প্রেমের নাটক—সিনেমা বন্ধের আইনি নোটিশে উদ্বেগ ও প্রতিবাদ
প্রেমভিত্তিক চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাণ ও সম্প্রচারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানিয়ে আইনি নোটিশ দেওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে টেলিভিশন নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাতটি সংগঠন। সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘‘রোমান্টিক নাটক বা সিনেমা নির্মাণকে সামগ্রিকভাবে বন্ধ করার দাবি কোনোভাবেই সৃজনশীল শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়৷ তাই টেলিভিশন মাধ্যমের সংশ্লিষ্ট সব সংগঠনের পক্ষ থেকে আমরা নোটিশের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।” সম্মিলিত প্রতিবাদ লিপিতে সংগঠনগুলো বলেছে, রোমান্টিক নাটক ও সিনেমা নির্মাণ বন্ধের দাবিতে লিগ্যাল নোটিশ জারির বিষয়টি টেলিভিশন ও বিনোদন অঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী, শিল্পী, নির্মাতা, প্রযোজক, কলাকুশলী এবং বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে।
প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, বাংলাদেশের টেলিভিশন ও অডিওভিজ্যুয়াল শিল্প দীর্ঘদিন ধরে দেশের সংস্কৃতি, বিনোদন, সৃজনশীলতা ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। নাটক, সিনেমা ও অন্যান্য বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রে সৃজনশীল স্বাধীনতা, শিল্পীর মতপ্রকাশের অধিকার এবং প্রচলিত আইন ও নীতিমালা অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংগঠনগুলোর মতে, কোনো নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিমালা ও প্রচলিত নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় তার প্রতিকার করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু একটি সম্পূর্ণ সৃজনশীল মাধ্যমের একটি নির্দিষ্ট ধারার নির্মাণ বন্ধের উদ্যোগ টেলিভিশনশিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। আইনি নোটিশে দেশের বর্তমান চলচ্চিত্র ও নাটকে প্রেম এবং রোমান্টিক কনটেন্টের আধিক্যের অভিযোগ তুলে দাবি করা হয়, এর ফলে সাংস্কৃতিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। নোটিশদাতার দাবি, এসব কনটেন্টে পরকীয়া ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে স্বাভাবিক ও মহিমান্বিত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা সমাজের প্রচলিত নৈতিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
‘রোমান্টিক নাটক বা সিনেমা নির্মাণকে সামগ্রিকভাবে বন্ধ করার দাবি কোনোভাবেই সৃজনশীল শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’— বলার পাশাপাশি সাত সংগঠন দায়িত্বশীল ও মানসম্মত কনটেন্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এ প্রতিবাদলিপিতে স্বাক্ষর করেছেন ডিরেক্টর্স গিল্ডের সভাপতি শহীদুজ্জামান সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক ফরিদুল হাসান, অভিনয়শিল্পী সংঘের সভাপতি আজাদ আবুল কালাম ও সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপু, টেলিভিশন নাট্যকার সংঘের সভাপতি শিহাব শাহীন ও সাধারণ সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন সুমন, ক্যামেরাম্যান অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক সাহিল রনি, অডিও—ভিজ্যুয়াল টেকনিক্যাল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাদেক সিদ্দিকী, টেলিভিশন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর্স অর্গ্যানাইজেশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক রাজ্জাক রাজ এবং বাংলাদেশ মেকআপ আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব রহমান মানিক।
নোটিশের শেষাংশে বলা হয়, নোটিশ পাওয়ার ১০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে নোটিশদাতাকে অবহিত করতে হবে। অন্যথায় সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট আবেদন করা হবে।
আইনি নোটেশে যা বলা হয়েছে
