বাংলাদেশের জলাবদ্ধতার জলতাত্ত্বিক গতিবিদ্যা—২৪ || ড. আনিস রহমান
চট্টগ্রাম: উপকূলীয় জোয়ার—ভাটা এবং পাহাড়ি রানঅফের জটিল মিথস্ক্রিয়া
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক ও শিল্প নগরী এবং ব্যস্ততম সমুদ্রবন্দর। কর্ণফুলী নদীর তীরে এবং বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত এই পাহাড়ি ও উপকূলীয় শহরটি অত্যন্ত অনন্য ও জটিল জলতাত্ত্বিক জলাবদ্ধতার শিকার। চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা মূলত দুটি ভৌত শক্তির পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলাফল: অতিবৃষ্টিজনিত পাহাড়ি ঢল এবং কর্ণফুলী নদী দিয়ে ধেয়ে আসা বঙ্গোপসাগরের শক্তিশালী জোয়ারের ঢেউ।
বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রামে অত্যন্ত তীব্র ও স্বল্পস্থায়ী বৃষ্টিপাত ঘটে, যা পাহাড়গুলোর খাড়া ঢাল বেয়ে দ্রুত নেমে এসে শহরের চাক্তাই ও রাজখালীর মতো প্রধান নিষ্কাশন খালগুলোর ধারণক্ষমতাকে অতিক্রম করে। একই সময়ে যদি কর্ণফুলী নদীতে উচ্চ জোয়ার (ঐরময ঞরফব) সচল থাকে, তবে জোয়ারের পানি সরাসরি শহরের ভেতরের এই খালগুলোতে প্রবেশ করে বিপরীতমুখী প্রবাহ সৃষ্টি করে।
স্টর্ম ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট মডেল (ঝডগগ) সিমুলেশন অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে চট্টগ্রামে নিষ্কাশন খালের প্রবাহ গভীরতা ২.৬ মিটার থাকলেও বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের ব্যাকওয়াটার এবং পাহাড়ি পৃষ্ঠপ্রবাহের কারণে তা ৩.৩ মিটারে উন্নীত হয়। এর ফলে চট্টগ্রামের প্রধান পাইকারি বাণিজ্যিক কেন্দ্র চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জ প্রায় ০.৫ থেকে ০.৯ মিটার পানিতে তলিয়ে যায়, যা দেশের প্রধান সরবরাহ চেইনের গুদাম ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে। ২০১৭ সালের জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রামে রেকর্ড পরিমাণ ৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়াও, কর্ণফুলী নদীর পানি চাক্তাই খালের শিল্প বর্জ্য এবং জাহাজগুলোর তেল নিঃসরণের (ঞড়ঃধষ চবঃৎড়ষবঁস ঐুফৎড়পধৎনড়হ — ঞচঐ) কারণে তীব্রভাবে দূষিত হচ্ছে। চাক্তাই খালে ঞচঐ এর মাত্রা সর্বোচ্চ ৮৪.৬৭ মিলিগ্রাম/লিটার রেকর্ড করা হয়েছে এবং দ্রবীভূত অক্সিজেনের (উঙ) পরিমাণ ১.৬৫ মিলিগ্রাম/লিটারে নেমে এসেছে, যা জলজ পরিবেশকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করছে। একই সাথে, নদী ও খালে মাইক্রোপ্লাস্টিক (গচ) দূষণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কোনো কোনো ঘাটে প্রতি বর্গ কিমিতে গড়ে ৯৪,৮৬১টি কণা পর্যন্ত পাওয়া গেছে।
নদী ও খালের পানি এবং বাস্তুতন্ত্রের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুতর পরিবেশগত উদ্বেগের বিষয়। এর একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:
মাইক্রোপ্লাস্টিক (গচ): মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের কণা, যা সাধারণত বড় প্লাস্টিক বর্জ্যের ভাঙন (ঢ়যড়ঃড়ফবমৎধফধঃরড়হ) অথবা বিভিন্ন শিল্পজাত পণ্যের মাধ্যমে পানিতে মিশে যায়।
দূষণের উৎস: নদনদী এবং খালে এই দূষণের উৎস হলো অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য, গৃহস্থালি ও শিল্পকারখানার প্লাস্টিক বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোতে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে গড়ে ৯৪,৮৬১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যাওয়া এটি নির্দেশ করে যে, এই নদীগুলো প্লাস্টিক দূষণের এক ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
পরিবেশগত প্রভাব: এই বিপুল পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা নদীর পানির গুণমান নষ্ট করছে এবং জলজ প্রাণীদের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সিলেট: সুরমা—কুশিয়ারা নদীগর্ভ ভরাট এবং হাওরের প্রাকৃতিক অববাহিকা
সিলেট অঞ্চলের ভূ—সংস্থানিক চরিত্র বাংলাদেশের অন্য সব অঞ্চলের চেয়ে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এটি মূলত ভারতের মেঘালয় মালভূমির পাদদেশে অবস্থিত একটি অত্যন্ত নিচু অববাহিকা, যা দেশের অন্যতম প্রধান ‘হাওর’ বাস্তুতন্ত্রের অংশ। সিলেট জেলা এবং সংলগ্ন হাওর অববাহিকাটি প্রায় ২.০ মিলিয়ন হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যা দেশের মোট স্থলভাগের ১৪% এবং যেখানে প্রায় ১৯.৪ মিলিয়ন মানুষ বসবাস করে।
সিলেটে সংঘটিত আকস্মিক বন্যার (ঋষধংয ঋষড়ড়ফ) মূল ভৌত কারণ হলো ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের অভূতপূর্ব অতিবৃষ্টি, যা সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর মাধ্যমে প্রচন্ড গতিতে ভাটির দিকে নেমে আসে। মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে বার্ষিক ১২,০০০ মিমি পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়, যা পৃথিবীর সর্বোচ্চ। যখন মেঘালয় ও আসামে ২৫০ মিমি এবং সিলেটে ৪০০ মিমি—এর বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, তখন অত্যন্ত দ্রুত ও বিধ্বংসী পাহাড়ি ঢল সিলেট শহর ও হাওর অঞ্চলকে প্লাবিত করে।
বিগত দশকগুলোতে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর ধারণক্ষমতা এবং নিষ্কাশন ঘনত্ব (উৎধরহধমব উবহংরঃু) মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। পাহাড়ি ঢলের সাথে বয়ে আসা বালি ও পলি জমে নদীর তলদেশ সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে গেছে। সিলেট সদর এবং কানাইঘাট অঞ্চলের মধ্যবর্তী সুরমা নদীর তলদেশে ব্যাপক পলি সঞ্চয়ন হওয়ায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
একই সাথে, হাওরের মাঝখান দিয়ে অপরিকল্পিত অল—ওয়েদার সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহের পথ অবরুদ্ধ হয়েছে। এর ফলে বৃষ্টির পানি আর নদী বেয়ে নেমে যেতে পারে না এবং দীর্ঘস্থায়ী বন্যার সৃষ্টি করে। ২০২২ সালের জুন মাসে সিলেটে ১২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা সংঘটিত হয়, যা জেলার ৭০% এলাকা ডুবিয়ে দেয় এবং ৭.২ মিলিয়নেরও বেশি মানুষকে সম্পূর্ণরূপে পানিবন্দী করে ফেলে। এই বন্যা মূলত এপ্রিল—মে মাসে বোরো ধান কাটার ঠিক পূর্বমুহূর্তে আঘাত হানে, যার ফলে অন্তত ১০% থেকে ৩০% ফসল সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয় এবং কৃষকদের চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে ফেলে।
