এই একটাই আকুতি।