এর আগে যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধ, সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা ও সৃজনশীল মেধা বিকাশের লক্ষ্যে শুধু প্রেমভিত্তিক চলচ্চিত্র—নাটক নির্মাণ ও সম্প্রচারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের দাবিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। পাশাপাশি বিজ্ঞান, শিক্ষা, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, প্রতিরক্ষাভিত্তিক চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাণ এবং সম্প্রচারে বাধ্যতামূলক নির্দেশনা জারিরও দাবি জানানো হয়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মামুন গতকাল বৃহস্পতিবার সরকারের তিন সচিব ও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর ওই নোটিশ পাঠান। এই তিন সচিব হলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, তথ্য ও সম্প্রচার সচিব এবং সংস্কৃতিবিষয়ক সচিব। ডাকযোগে নোটিশটি পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
নোটিশে দেশের বর্তমান চলচ্চিত্র ও নাটকে প্রেম এবং রোমান্টিক কনটেন্টের আধিক্যের অভিযোগ তুলে দাবি করা হয়, এর ফলে সাংস্কৃতিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে৷ নোটিশদাতার দাবি, এসব কনটেন্টে পরকীয়া ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে স্বাভাবিক ও মহিমান্বিত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা সমাজের প্রচলিত নৈতিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এ ধরনের কনটেন্টের সম্প্রচারের সঙ্গে যুবসমাজের পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারের প্রতি অমনোযোগিতা এবং পরকীয়া ও ধর্ষণের মতো অপরাধ বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে বলেও নোটিশে দাবি করা হয়৷ এ অবস্থায় যুবসমাজ ও সাধারণ জনগণকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা এবং পারিবারিক মূল্যবোধ বজায় রাখার জন্য প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
নোটিশদাতা সংবিধানের ২১(১) অনুচ্ছেদের পাশাপাশি ৩৯ ও ২৩ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে তার দাবির পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। তার ভাষ্য, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বাক্ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা যুক্তিসংগত বাধানিষেধ আরোপের সুযোগ রয়েছে৷ আর ২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
নোটিশের শেষাংশে বলা হয়, নোটিশ পাওয়ার ১০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে নোটিশদাতাকে অবহিত করতে হবে। অন্যথায় সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট আবেদন করা হবে।
প্রেমের গল্পে আইনি বাধা, যা বলছেন নির্মাতা—শিল্পীরা
হঠাৎ করে রোমান্টিক নাটক ও সিনেমা নির্মাণ বন্ধের দাবিতে লিগ্যাল নোটিশ জারি। এতে বলা হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট কনটেন্ট নিয়ে আপত্তি থাকলে প্রচলিত আইন, বিধিমালা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মাধ্যমে তার প্রতিকার করা সম্ভব। এমন নোটিশে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ জানিয়েছে দেশের নাটক ও সিনেমা অঙ্গনের বিভিন্ন সংগঠন। তাদের মতে, একটি নির্দিষ্ট ঘরানার সৃজনশীল কাজ বন্ধের উদ্যোগ শিল্পী ও কলাকুশলীদের স্বাধীনতার পাশাপাশি কর্মসংস্থানকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
সংগঠনগুলোর নেতারা জানান, বাংলাদেশের টেলিভিশন ও অডিওভিজ্যুয়াল শিল্প দেশের সংস্কৃতি, বিনোদন ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান। তাই রোমান্টিক কনটেন্ট নির্মাণ বন্ধ হলে এর প্রভাব শুধু পর্দায় নয়, এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবনেও পড়তে পারে। তবে দায়িত্বশীল ও মানসম্মত কনটেন্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করেছে সংগঠনগুলো। তাদের বক্তব্য, সৃজনশীল স্বাধীনতার পাশাপাশি নির্মাতাদেরও দর্শকের প্রতি দায়িত্বশীল থাকতে হবে।
সৃজনশীল স্বাধীনতা, শিল্পী—কলাকুশলীদের কর্মক্ষেত্র এবং বিনোদন অঙ্গনের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা চেয়েছে তারা। যৌথ প্রতিবাদে ডিরেক্টরস গিল্ড বাংলাদেশ, অভিনয় শিল্পী সংঘ বাংলাদেশ, টেলিভিশন নাট্যকার সংঘসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা স্বাক্ষর করেছেন।
