শিশুমৃত্যুর বিভীষিকার কবলে বাংলাদেশ ড. জীবন বিশ্বাস

কান্নাভেজা মে মাস। মাস বাঙালির জাতীয় স্মৃতিতে কেবল বর্ষাগমনের পূর্বাভাস নিয়ে আসেনি, এনেছে এক নিঃশব্দ মহামারির হাহাকার। বাংলাদেশে চলমান হামদুর্যোগ কেবলই কোনো জীবাণুঘটিত আপদ নয়, বিজ্ঞান ব্যবস্থাপনার সংকটের চেয়েও এটি রাষ্ট্রের আত্মিক এবং নৈতিক দেউলিয়াত্বের এক মহাদলিল। মে মাসের শেষলগ্নে এসে যখন দেখা যায়, সন্দেহভাজন নিশ্চিত হামের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা পাঁচশ পেরিয়ে গেছে, তখন সভ্যতার দম্ভ বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানাচ্ছে, অন্তত ৮৬টি নিষ্পাপ শিশুর নিশ্চিত মৃত্যুর সমান্তরালে আরও ৪২৬টি মৃত্যুর নেপথ্যে রয়েছে এই একই ঘাতকের ছায়া। মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে পর্যন্ত প্রায় ৬২ হাজারেরও বেশি মানুষ এই সংক্রমণের শিকার হয়েছে, যাদের সিংহভাগেরই বয়স পাঁচের নিচে। এরা এমন কিছু পরিবারের সন্তান, যাদের কাছেজনস্বাস্থ্যকোনো সেমিনার কক্ষের গালভরা শব্দবন্ধ ছিল না, বরং ছিল প্রতিদিন বেঁচে থাকার একমাত্র খড়কুটো। হতভাগ্য শিশুদের পরিবার তাই আহাজারি করে প্রশ্ন করে, আওয়ামী লীগ সরকার যুগের পর যুগ বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বিক্রি করে না হয় পদ্মা সেতু, কর্ণফুলি টানেল, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎ, রুপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র ইত্যাদি করেছে, কিন্তু বিক্রির যতটুকু বাকি ছিল, . মো. ইউনুস বিশ্বশক্তির কাছে তা বিক্রি করে আদতে কী করেছেন? দেশে হামের চালান, শিশুমৃত্যুর দাওয়াই এনেছেন? অসংখ্য মাতাপিতার বুক খালি করে যে শিশু চিকিৎসার অভাবে অকালে অবহেলায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল, . মো. ইউনুসের দেশ বিক্রির টাকা কি সেই শিশুদের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারবে? আজকের উপসম্পাদকীয়তে বিষয়টির দিকেই আলোকপাত করা হয়েছে।

ইতিহাস সাক্ষী, মানুষের আবিষ্কৃত সবচেয়ে সংক্রামক ব্যাধিগুলোর অন্যতম এই হাম। আবার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, এটিই সবচেয়ে সহজে প্রতিরোধযোগ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রতিবেদন এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টিই এখন এই ভাইরাসের চারণভূমি। অথচ দুই ডোজের একটি নিরাপদ কার্যকর টিকাই পারত এই মরণযজ্ঞ রুখে দিতে। ব্যর্থতার গ্লানি কখনো প্রকৃতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না, যখন ট্র্যাজেডির প্রতিটি ধাপ আগে থেকেই অনুমেয় থাকে। এপ্রিলের শুরুতেই ইউনিসেফের পরিস্থিতিপ্রতিবেদনে স্পষ্ট সতর্কবার্তা ছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, আক্রান্তদের ৭২ শতাংশ শিশুই ছিল সম্পূর্ণ টিকাহীন, আর ১৬ শতাংশ পেয়েছিল আংশিক ডোজ। জাতীয় হামরুবেলা টিকার গুদাম যখন শূন্য, চিকিৎসালয়গুলো তখন উপচে পড়া ভিড়, তীব্র সরবরাহঘাটতি আর আইসোলেশন ব্যবস্থার অভাবে ধুঁকছিল।

