লিওনেল মেসি: কান্না, ট্রফি আর এক অমর রূপকথা

স্পোর্টস প্রতিবেদনঃ কোনো রূপকথার রূপালী সমাপ্তি হলো না সত্যি, কিন্তু আর্জেন্টিনার ফুটবলে লিওনেল মেসি রেখে গেলেন এমন এক ঐতিহ্য, যার কোনো ক্ষয় নেই, যার কোনো শেষ নেই। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্টফুটবলবিশ্বের বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস ভেসে এলো। নিজের আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারে চিরতরে যবনিকাপাত টানলেন লিওনেল মেসি। টানা দ্বিতীয়বার দেশকে বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে যাওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, ৩৯ বছর বয়সে এসে, আকাশিসাদা জার্সিটাকে চিরতরে তুলে রাখার আবেগঘন ঘোষণা দিলেন এই কিংবদন্তি।

ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দুটি দশক পার করে দেওয়ার পর, যখন তিনি বিদায় নিলেন, ততদিনে নিজের দেশের সাথে এক সময়ের সমস্ত সংশয়, অভিমান আর দূরত্ব সুদেআসলে মিটিয়ে ফেলেছেন। রেকর্ড আটবারের ব্যালনের ডিঅর জয়ী এই জাদুকর বিদায় নিচ্ছেন একজন বিশ্বজয়ী দুবারের কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। দিয়েগো ম্যারাডোনার বিশালাকার ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে তিনি গড়ে তুলেছেন আর্জেন্টিনার নিজস্ব এক নতুন রূপকথা।

যন্ত্রণার ইতি নতুন সূর্যালোক

এবারের বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ের ব্যবধানের পরাজয় হয়তো মেসিকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের উল্লাসে ভাসতে দেয়নি। একটা পরিপূরকফেয়ারিটেলবিদায় হয়তো মেলেনি, কিন্তু যে মানুষটি বার্সেলোনা, আর্জেন্টিনা এবং আধুনিক ফুটবলের পরিচয়কেই চিরতরে বদলে দিয়েছেন, তাঁর তো আর নতুন করে কিছুই প্রমাণ করার বাকি ছিল না!

চার বছর আগে কাতারের মরুপ্রান্তরে তিনি ছুঁয়েছিলেন জীবনের পরম আরাধ্য সেই সোনালী ট্রফি। পুরো টুর্নামেন্টে গোল আর ফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে মহাকাব্যিক জোড়া গোলের পর টাইব্রেকারে জয়সেটি কেবল কোনো ক্যারিয়ারের শীর্ষবিন্দু ছিল না, সেটি ছিল ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে অধ্যাবসায় লড়াইয়ের গল্পের এক সার্থক পরিণতি।

অথচ একসময় এই ভালোবাসার জার্সিটাই তাঁর জন্য হয়ে উঠেছিল যন্ত্রণার অন্য নাম। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ের হার, এরপর ২০১৫ ২০১৬ সালে পরপর দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে বিদায়যন্ত্রণায় নীল হয়ে ২০১৬ সালের সেই অভিশপ্ত রাতে কান্নাভেজা চোখে মেসি বলে ফেলেছিলেন:

জাতীয় দল আমার জন্য এখানেই শেষ।

কিন্তু গল্প তো সেখানে শেষ হতে পারত না! তিনি ফিরে এসেছিলেন। লিওনেল স্কালো নির অধীনে আর্জেন্টিনা এক নতুন ভোরের দেখা পেলযেখানে পুরো দল লড়াই করত তাদের অধিনায়কের ভালোবাসার শক্তিতে। ২০২১ সালে ঐতিহাসিক মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয় ছিল সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বাঁধভাঙা আনন্দের সূচনা। এরপর ১৮ মাস পর এলো সেই স্বপ্নের কাতার বিশ্বকাপ!

১৩ বছর বয়সে রোসারিও ছেড়ে বার্সেলোনায় পাড়ি জমানো সেই লাজুক কিশোরটি, যাকে একসময় নিজ দেশের মানুষইআর্জেন্টাইন নাকি কাতালান?’ বলে কটাক্ষ করত, সময়ের আবর্তে সে হয়ে উঠলেন পুরো জাতির স্পন্দন। বছরের পর বছর ধরে চলা কান্না আর ব্যর্থতার দীর্ঘশ্বাসগুলো রূপান্তরিত হলো গান, দেয়ালচিত্র আর উদযাপনে। ম্যারাডোনার সাথে তুলনা আর কখনো তাঁর দিকে অপরাধবোধের আঙুল তুলেনি, বরং তিনি হয়ে উঠেছিলেন নিখাদআর্জেন্টিনার মেসি

২০২২ সালেই তিনি থামতে পারতেন। কিন্তু খেলাটার প্রতি নিখাদ ভালোবাসা আর দেশের টান তাঁকে থামতে দেয়নি। পিএসজি ছেড়ে ইন্টার মায়ামিতে গিয়েও তিনি দেশকে ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা ধরে রাখতে সাহায্য করলেন, আর তারপর ২০২৬ বিশ্বকাপে এনে দিলেন আরও একটি লড়াইয়ের স্পিরিট।

বয়সের ভারে সেই ঝোড়ো গতি হয়তো কিছুটা কমেছিল, কিন্তু মেসির ধার কমেনি এতটুকু। তিনি মাঠে হেঁটেছেন, অপেক্ষা করেছেন, উপযুক্ত মুহূর্ত বেছে নিয়েছেনআর তরুণ সতীর্থরা তাঁর চারপাশে প্রাণপণ লড়াই করে গেছে। মাঠের নজর, পাস দেওয়ার নিখুঁত ওজন আর এক ছোঁয়ায় ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার অলৌকিক ক্ষমতা শেষদিন পর্যন্ত ছিল অক্ষত।

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সংখ্যা আর পরিসংখ্যান ফুটবল ইতিহাসের শীর্ষেই থাকবে, তবে কোনো সংখ্যা দিয়ে এই যাত্রার আবেগ মাপা সম্ভব নয়প্রত্যাশার চাপ থেকে প্রত্যাখ্যান, হৃদয়দগ্ধ যন্ত্রণা থেকে রাজকীয় ভালোবাসা পাওয়ার এই সফর কোনো ডেটাবেজে আঁটে না।

একসময় প্রতিটি পরাজয়কে ব্যবহার করা হতো ম্যারাডোনার চেয়ে তিনি কোথায় পিছিয়েতা দেখানোর জন্য। শেষ বিচারে সেই তর্কগুলো আজ অর্থহীন। একজন ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনাকে স্বপ্নের চূড়ায় তুলেছিলেন; অন্যজন বছরের পর বছর রক্তঘাম ঝরিয়ে ২০২২ সালে দেশকে সেই স্বপ্ন এনে দিয়েছেন এবং চার বছর পর আবারও দেশকে এনে দিয়েছেন ফাইনালের দোড়গোড়ায়।

লিওনেল মেসি তাঁর জাতীয় দল থেকে বিদায় নিচ্ছেন পরম শান্তিতে, বুকভরা গর্ব নিয়ে। তিনি কোনো ট্রফি বা হারের উর্ধ্বে উঠে এমন এক স্থান অধিকার করেছেন, যা আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে। ধন্যবাদ, লোও! ফুটবল তোমার কাছে ঋণী।

Related Posts