মেঠো উপমা, প্রতীক ও কাব্যের অনায়াস উন্মোচন

লালনের ভাষার শক্তি তার অনাড়ম্বরতায়। তাঁর গান শাস্ত্রীয় আলংকারিক ভাষায় লেখা নয়। গ্রামবাংলার মুখের ভাষা, কৃষির উপমা, নদীর ছবি, ঘরবাড়ি, পাখি, আয়না, বাজার, মেলা, দরজা, খাঁচাÑএসব দিয়ে তিনি মহাজাগতিক প্রশ্ন করেছেন। তাঁর কাছে মন হলো জমি, সাধনা হলো চাষ, আর মানবজীবন হলো সোনার ফলের সম্ভাবনাময় ক্ষেত।বাড়ির কাছে আরশীনগর’Ñএখানে পরমসত্তা দূর আকাশে নয়, মানুষের নিজের কাছেই, নিজের ভিতরেই। লালনের কবিত্ব এখানেইÑতিনি অনন্তকে অতি পরিচিত গন্ডিতে নামিয়ে আনেন।

সাঙ্গীতিক শৈলী, লোকপরম্পরা সংগৃহীত পাঠ

সংগীতের দিক থেকেও লালনগীতি বাংলা লোকসংগীতের এক স্বতন্ত্র ধারা। ভাটিয়ালির দীর্ঘ টান, কীর্তনের আবেগ, সুফি গানের ধ্যানী চেতনা এবং বাউলআখড়ার নৃত্যময় লয়Ñএসব মিলিয়ে লালনের গান শ্রোতার শরীর মনকে একসঙ্গে স্পর্শ করে। বাউল গান শুধু শোনার উপাদান নয়, এটি সাধনার অংশ, শরীরী ছন্দের অংশ, গুরুভক্তির অংশ, সমবেত অভিজ্ঞতার অংশ। সেই কারণে লালনের গান মঞ্চে যেমন সত্য, আখড়ায় তেমনি সত্য; গবেষণাগারে যেমন প্রাসঙ্গিক, পথের মেলায়ও তেমনি জীবন্ত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের গান সংগ্রহ প্রকাশে বড় ভূমিকা রাখেন। লালনের গান সংগ্রহ করে তিনি শিক্ষিত সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। রবীন্দ্রচিন্তার মানবধর্ম বাউলপ্রভাব নিয়ে পরে বহু গবেষণা হয়েছে। লালনের প্রভাব শুধু রবীন্দ্রনাথে নয়; নজরুল, জসীমউদ্দীন, লোকসংগীত, ব্যান্ডসংগীতÑসবখানেই নানা রূপে ছড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়েও লালন এক গভীর ভিত্তি।

তবে লালনের গান নিয়ে সতর্কতা প্রয়োজন। মৌখিক পরম্পরায় প্রচারিত হওয়ায় তাঁর গানের সংখ্যা, ভাষা, পাঠভেদ, এমনকি কিছু গানের প্রামাণিকতা নিয়েও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ বলেন তিনি দুই হাজারের বেশি গান রচনা করেছেন, কেউ আরও বেশি সংখ্যা উল্লেখ করেন; আবার অনেক গান পরবর্তীকালে তাঁর নামে প্রচলিত হয়েছে বলেও অভিযোগ আছে। তাই লালনকে ভালোবাসা মানে তাঁর গানকে যত্ন করে শেখা, পাঠভেদ বুঝে নেওয়া, এবং আখড়ার সাধনঐতিহ্যকে সম্মান করা।

লালনের কয়েকটি বিখ্যাত গান

১। খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, ২। সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে, ৩। জাত গেল জাত গেল বলে, ৪। বাড়ির কাছে আরশীনগর, ৫। সময় গেলে সাধন হবে না, ৬। মিলন হবে কত দিনে, ৭। মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি, ৮। ধন্য ধন্য বলি তারে, ৯। আমি অপার হয়ে বসে আছি, ১০। তিন পাগলে হলো মেলা, ১১। পারে কে যাবি, ১২। মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার, ১৩। মুরশিদ জানায় যারে, ১৪। পাখি কখন যেন উড়ে যায়, ১৫। কবে সাধুর চরণধূলি, ১৬। যেখানে সাঁইর বারামখানা, ১৭। রাখিলে সাঁই, ১৮। আমার ঘরখানায় কে বিরাজ করে, ১৯। আপন ঘরের খবর নে না, ২০। সত্য বল সুপথে চল, ২১। এমন মানব জনম আর কি হবে, ২২। গুরু তুমি পতিত পাবন পরম ঈশ্বর, ২৩। কে তোমার আর যাবে সাথে, ২৪। পারে লয়ে যাও আমায়, ২৫। দেখ না মন ঝকমারি।

পরিশেষ

লালন শাহ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় গন্ডি গড়ে তোলেননি, কোনো ভৌগোলিক সাম্রাজ্য রেখে যাননি, কিংবা কোনো কঠিন জটিল ধর্মগ্রন্থ লিখে যাননি; তিনি রেখে গেছেন একটি স্বচ্ছ আত্মিক দর্পণ। সেই দর্পণের সামনে দাঁড়ালে মানুষ নিজের অন্ধ সংস্কার অহংকারকে যেমন চিনতে পারে, তেমনি উপলব্ধি করতে পারে নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অচিন পাখির অসীম সম্ভাবনা। তাঁর রেখে যাওয়া গান আজও গ্রামবাংলার মেঠো পথ থেকে শুরু করে নাগরিক জীবন পর্যন্ত মানুষকে নিজের অন্তরালে ফিরে তাকানোর আহ্বান জানায়। খাঁচার ভেতর যতক্ষণ মানবাত্মার শ্বাসপ্রশ্বাস প্রবাহিত হবে, ততক্ষণ তাঁর তোলা এই গভীর প্রশ্নগুলো বাঙালির ভাবুক মনে নতুন আলো জ্বেলে যাবে।

Related Posts