ফলস্বরূপ, আজ যখনক্রয়বিলম্ব’, ‘প্রশাসনিক রূপান্তরকিংবাসরবরাহসংকট’—এরকম কিছু সুশীল মার্জিত শব্দবন্ধ দিয়ে ব্যর্থতাকে আড়াল করার চেষ্টা হয়, তখন তা স্রেফ জনবিবেককে আফিম খাইয়ে ঘুম পাড়ানোর শামিল মনে হয়। আমলাতান্ত্রিক ফাইলের প্রতিটি ধীরগতির আড়ালে লুকিয়ে ছিল একটি শিশুর নিভে যাওয়া নিঃশ্বাস। প্রতিটি বিলম্বিত টিকাচালানের সমার্থক শব্দ ছিল তীব্র জ্বর, গায়ে লাল ফুসকুড়ি, নিউমোনিয়া কিংবা শেষমেশ এক টুকরো সাদা কাফন। ইউনিসেফ অন্তর্বর্তী সরকারকে অন্তত পাঁচটি লিখিত চিঠি এবং ডজনখানেক বৈঠকের মাধ্যমে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছিল যে মহাসংকট সমাগত। অথচদ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’—এর তথ্য অনুযায়ী, যেখানে বছরে প্রায় সাত কোটি ডোজ টিকার প্রয়োজন, সেখানে ২০২৫ সালের শেষভাগে দেশে এসেছিল প্রয়োজনের একতৃতীয়াংশেরও কম। মূলত . মো. ইউনুস ক্ষমতা হারানোর আগে ব্যস্ত ছিলেন দেশ বিক্রির ঘৃণ্য পরিকল্পনায়, তার কাছে শিশুমৃত্যুর প্রসঙ্গ তেমন গুরুত্ব পাবার কথা নয়; ফলাফল আজকের নিষ্পাপ শিশুর ব্যথাতুর অনৈতিক মৃত্যু। এর দায় . মো. ইউনুস, তার প্রশাসন বর্তমান প্রশাসনেরও বৈকি।

টিকা ক্রয়ের গোলকধাঁধাটি গভীরভাবে তলিয়ে দেখা দরকার। বিখ্যাতঝপরবহপবসাময়িকী এবং দেশীয় সংবাদমাধ্যমগুলো ইঙ্গিত করেছে, ইউনিসেফের চেনা পথ ছেড়ে উন্মুক্ত দরপত্রের দিকে পা বাড়ানোর খেসারতও এই সংকট। মনে রাখা দরকার, . মো. ইউনুস ক্ষমতায় এসে প্রথম যে কাজটি করেছিলেন, তা হচ্ছে বেআইনিভাবে তার ৬৬৬ কোটি টাকার কর ফাঁকি মামলা প্রত্যাহার। এতেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তিনি কে? কিন্তু তথাকথিত ২৪এর মবের ভয়ে কেউ তখন মুখ খোলেনি। তার কাছে শিশুর জীবন নয়, দরপত্রের লেনদেনই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। যদিও নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে ক্রয়প্রক্রিয়ায় কোনো গলদ ছিল না। কিন্তু তর্কের খাতিরে তর্ক চললেও একটি রূঢ় সত্যকে অস্বীকার করার কোনো পথ নেইÑশিশুরা মারা গেছে এবং তা রুটিন টিকাদানের চরম গাফিলতির কারণেই। দুর্নীতি বা পর্দার আড়ালের খেলা তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে। কিন্তু তদন্ত করবে কে? আর তদন্ত করলেও, সেই তদন্তের দীর্ঘসূত্রতাকে রাজনৈতিক সস্তা স্লোগানের আড়ালে ঢেকে দেওয়া হবে না, তাই বা কে জানে? নৈতিক অপরাধের রায় তো ল্যাবরেটরির পরীক্ষার আগেই হয়ে গেছে বারবার সতর্ক করার পরও কেন প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু ঠেকানো গেল না?

