সংস্কার কি সংস্কৃতিরও! আনিস আহমেদ

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সংস্কার সাধনের আওয়াজ তুলছেন একদল লোক, যার মধ্যে রয়েছে সংবিধানের সংস্কার সাধন।সংস্কারশব্দের সদর্থক ব্যাখ্যা হলো কোনো কিছুর ত্রুটি দূর করে তা সংশোধন বা পুনর্নির্মাণ করা। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এতো চমৎকারভাবে প্রতিফলিত হয়েছে যে তার কোনো সংস্কার সাধনের প্রয়োজন নেই। এই সংবিধানের সংস্কার বা সংশোধন চাইতে পারে কেবল তারাই যারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরোধী। সময়ের বিবর্তনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশোধন করা যেতেই পারে। কিন্তু বাহাত্তরের সংবিধানের মূল আদর্শগুলো অপরিবর্তিত রাখতে হবে। চব্বিশের কথিত আন্দোলনকারীরা সংস্কারের নামে বাংলাদেশের খোলনলচে পাল্টে দিতে চায়, বঙ্গবন্ধুর ভূমিকার অবমূল্যায়ন করতে চায় এবং মুক্তিযুদ্ধকে কোণঠাসা করতে চায়। আসলে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে তাদের মনে এক ভিন্ন ধরনেরসংস্কারকাজ করছে। যে কারণে তাদের কেউ কেউ এখন মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখে। এই দৃষ্টিভঙ্গি যে মূলত স্বাধীন বাংলাদেশের সত্ত্বাকে অস্বীকার করারই নামান্তর সে কথা কারও বুঝতে বাকি নেই।

সংস্কারের নামে এই গোষ্ঠীটি কেবল যে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে তাই নয়, বাঙালি সংস্কৃতি এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। কিন্তু সংস্কৃতি কেন কথিত সংস্কারের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে? আসলে এই বিষয়টিও আমাদের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমাদের স্বাধীনতার বীজটি বপন করা হয় আমাদের ভাষা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সেই ১৯৪৮ সালে। বাংলা ভাষা আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির ধারক বাহক সেই সংস্কৃতি থেকে বাঙালিকে বিচ্ছিন্ন করার এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ ছিলো বাংলা ভাষাকে প্রান্তিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া। আর সে কথা বুঝতে পেরেছিলেন তৎকালীন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা, জনসাধারণও। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির পক্ষে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। এখন যারা কথিত সংস্কারের কথা বলছে তাদের ভাষা লক্ষ্য করার মতো। তারা যখন বিপ্লবের বদলে ইনকিলাব শব্দটি ব্যবহার করে এবং ইনকিলাব জিন্দাবাদ বলে শ্লোগান দেয়, তখন রকমটি মনে করার যথার্থ কারণ আছে যে তারা বাংলা ভাষার ওপর ভিন্ন দেশের ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। বাংলা ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বাঙালির অভিন্ন সংস্কৃতি রক্ষার জন্যই আমরা জানি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সহস্র বাধার মুখেও ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী পালন করা হয়, জন্ম নেয় ছায়ানটের মতো সাংস্কৃতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সব কিছুর ধারাবাহিকতায় নানান প্রতিকূলতার মধ্যেও বাস্তবায়িত হয় বাঙালি সংস্কৃতির প্রত্যাশিত মুক্তি। বড় বেদনার সঙ্গে বিস্মিত হই যে পূর্বেকার তারুণ্য শক্তির মধ্যে যে স্বকীয় সংস্কৃতির প্রতি অবিচল বিশ্বাস ভালোবাসা ছিল, তার বিপরীত মেরুতে হাঁটছে এখনকার কতিপয় তরুণ। তারা ধর্মের অজুহাত দিয়ে পাকিস্তানের আদর্শকে প্রতিস্থাপন করতে চায় বাংলাদেশের স্বাধীন সার্বভৌম মাটিতে। আজ যখন শুনি ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাংলা গান, বাঙালি সংস্কৃতি অবহেলিত হচ্ছে এবং সেখানে উগ্রবাদী গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, তখনও বেদনায় বিস্মিত হই। বাউল গানের ওপরও চড়াও হয়েছে উগ্রবাদীরা। যে বাউল গানের ভেতর আধ্যাত্মিকতা রয়েছে, রয়েছে স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির প্রেমের কথা, সেটি এখন তথাকথিত স্রষ্টা প্রেমীরা নস্যাৎ করে দিতে চায়। গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী লালন মেলা, বাউল উৎসব এবং গ্রামীণ মেলাগুলোকে উগ্রপন্থীরা ধর্মীয় অনুষঙ্গের সাথে সাংঘর্ষিক দেখিয়ে বাধা দিচ্ছে। 

