কাগজের ক্যানভাসে পৃথিবীর গল্প—১১ দুই মহাপ্রাণ: লুমুম্বা ও বঙ্গবন্ধু || আখতার আহমেদ রাশা

প্যাট্রিস লুমুম্বা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উভয়েই কেবল নিজ নিজ দেশের স্বাধীনতার স্থপতি ছিলেন না, বরং বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় বিশ্বের শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর ছিলেন। সাম্রাজ্যবাদ চক্রান্তের শিকার হয়ে এই দুই মহান নেতার নির্মম হত্যাকান্ড ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায়। এই দুই ক্ষণজন্মা নেতার জীবনের ট্র্যাজেডি যেকোনো সংবেদনশীল হৃদয়কে ব্যথিত করে। ঘাতকেরা বুলেট দিয়ে তাঁদের শরীরকে বিনাশ করতে পারলেও, তাঁদের চেতনাকে স্পর্শ করতে পারেনি। সেই অবিনশ্বর আদর্শই আজ দুই দেশের ব্যাংকনোটের ক্যানভাসে জীবন্ত এক মহাকাব্য হয়ে টিকে আছে। ভৌগোলিক দূরত্বে আফ্রিকার কঙ্গো আর এশিয়ার বাংলাদেশ হয়তো দুই মেরুর দুটি দেশ। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে এই দুই ভূখন্ডে এমন দুজন মানুষের জন্ম হয়েছিল, যাঁরা স্রেফ নিজেদের জাদুকরী ব্যক্তিত্ব আর অকুতোভয় সাহসের শক্তিতে কোটি কোটি শোষিত আত্মাকে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন; ভেঙে চুরমার করেছিলেন বহু বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল, এনে দিয়েছিলেন একটি নতুন ভোরের সূর্য। তাঁরা হলেন কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই দুই নেতার রাজনৈতিক জীবন, দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং শেষ পর্যন্ত তাঁদের নির্মম পরিণতি যেন এক আশ্চর্য বেদনাবিধুর সুতোয় বাঁধা। ঘাতকের বুলেট কিংবা সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত তাঁদের স্তব্ধ করে দিলেও, আজ কঙ্গো এবং বাংলাদেশের কাগজের মুদ্রায় এই দুই মহান নেতার অবয়ব মাথা উঁচু করে জানান দিচ্ছে, বীরদের কখনো মুছে ফেলা যায় না।