প্রাদুর্ভাবের মেঘ কিন্তু হঠাৎ আকাশে জমেনি। ২০২৫ সালের এপ্রিলেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জানিয়েছিল, কাগজেকলমে টিকাদানের হার ৮১. শতাংশ হলেও প্রায় সাড়ে চার লাখ শিশু পূর্ণ টিকা থেকে বঞ্চিত এবং ৭০ হাজার শিশু কোনোদিন টিকার নামই শোনেনি। বিশেষ করে শহুরে বস্তি দুর্গম অঞ্চলের শিশুরা যে বারুদের স্তূপের ওপর বসে ছিল, তা প্রশাসনের সবারই জানা ছিল। একটি সংবেদনশীল দূরদর্শী রাষ্ট্র এই পরিসংখ্যান দেখামাত্রই যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি গ্রহণ করত। কিন্তু . মো. ইউনুস এক অদ্ভুত অবহেলায় দেশকে যেন চোখ বেঁধে হেঁটে নিয়ে গেছে এই মরণফাঁদের দিকে।

এই হামসংকট আসলে দেশের সামগ্রিক শিশুস্বাস্থ্য কাঠামোর ভেতরের কঙ্কালটাকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালেও বাংলাদেশে এক লাখের বেশি শিশু পাঁচ বছর পূর্ণ করার আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছে, যার দুইতৃতীয়াংশেরই আয়ু ছিল মাত্র ২৮ দিন। ঘরে প্রসবের চিরন্তন ঝুঁকি, উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসার অভাব আর ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর ব্যবসায়িক মনোভাব সব মিলিয়ে নবজাতকেরা জন্মলগ্নেই এক অসম যুদ্ধে লিপ্ত হয়। সম্প্রতি আদ্দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয়টি নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা এবং তা নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি কোনো বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি নয়। এটি সেই পচে যাওয়া ব্যবস্থারই প্রতিচ্ছবি, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক দীর্ঘসূত্রিতা, অক্সিজেনের অভাব আর যান্ত্রিক ত্রুটি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

রাষ্ট্র নাগরিকের সম্পর্কটি এক অলিখিত সামাজিক চুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। নাগরিক রাষ্ট্রকে কর দেয়, আনুগত্য দেয়, আর বিনিময়ে আশা করে অন্তত তার সন্তানের জীবনটুকুর নিরাপত্তা। যখন হামের মতো একটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য রোগে শত শত শিশুর লাশ পড়ে, তখন প্রশ্নটা কেবল হাসপাতালের বেড বা টিকার কমতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্ন ওঠেÑরাষ্ট্র কি এই শিশুদের স্বাধীন নাগরিক ভাবছে, নাকি ফাইলের পাতায় সাজিয়ে রাখা কিছু প্রাণহীন সংখ্যা হিসেবে দেখছে মাত্র?

আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন কেবল কিছু জরুরি টিকার ডোজ নয়, বরং এক নির্মম কঠোর জবাবদিহিতা। টিকা ক্রয়ের প্রতিটি সিদ্ধান্তের হিসাব জনসমক্ষে আসতে হবে, জেলাভিত্তিক ইপিআই (ঊচও) মজুতের সঠিক তথ্য প্রকাশ করতে হবে, এবং অবহেলার দায়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। রুটিন টিকাদানকে দেখতে হবে জাতীয় নিরাপত্তার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে।

বাঙালি অতীতেও বহু দুর্যোগের বুক চিরে ফিনিক্স পাখির মতো বেঁচে উঠেছে, এবারও হয়তো এই মেঘ কেটে যাবে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এই মে মাসটি চিরকাল একটি কালো দাগ রেখে যাবে যার সিংহভাগের জন্যই দায়ী . মো. ইউনুস তার অন্তবর্তিকালীন প্রশাসন। বুক চাপড়ে কান্নার আগে স্বীকার করতেই হবে, এই ট্র্যাজেডি ছিল প্রতিরোধযোগ্য, এটি অমোঘ কোন লিখন ছিল না। এটি সরকারের প্রশাসনিক ঔদাসীন্য, লাল ফিতের দৌরাত্ম আর যৌথ উদাসীনতার এক নির্মম ফসল। ভুক্তভুগী আর কেউ নয়, বাংলাদেশেরই নতুন প্রজন্ম, নিষ্পাপ শিশু।


Related Posts