গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— বারো সুরের অবিনাশী ভাস্কর মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়

জীবন বিশ^াসঃ বাংলা গানের সুদীর্ঘ ইতিহাসে কিছু কণ্ঠ আছে, যে কণ্ঠগুলোকে কেবল সুন্দর বা মধুর বলে বিশেষায়িত করলে অপূর্ণতা থেকে যায়। সেই কণ্ঠগুলো শুধু কেবল সুর ছড়িয়ে দেয় তা নয়, তারা শ্রোতার চারপাশে এক মায়াবী আবহাওয়া তৈরি করেযেখানে মিশে থাকে নিস্তব্ধ বিকেল, পুরোনো দিনের ছায়াময় সুরের গলি, সন্ধ্যার উদাস জানালা, দূরের মৃদু ঘণ্টাধ্বনি আর মানুষের বুকের ভেতরে জমে থাকা কিছু অপ্রকাশিত নীরব হাহাকার। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন সেই বিরল রাজকীয় কণ্ঠের একচ্ছত্র অধিপতি। তাঁর গান শুনলে মনে হয়, সুর কোনো নিছক বিনোদনের মাধ্যম নয়, সুর মানুষের অন্তর্লোকের শুদ্ধতম এক আর্তি। প্রেম, বিরহ, ভক্তি, স্মৃতি কিংবা অভিমানসবকিছুকে তিনি এমন এক মরমী মমতায় কণ্ঠে ধারণ করেছেন যে, বাংলা গানের রসিক শ্রোতারা আজও তাঁর সুরের আয়নায় নিজেদের জীবনের অবিকল প্রতিচ্ছবি খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ১৯২৯ সালের ১১ আগস্ট কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কালীঘাটে এই সুরনায়কের জন্ম। ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি তিনি কলকাতাই নিজের পার্থিব সংগীতিক জীবনের ইতি টেনে অনন্তের পথে পাড়ি জমান। পিতা অতুলচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের স্নেহে এবং পরিবারের সামগ্রিক সংগীতময় আবহে গড়ে উঠেছিল তাঁর প্রথম সাংগীতিক পাঠশালা। কাকা রত্নেশ্বর মুখোপাধ্যায় সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে তাঁর প্রথাগত তালিম শুরু হয়। শৈশব থেকেই কীর্তন, ভজন, উচ্চাঙ্গ সংগীত এবং ভক্তিগীতির যে অবিরাম স্রোত তাঁর পারিবারিক আঙিনায় প্রবাহিত ছিল, তা মূলত তাঁর গানের ভিতকে ইস্পাতের মতো মজবুত করে দিয়েছিল।

সমকালীন নক্ষত্রমন্ডলী নিজস্ব স্বরচিত্র

মানবেন্দ্র যখন আধুনিক গানের জগতে পা রাখেন, তখন সেই আকাশ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, শ্যামল মিত্র, সতীনাথ মুখোপাধ্যায় এবং অখিলবন্ধু ঘোষের মতো দীপ্তিময় নক্ষত্রে মুখরিত। এই প্রবল প্রতাপশালী সমসাময়িক পরিমণ্ডলে নিজের একটি স্বতন্ত্র সুরক্ষেত্র তৈরি করা মোটেও সহজসাধ্য ছিল না। কিন্তু মানবেন্দ্র সেই কঠিনতম কাজটি করেছিলেন এক অলৌকিক অনায়াসে। তাঁর কণ্ঠের প্রধান জাদুকরি ছিল সুরের ভেতরের এক অমোঘ শাস্ত্রীয় নিয়ন্ত্রণ, অথচ সেই কঠোর ব্যাকরণের আড়ালে আবেগের প্রকাশে ছিল এক অদ্ভুত মখমলি কোমলতা। তাঁর উচ্চারণ ছিল স্ফটিকের মতো স্পষ্ট, অথচ কোথাও কোনো কাঠিন্য ছিল না। তিনি যখন তান ধরতেন, তাতে কোনো যান্ত্রিক কৌশলের প্রদর্শনী থাকত না, থাকত কেবল অনুভূতির পরম আর্তি।