সম্প্রতি বাংলাদেশে আমরা শুনছি আরেক কাহিনী। চলচ্চিত্রে প্রেম ভালোবাসা নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে। চলচ্চিত্রের সেই উদ্ভবের সময় থেকে আমরা শুনে এসেছি প্রেম রোমান্সের কথা। সেই ধ্রুপদী যুগ থেকে এখন পর্যন্ত চলচ্চিত্রে প্রেম, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ বিরহের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। বিশ্বের সকল বিখ্যাত লেখকদের লেখায় এই বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু এখন একদল লোক ধর্মের দোহাই দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের সীমারেখা টেনে দিতে চাচ্ছে। মনে হচ্ছে তাদের সেই রেখার বাইরে পড়ে যাবেন শেক্সপিয়ার এবং রবীন্দ্রনাথরাও। কেবল চলচ্চিত্র নয়, নাটক প্রদর্শনেও মৌলবাদীদের প্রভাব ক্রমশই বিস্তৃত হচ্ছে। সাংস্কৃতিক মুক্তি এবং বাংলাদেশের মুক্তি হচ্ছে পরস্পর সম্পূরক। যে সংস্কৃতির মুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তি নিশ্চিত করা গিয়েছিল কিংবা বাংলাদেশের মুক্তির মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির স্বাধীনতা এসেছিল সেই স্বাধীনতাকে খর্ব করা তো বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তবুদ্ধির চর্চা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ভিন্নমতের লেখকদের ওপর চাপ সাইবার বুলিংয়ের মতো ঘটনা সমাজ শিক্ষাঙ্গনে ভীতি তৈরি করছে। বাঙালি সংস্কৃতি হাজার বছর ধরে অসাম্প্রদায়িকতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং বহুত্ববাদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তবে বিভিন্ন সময়ে উগ্রবাদী মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো এই সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানার চেষ্টা করেছে। আসলে বাঙালি সংস্কৃতিকে কোণঠাসা করার প্রচেষ্টা এখন তীব্রতর হলেও, ধরনের প্রয়াস চলে আসছিল অনেক দিন থেকে। ২০০১ সালে রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে উগ্রবাদীদের বোমা হামলা এর অন্যতম বড় উদাহরণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মঙ্গল শোভাযাত্রাকেধর্মবিরোধীআখ্যা দিয়ে এটি বন্ধ করার জন্য আইনি সামাজিক চাপ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। তাছাড়া এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে, মূর্তি আখ্যায়িত করে। তাছাড়া পোশাকের ক্ষেত্রেও, বিশেষ করে নারীদের পোশাকের ক্ষেত্রে, বাঙালিয়ানাকে সম্পূর্ণভাবে অবহেলা করা হচ্ছে। টিপ পরা, শাড়ি পরা বা ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পোশাক পরিধানের কারণে নারীদের হেনস্তা করার ঘটনা ইদানীং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বাস্তবে দেখা যাচ্ছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে পাকিস্তান টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে টিপ পরা নিষিদ্ধ করা হলে, প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী ফেরদৌসী রহমান তৎকালীন টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করা বন্ধ করে দেন। অথচ আজ বাংলাদেশ উল্টো পথে হাঁটছে। 

বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ চালু করা হয়েছিল সেই জিয়ার আমলেই বাংলাদেশের মানুষকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাংলাদেশী নাগরিকত্ব ঠিক আছে কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা যে বাঙালি সেই জাতি সত্ত্বাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল যার পুনরাবৃত্তি আমরা ২০২৪ সালের আগস্টের পরও লক্ষ্য করছি। বিশ্বের সর্বত্র ক্ষমতাসীন দলের পরিবর্তন ঘটে থাকে কিন্তু তাতে তার ভাষা সংস্কৃতির ওপর কোন প্রভাব পড়ে না। কিন্তু বাংলাদেশে সংস্কার সাধনের নামে সংস্কৃতিতে যে পরিবর্তন আনা হচ্ছে তা বস্তুত বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ, বাঙালির অস্তিত্ব মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র। 

Related Posts