অন্ধকারে জীবন, আতঙ্কে রাজপথ || খায়রুল আনোয়ার

লোডশেডিং, গ্যাস সংকট, খুনোখুনি ছিনতাই জনজীবনের স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে। এমনিতেই ভাদ্র মাসের গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা, তার ওপর প্রতিদিন রুটিন করে চলছে দফায় দফায় লোডশেডিং। বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে অনেকদিন ধরেইবিদ্যুৎ যায় না, মাঝে মাঝে আসে’—এই অবস্থা চলছে। রাজধানীর যেসব এলাকায় এতদিন বিদ্যুৎ যেত না, এখন সেখানেও লোডশেডিং হচ্ছে। তবে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার তৃণমূলের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রোগীরা। বিদ্যুৎহীন অবস্থায় অনেক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোমবাতি জ্বেলে মোবাইলের আলোর ওপর নির্ভর করে চলে রোগীদের জরুরি চিকিৎসা। দীর্ঘদিন ধরে সংবাদমাধ্যমে বিদ্যুৎ গ্যাস সংকটের খবর শিরোনাম হচ্ছে। একই সঙ্গে শিরোনামে জায়গা করে নিয়েছে হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি ছিনতাইয়ের খবর। অন্যদিকে কখনো সবজির দাম চড়া, আবার কখনো আটাময়দার দাম বাড়তি।

এসব কিছু মিলিয়ে মানুষ বিরক্ত ক্ষুব্ধ। অনেক ক্ষেত্রে সংকটগ্রস্ত মানুষ অসহায় বোধ করছে। এই অসহায়ত্বের কারণ হচ্ছে, সংকট নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী কর্তাব্যক্তিদের নীরব ভূমিকা। তবে মাঝেমধ্যে তারা এমন কিছু বলেন, যা মানুষের হতাশা আরও বাড়িয়ে তুলছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তৎপরতা দৃশ্যমান। কিন্তু বিদ্যুৎ জ্বালানির দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী বা কর্তাব্যক্তিদের এমন কোনো তৎপরতাযা সর্বস্তরের মানুষ, শিল্পকারখানার মালিক কিংবা নতুন সরকারের আমলে নতুন উদ্যোক্তা হতে আগ্রহীদের আশ্বস্ত করবেদৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। তবে লেখা প্রস্তুতের সময় জানা গেল, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে বলে বুধবার জাতীয় সংসদে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম। প্রতিমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, আগস্টে বিদ্যুৎ গ্যাস সরবরাহ নিয়ে মানুষ যে দুর্ভোগে পড়েছে, সেপ্টেম্বরে যাতে তার পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে।

তিন নারীর মৃত্যু দুর্ভাগা শিক্ষক পরিবার

আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম থেকে বোঝা যায়, পরিস্থিতি কতখানি নাজুক। প্রাসঙ্গিক হবে বলে এখানে সংবাদপত্রের কয়েকটি শিরোনাম উদ্ধৃত করা হলো। ২৪ অগাস্ট সমকালের প্রধান শিরোনাম, ‘খুন বাড়ছে, জনমনে উদ্বেগ একই দিনের পত্রিকায়পরিবারের সবাইকে হত্যা’, আরেকটি শিরোনাম, ‘দুই ছাত্র গুলিবিদ্ধ, ১৭ দিনে ১০ জন ২৬ অগাস্ট প্রকাশিত সমকালের প্রধান শিরোনাম, ‘দেশে ৩৮৬ কিশোর গ্যাং, সোয়া চার হাজার সদস্য বেপরোয়া একই সংবাদপত্রের ৩০ অগাস্টের প্রধান শিরোনাম, ‘খুলনায় খুনোখুনি বন্ধে এক মাসের সময়সীমা এসবের মাঝেই সকল সংবাদমাধ্যমের খবর হয়ে গেলেন বগুড়া থেকে চোখের চিকিৎসা করাতে ঢাকায় আসা স্কুল শিক্ষিকা রনজিলা পারভিন রুলি। ছিনতাইকারীর হাতে জীবন দিয়ে তিনি খবরের শিরোনাম হলেন। ২৯ অগাস্ট ভোরে সংসদ ভবনের সামনে মোটরসাইকেলে এসে ছিনতাইকারীরা তার ভ্যানেটি ব্যাগ ধরে হ্যাঁচকা টান দিলে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে রনজিলা মাথায় গুরুতর আঘাত পান। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এর আগে একই রকম ঘটনায় রাজধানীতে আরও দুই নারী প্রাণ হারিয়েছেন। গত জুন সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে সোহেলী ইসলাম সোমা নামে এক নারী আহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। গত ১২ মার্চ ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন মুক্তা আক্তার নামে এক গৃহবধূ। সংসদ ভবন এলাকার ঘটনার দুই দিনের মধ্যে ধানমন্ডিতে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মোটরসাইকেলে এসে ৩৮ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় তিন দুর্বৃত্ত। ৩১ অগাস্ট দৈনিক আগামীর সময়ের একটি শিরোনাম ছিল, ‘রাতে ভোরে নিরাপদ নয় রাজধানী প্রকাশিত এই খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজধানীতে ছিনতাইয়ের স্পট ৩০০, হটস্পট ৫৫ এবং তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী ১৩৮৭ জন।

শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন নগর শহরে একের পর এক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছে রংপুরে। জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী দুই সন্তান নিজ বাড়িতে খুন হয়েছেন। গণপতির মেয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী আগামী চক্রবর্তী ছিলেন বাগদত্তা। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকেও হত্যাকারীরা দয়ামায়া করেনি। পুরো পরিবারটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ঘটনার তদন্ত নিয়ে পুলিশের ভূমিকা ইতোমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। প্রকৃত হত্যাকারীদের চিহ্নিত করা এবং এর যথাযথ বিচার নিয়ে স্বজনরা সন্দিহান। শুধু স্বজন নয়, নাগরিক সমাজও গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছে।

খুনের পাল্লা ভারী হচ্ছে

পুলিশ সদর দপ্তর আইন সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৯৩৪টি খুনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসে খুনের মামলা হয়েছে ২৯৮টি, জুন মাসে ৩২৩ টি এবং মে মাসে ৩১০টি। নারী শিশু নির্যাতনের ঘটনাও বেড়েছে। এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত নারী শিশু নির্যাতনের মোট মামলার সংখ্যা হাজার ১৬৩টি। পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, শুধু জুলাই মাসে সর্বোচ্চ খুনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে ঢাকা অঞ্চলে, যার সংখ্যা ৬৬টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খুনের সংখ্যা ৫৪টি, চট্টগ্রাম অঞ্চলে।

রাজধানী ঢাকায় মাঝেমধ্যে কিশোর গ্যাং বেপরোয়া হয়ে উঠছে। চাপাতি, ছুরি, চাকু দিয়ে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী নারীকে আক্রমণ করা হচ্ছে। মোহাম্মদপুর যেন কিশোর গ্যাংয়ের অভয়ারণ্য। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, নাগরিক নিরাপত্তা ফিরে আসবে কবেএই প্রশ্নের জবাব সম্ভবত কারও জানা নেই।

বিদ্যুৎ গ্যাসে অশনি সংকেত

সুদীর্ঘ ১৮ বছর পর বিএনপি সরকার গঠনের মাত্র ১১ দিনের মাথায় আমেরিকা ইরান আক্রমণ করলে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়, যার বিরূপ প্রভাব থেকে বাংলাদেশও বাদ যায়নি। এই যুদ্ধের বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার পরও প্রশ্ন থেকে যায়, ছয় মাস অতিবাহিত হওয়ার পরেও সরকার বিদ্যুৎ গ্যাস সংকট মোকাবিলায় এখন পর্যন্ত সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারেনি কেন? পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য জরুরিভিত্তিতে কোনো পদক্ষেপও দৃশ্যমান নয়। অথচ দীর্ঘদিন ধরে চলা বিদ্যুৎ গ্যাসের সংকটে প্রতিদিনের জীবনপ্রবাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার উৎপাদন, যা অর্থনীতির জন্য সংকট ডেকে আনছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্যমতে, ৬৬০টির মতো বস্ত্রকল গত জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে পড়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) তথ্য বলছে, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় কমপক্ষে তিনশ পোশাক কারখানার উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকলে অনেক কারখানা ডিজেল দিয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে চালু রাখতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফিলিং স্টেশনগুলোতে প্রতিদিন সিএনজিচালিত যানবাহনের দীর্ঘ সারি। উবার, পাঠাও সিএনজিচালকরা তাদের চাহিদা মতো গ্যাস পাচ্ছেন না। এতে করে তাদের উপার্জনের ক্ষেত্রে টান পড়ছে।

কলকারখানার পাশাপাশি জেলাউপজেলার হাসপাতাল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লোডশেডিং তীব্র আকার ধারণ করেছে। একটি জেলা সদরের সরকারি জেনারেল হাসপাতালে সম্প্রতি রাত ১২টা থেকে পরদিন রাত ১২টা পর্যন্ত ছয়বার লোডশেডিং হয়। ঘণ্টা হিসাবে মোট সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা হাসপাতালটি বিদ্যুৎহীন অবস্থায় ছিল। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অবস্থা এতে সহজেই অনুমান করা যায়। ঘন ঘন এবং দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং দেওয়ার ফলে রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন এলাকার সাবস্টেশনের কর্মকর্তাকর্মচারীরা জনরোষের আতঙ্কের মধ্যে আছেন।

বিদ্যুৎ গ্যাসের চলমান এই সংকটে জরুরি ভিত্তিতে সমাধানের পথ খুঁজে বের না করলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে, যা জ্বালানি খাত অর্থনীতির জন্য এক অশনি সংকেত ডেকে আনবে। দীর্ঘমেয়াদী টেকসই জ্বালানিনীতি প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। উদ্ভূত সংকট মোকাবিলায় এখন দরকার যত দ্রুত সম্ভব আশু কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি ছিনতাই বন্ধ হবে এবং মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসবেএটিই এখন এক বড় চাওয়া।

Related Posts