বেলজিয়ামের দীর্ঘ এবং নির্মম ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আফ্রিকান জাতীয়তাবাদের যে অগ্নিমশাল জ্বলে উঠেছিল, তার নাম প্যাট্রিস লুমুম্বা। ১৯৬০ সালে কঙ্গো যখন স্বাধীন হয়, লুমুম্বা দেশটির প্রথম গণতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো কঙ্গোর বিপুল খনিজ সম্পদ হাতছাড়া করতে চায়নি। ফলে স্বাধীনতার মাত্র কয়েক মাসের মাথায়, আন্তর্জাতিক চক্রান্ত অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হন এই তরুণ নেতা। ১৯৬১ সালের জানুয়ারি মাসে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে লুমুম্বাকে নির্মমভাবে বন্দি হত্যা করা হয়। লুমুম্বার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল, তিনি তাঁর সেনাপ্রধান জোসেফ মবুতুকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতেন। মবুতু ছিলেন লুমুম্বার অতি ঘনিষ্ঠ, তাঁর ডান হাত। কিন্তু ক্ষমতার অন্ধ মোহ আর বিদেশী প্রভুদের ডলারের কাছে মবুতু তাঁর সমস্ত সততা দেশপ্রেমকে বিসর্জন দেয়। স্বাধীনতার বয়স তখন মাত্র কয়েক মাস, অথচ তখনই পরম বিশ্বস্ত মবুতু লুমুম্বাকে অন্তরীণ করেন। ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ১৯৬১ সালের জানুয়ারির এক কনকনে শীতের রাতে। লুমুম্বাকে যখন বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন তাঁরই দেশের সেনারা তাঁর চোখ থেকে চশমাটি কেড়ে নেয় এবং মাটির ওপর টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। যে শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য তিনি আজীবন লড়াই করেছিলেন, তাদেরই পোশাক পরা এই সেনারা তাঁর ওপর মেতে ওঠে এক অমানুষিক পৈশাচিক নির্যাতনে। এরপর লুমুম্বাকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে কঙ্গোর কেন্দ্র থেকে সুদূর কাটঙ্গা প্রদেশে স্থানান্তরিত করা হয়। খনিজসমৃদ্ধ এই বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রদেশটির ক্ষমতায় ছিলেন লুমুম্বার চরম রাজনৈতিক শত্রু এবং সাম্রাজ্যবাদীদের বিশ্বস্ত সহযোগী ময়সে শম্বে। সেখানে বেলজিয়ামের সেনা অফিসার এবং কঙ্গোর নিজেদের ঘাতক ভাইদের উপস্থিতিতে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে লুমুম্বাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শুধু হত্যাই নয়, ঘাতকদের বেঈমানি আর ভীরুতা এতটাই তীব্র ছিল যে, লুমুম্বার মরদেহ যেন কেউ কোনোদিন খুঁজে না পায় এবং তাঁর কবর যেন বিপ্লবের প্রতীক না হতে পারে, সেজন্য কঙ্গোর মাটিতেই তাঁর লাশ এসিড দিয়ে গলিয়ে সম্পূর্ণ নামনিশানা মুছে ফেলা হয়েছিল। ইতিহাসের এই বীভৎস বেদনাবিধুর রূপটি এক অদ্ভুত সাহসিকতায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কঙ্গোর ১৯৯৭ সালের ফ্রাঙ্ক ( ঋৎধহপ) ব্যাংকনোটে। বিশ্ব মুদ্রার ইতিহাসে এটি এক বিরল এবং ব্যতিক্রমী দলিল, যেখানে এই নোটটির উল্টো পিঠে জাতীয় বীর লুমুম্বাকে তাঁর নিজের মানুষের হাতে হাতবাঁধা বন্দি অবস্থায় গাড়ির পেছনে বসে থাকতে দেখা যায়। ঘাতকদের সেই বেঈমানির ছবি রাষ্ট্র নিজেই তার মুদ্রায় খোদাই করে রেখেছে এক চিরন্তন ধিক্কার হিসেবে। তবে লুমুম্বার এই মহান ত্যাগ কেবল কঙ্গোতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা পুরো আফ্রিকাকে নাড়া দিয়েছিল। এর অন্যতম বড় প্রমাণ গিনির ১৯৭১ সালের ১০ সিলিস (১০ ঝুষরং) ব্যাংকনোটটি। অন্য একটি দেশ হওয়া সত্ত্বেও গিনি তাদের এই মুদ্রার ক্যানভাসে এবং জলছাপে লুমুম্বার প্রতিকৃতি সগৌরবে স্থান দিয়েছিল, যা ছিল ঘরের শত্রুদের বেঈমানি এবং সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের বিরুদ্ধে এক শৈল্পিক মোক্ষম জবাব। আর পরবর্তীতে কঙ্গোর ১০,০০০ ফ্রাঙ্ক নোটে চশমা পরিহিত যে তীক্ষè দূরদর্শী চোখের লুমুম্বাকে আমরা দেখি, তা যেন ঘরের শত্রুদের চরম বেঈমানির বিরুদ্ধে তাঁর আদর্শের এক চূড়ান্ত বিজয়।

কঙ্গোর লুমুম্বা হত্যার ঠিক এক দশক পর, ১৯৭১ সালে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় এক নতুন দেশÑবাংলাদেশ। আর এই মহাকাব্যের একক রচয়িতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানের দীর্ঘ ২৩ বছরের শোষণ, নিপীড়ন আর সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিকে এক সুতোয় বেঁধেছিলেন তিনি। মার্চের একটি মাত্র ভাষণ দিয়ে নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র যোদ্ধায় রূপান্তরিত করার এমন জাদুকরী ক্ষমতা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। কঙ্গোর মতোই, স্বাধীন দেশের মাটিতেও ওঁৎ পেতে ছিল বিশ্বাসঘাতকের দল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, যা বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত বেদনাবিধুর অধ্যায়।

বাংলাদেশের কাগজের মুদ্রার (যেমন: ১০, ২০, ৫০, ১০০, ৫০০ এবং ১০০০ টাকা) প্রায় প্রতিটি নোটের মূল ক্যানভাস জুড়েই সগৌরবে খোদাই করা আছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি। নোটগুলোতে চশমা মুজিব কোট পরিহিত তাঁর সেই চেনা অবয়বটি কেবল একজন রাষ্ট্রনেতার ছবি নয়, এর পেছনে জড়িয়ে আছে একটি রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধ, তিরিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ আর একটি স্বাধীন পতাকার জন্মইতিহাস। প্রতিটি টাকার নোট যেন বাঙালির পকেটে পকেটে ঘুরে বেড়ানো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের এক টুকরো জীবন্ত মানচিত্র।