সুরের প্রথম লগ্ন সৃজনশীল বিস্তার

১৯৪৯ সালে তাঁর প্রথম মৌলিক ডিস্ক শ্রোতাকুলকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। এই সময়ে প্রণব রায়ের লেখা এবং কমল দাশগুপ্তের সুরেফিরিয়া ডেকো নাগানের রেকর্ডের মাধ্যমে তিনি তার আগমনী বার্তা জানিয়ে দেন। একই বছর তড়িৎ ঘোষের লেখা এবং সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের সুরেজানি না তুমি কোথায়গানটি গেয়ে তিনি বাংলা গানে তাঁর শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করেন। তবে তাঁর প্রাথমিক সাফল্যের রাজমুকুট হয়ে আসে ১৯৫৩ সালে ফণী সরকারের রচনায় এবং সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের সুরেনাই চন্দন লেখা শ্রীরাধার চোখে নাইগানটি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তৎকালীন শ্রেষ্ঠ সুরকারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। সলিল চৌধুরী, সুধীন দাশগুপ্ত, রবিন চট্টোপাধ্যায়, নচিকেতা ঘোষ, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ এবং অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো দিকপালদের সাথে তাঁর যুগলবন্দি বাংলা আধুনিক গানকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

প্রেমের আর্তি চলচ্চিত্রের আঙিনা

মানবেন্দ্রর কণ্ঠে চটুল কোন প্রেমের গান শোনা যায় না, যা শোনা যায় তা এক ধরণের আত্মিক সমর্পণ। গীতিকার শ্যামল গুপ্তের লেখা মানবেন্দ্রর নিজের সুরে কালজয়ী গানআমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এই গানে প্রেমিকের কণ্ঠে কোনো অহংকার নেই, আছে এক অলৌকিক ক্ষুধাভালোবাসার পরেও আরও ভালোবাসতে না পারার এক মধুর অপরাধবোধ। এছাড়াওসেই চোখ কোথায় তোমার’, ‘বনে নয় মনে মোর’, ‘বারে বারে কে যেন ডাকে’, ‘নালিশ নাই মোরএবং সোনা বধূ রেগানগুলোর মত অসংখ্য গানেই বিরহ আকুলতা এমনভাবে ডানা মেলেছে যে, তা শ্রোতার ব্যক্তিগত স্মৃতির ডায়েরি হয়ে ওঠে।

চলচ্চিত্রসংগীতেও তিনি ছিলেন এক অপরিহার্য কারিগর।চাঁপাডাঙার বউচলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালক হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরবর্তীতেমায়ামৃগ’, ‘বধূ’, ‘জয়জয়ন্তীএবংগোধূলি বেলাসহ একাধিক চলচ্চিত্রে তাঁর অনন্য সুরসৃষ্টি যুক্ত হয়। চলচ্চিত্রের গান যে কেবল দৃশ্যের বিরতি নয়, বরং নাট্যভাষারই একটা অবিচ্ছেদ্য অংশতা তিনি প্রতি মুহূর্তে প্রমাণ করেছিলেন। রাইচাঁদ বড়ালের সংগীত পরিচালনায়নীলাচলে মহাপ্রভুছবিতে তাঁর কীর্তনের আকুল আবেদন সেই বিস্তৃত সংগীত সুরবোধেরই সাক্ষ্য দেয়।