প্যাট্রিস লুমুম্বা কিংবা শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁরা কেউ স্রেফ কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন নিজ নিজ জাতির আত্মপরিচয়ের দর্পণ। লুমুম্বা লড়েছিলেন আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের আত্মমর্যাদার জন্য, আর বঙ্গবন্ধু লড়েছিলেন বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য। ঘাতকেরা ভেবেছিল তাঁদের হত্যা করলেই বুঝি সব শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাস তার ঋণ শোধ করতে জানে। কঙ্গোর ১০ হাজার ফ্রাঙ্ক কিংবা বাংলাদেশের প্রতিটি টাকার ভাঁজে যখন এই দুই মহাপ্রাণের মুখচ্ছবি ভেসে ওঠে, তখন বোঝা যায়মানুষকে হত্যা করা যায়, কিন্তু তাঁর আদর্শ আর চেতনাকে কখনো বুলেটে বন্দি করা যায় না। তাঁরা আজ স্থান করে নিয়েছেন কোটি মানুষের হৃদয়ে এবং পকেটে থাকা জাতীয় গৌরবের ক্যানভাসে।

লুমুম্বাকে যে সেনাপ্রধান জোসেফ মবুতু বেঈমানি করে হত্যা করেছিলো, পরবর্তীতে সেই মবুতুই যখন কঙ্গোর পূর্ণ ক্ষমতায় বসেন, তখন তিনি নিজেকে জনগণের কাছে জনপ্রিয় করতে এবং লুমুম্বার অনুসারীদের শান্ত করতে এক চাতুরতা করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি লুমুম্বাকে আনুষ্ঠানিকভাবে কঙ্গোর জাতীয় বীর ঘোষণা করেন। সেই ধারাবাহিকতাতেই ১৯৭০ সালের ২০ মুকুতা নোটের সম্মুখভাগে (ঙনাবৎংব) লুমুম্বার প্রতিকৃতিটি দেওয়া হয়েছিল। যে হাত লুমুম্বাকে হত্যা করেছিল, সেই মবুতুর সরকারই আবার নিজেদের টিকিয়ে রাখতে লুমুম্বার ছবি মুদ্রায় ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিল। এটি ইতিহাসের এক চরম নাটকীয়তা! ইতিহাসের কী অদ্ভুত প্রতিশোধ! ঘাতকেরা যাকে মাটির নিচে লুকিয়ে ফেলতে চেয়েছিল, সময়ের প্রয়োজনে তাকেই আবার মুদ্রার ক্যানভাসে ফিরিয়ে আনতে হয়েছে।

১৫ আগস্টের সেই কালরাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে যখন সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী ঘাতক আক্রমণ করে, বঙ্গবন্ধু তখনও বিশ্বাস করতে পারেননি। তিনি সিঁড়ির ওপর ধাপ থেকে ঘাতকদের আকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোরা কী চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?’ কিন্তু বেঈমান বাঙালি ঘাতকদের হাত কাঁপেনি। যে তর্জনী উঁচিয়ে তিনি একদা টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া কাঁপিয়েছিলেন, সেই তর্জনী চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হলো বুলেটের আঘাতে। লুমুম্বাকে একা হত্যা করা হয়েছিল, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে ঘাতকদের হিংস্রতা এতটাই জঘন্য ছিল যে তারা তাঁর পরিবারের নিষ্পাপ শিশু শেখ রাসেলসহ সবাইকে নিদারুণভাবে হত্যা করে। 

বাংলাদেশের কাগজের মুদ্রায় চশমা মুজিব কোট পরিহিত যে অবয়বটি আমরা দেখি, তা কেবল একজন রাষ্ট্রনেতার ছবি নয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক বুকভরা অন্ধ বিশ্বাস, আর তার বিপরীতে নিজের মানুষদের চরম নৃশংসতম বেঈমানির এক করুণ ইতিহাস। প্যাট্রিস লুমুম্বা এবং শেখ মুজিবুর রহমানÑদুজনকেই পৃথিবীর বুক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল একই সূত্রে, একই কায়দায়। ক্ষমতার লোভে যে ঘাতকরা বেঈমানি করেছিল, তাদের স্থান হয়েছে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে। ঘাতকেরা ভেবেছিল লুমুম্বা আর বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেই বুঝি সব শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু মহান নেতাদের হত্যা করা গেলেও তাদের আদর্শ আর চেতনাকে কখনো বুলেটে বন্দি করা যায় না। আজ কঙ্গোর ১০ হাজার ফ্রাঙ্ক কিংবা বাংলাদেশের প্রতিটি টাকার ভাঁজে যখন এই দুই মহাপ্রাণের মুখচ্ছবি ভেসে ওঠে, তখন বোঝা যায়Ñইতিহাসের ক্যানভাসে বেঈমানেরা চিরকাল কুখ্যাতই থেকে যায়, আর শোষিত মানুষের নায়কেরা অমর হয়ে বেঁচে থাকেন কোটি মানুষের হৃদয়ে এবং কাগজের মুদ্রায়।

Related Posts