নজরুলগীতির ধ্রুপদী রূপান্তর বহুমাত্রিকতা

মানবেন্দ্রর শিল্পীসত্তার সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং বৈপ্লবিক অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল নজরুলগীতির আঙিনায়। কাজী নজরুল ইসলামের গানে তিনি এনেছিলেন এক অনন্য শাস্ত্রীয় সংযম, রাগভিত্তিক ব্যঞ্জনা গভীর আবেগের এক মায়াবী কোলাজ।অরুণকান্তি কে গো যোগী’, ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’, ‘মুসাফির মোছ রে আঁখিজল’—এর মতো গানে তাঁর কণ্ঠ নজরুলের প্রেম বিরহচেতনাকে এক নতুন সংজ্ঞা দিয়েছিল। নজরুলের গানকে রেকর্ড দুনিয়ায় একটি স্বতন্ত্র গৌরবময় আসন পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।

তিনি ছিলেন এক ঘরানাঅতিক্রমী বহুমাত্রিক সংগীত সাধক। একদিকে আধুনিক গান নজরুলগীতি, অন্যদিকে কীর্তন, শ্যামাসংগীত এবং পুরোনো ঐতিহ্যবাহী গানসবকিছুতেই তাঁর সমান অবাধ দখল ছিল। গ্রামবাংলার কীর্তনমণ্ডপ থেকে শুরু করে বাঙালির অভিজাত রেডিওস্টুডিওÑসবই যেন তাঁর সুরে এসে একাকার হয়ে গিয়েছিল।

মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কয়েকটি বিখ্যাত গানঃ

১। আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি, ২। বারে বারে কে যেন ডাকে, ৩। বনে নয় মনে মোর, ৪। সেই চোখ কোথায় তোমার, ৫। আমি যে কত একেলা, ৬। নালিশ নাই মোর, ৭। সোনা বধূ রে, ৮। কত আশা নিয়ে তুমি এসেছিলে, ৯। কথা দিয়ে গেলে তবু এলে না, ১০। মধুমালতীর বনে, ১১। এখনো এই রাত অনেক বাকি, ১২। তুমি ফিরায়ে দিয়েছো বলে, ১৩। দোলে দোদুল দোলে ঝুলনা, ১৪। কথা নয় আজ কোন কথা নয়, ১৫। ওই মৌসুমী মন, ১৬। সোনালী দিন যে যায়, ১৭। সাগরের যত ঢেউ, ১৮। যে প্রেমের দেখা মেলে, ১৯। হাজার জনম ধরে তোমারি, ২০। হালকা মেঘের পালকি চরে, ২১। আমাকে তোমার বুঝি আর, ২২। বরষাক্লান্ত দুটি নয়ন মেলে, ২৩। তার চুড়িতে যে রেখেছি মন, ২৪। ময়ূরকন্ঠি রাতের নীলে, ২৫। যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই।

পরিশেষ

মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে বাংলা গানের অতলান্ত সুরসৌন্দর্যের এক ধ্রপদী শিল্পী হিসেবে বাঙালি হৃদয়ে স্থান দিয়েছে। তিনি কখনো গলার ব্যাপ্তি দিয়ে শ্রোতাকে আচ্ছন্ন করতে চাননি বরং এক অদ্ভুত মায়ায় শ্রোতার আত্মার ভেতরে নীরবে সুরের প্রশ্রবণ পৌঁছে দিয়েছেন। আজকের মেটালিক যুগের গানের ভীড়ে মানবেন্দ্রর কণ্ঠ যেন এক পরম শীতল শান্তির প্রলেপ। মানুষ চলে যায়, শহর বদলে যায়, প্রযুক্তির নিয়মে গ্রামোফোনের রেকর্ডও হয়তো ধুলো জমে পুরোনো হয়; কিন্তু একবার যে কণ্ঠ মানুষের হৃদয়ের গভীরে আশ্রয় করে নেয়, সেই কণ্ঠের কোনোদিন মৃত্যু হয় না। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় তাই কেবল অতীতের কোনো অধ্যায় নন, তিনি বাঙালির সুরস্মৃতির এক অবিনাশী এবং অনন্ত বর্তমান কারিগর।

Related Posts