৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্প ঃ হাওয়াই দ্য ডিসেন্ড্যান্টসঃ কাউই হার্ট হেমিংস || আবদুল্লাহ জাহিদ নিউইয়র্ক

হাওয়াইয়ের নীল সমুদ্র, সবুজ দ্বীপ আর শান্ত প্রকৃতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অস্থির পারিবারিক জীবনের কাহিনীÑএই হলো দ্য ডিসেন্ড্যান্টস  (The Descendants)উপন্যাসের মূল সুর। কাউই হার্ট হেমিংস (Kaui Hart Hemmings) অত্যন্ত সংযত অথচ গভীর আবেগময় ভঙ্গিতে দেখিয়েছেন পরিবার, ভালোবাসা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং উত্তরাধিকারÑএই চারটি সূত্র কীভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ম্যাট কিং একজন আইনজীবী, যিনি হাওয়াইয়ের একটি ঐতিহ্যবাহী ভূমির উত্তরাধিকারী। তার স্ত্রী এলিজাবেথ একটি বোট দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে কোমায় চলে যায়। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, তার আর ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। এই আকস্মিক পরিস্থিতি ম্যাটকে বাধ্য করে তার দুই কন্যার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে নিজের কাঁধে নিতে।

কিন্তু ম্যাটের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে তখন, যখন সে জানতে পােও তার স্ত্রী তাকে প্রতারণা করছিলেন। কোমায় শায়িত স্ত্রীর এই অজানা জীবনের মুখোমুখি হয়ে ম্যাট এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে পড়েÑসে কি স্ত্রীকে ক্ষমা করবে, না কি বিশ্বাসঘাতকতার ক্ষত নিয়ে এগোবে?

ম্যাটের বড় মেয়ে অ্যালেক্সÑযে নিজেও কিছুটা বিদ্রোহী দূরত্ব বজায় রাখা স্বভাবের, বাবার সঙ্গে মিলে মায়ের গোপন প্রেমিককে খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই যাত্রা কেবল একজন মানুষকে খোঁজার নয়, বরং নিজেদের সম্পর্ক, বিশ্বাস এবং ভালোবাসার নতুন সংজ্ঞা খুঁজে পাওয়ার পথ হয়ে ওঠে।

ছোট মেয়ে স্কটি, তার সরলতা আর শিশুসুলভ আচরণ দিয়ে পরিবারের ভাঙা সেতুকে জোড়া লাগানোর চেষ্টা কেও অজান্তেই। এই দুই বোনের ভিন্ন স্বভাব মানসিক অবস্থান গল্পটিকে আরও বাস্তব জীবন্ত করে তোলে।

উপন্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো, ম্যাটের পারিবারিক সম্পত্তি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত। এই জমি শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি তার পূর্বপুরুষদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের অংশ। আত্মীয়স্বজনেরা চায় জমিটি বিক্রি করে বিপুল অর্থ লাভ করতে। কিন্তু ম্যাট ধীরে ধীরে উপলব্ধি করেÑসবকিছুর মূল্য অর্থে মাপা যায় না।

এই দ্বন্দ্ব আধুনিকতার চাপ বনাম ঐতিহ্যের টানÑহাওয়াইয়ের প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, এই দ্বীপগুলোতে জমি মানে কেবল সম্পত্তি নয়, এক ধরনের আত্মিক বন্ধন।

স্ত্রীর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোতে ম্যাট এক গভীর মানবিক সিদ্ধান্ত নেয়। সে স্ত্রীর প্রেমিককে খুঁজে বের করে, যেন সে শেষবারের মতো এলিজাবেথকে দেখতে পারে। এই সিদ্ধান্তে রয়েছে ক্ষোভের উপরে উঠে আসা এক মানবিক উদারতা, যা উপন্যাসটির আবেগকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত ম্যাট বুঝতে পােও মানুষ নিখুঁত নয়; ভালোবাসাও নিখুঁত নয়। কিন্তু ক্ষমা এবং বোঝাপড়ার মধ্য দিয়েই সম্পর্কের সত্যিকারের অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়।

দ্য ডিসেন্ড্যান্টস কেবল একটি পারিবারিক গল্প নয়; এটি এক গভীর আত্মঅনুসন্ধানের কাহিনী। কাউই হার্ট হেমিংস আমাদের দেখানÑজীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোই কখনও কখনও আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষার উৎস হয়ে ওঠে।

হাওয়াইয়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের ভেতর দিয়ে এই উপন্যাস মানবমনের জটিলতা, সম্পর্কের ভঙ্গুরতা এবং ক্ষমার মহিমাকে অত্যন্ত সাবলীল মর্মস্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছে, যা পাঠককে দীর্ঘ সময় ধরে ভাবাবে।

লেখকের সংক্ষিপ্ত জীবনী

কাউই হার্ট হেমিংস (Kaui Hart Hemmings)  সমকালীন মার্কিন কথাসাহিত্যিক, যিনি হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের জীবন, মানুষ সম্পর্কের জটিলতাকে তাঁর লেখায় গভীর সংবেদনশীলতায় তুলে ধরেন। তিনি ১৯৭৫ সালে হাওয়াইয়ে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানকার সংস্কৃতি প্রকৃতি তাঁর সাহিত্যিক চেতনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।

হেমিংস মূলত ছোটগল্প উপন্যাস লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর গল্পগুলোতে পরিবার, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, এবং ব্যক্তিগত সংকটÑএসব বিষয় অত্যন্ত সূক্ষ¥ মানবিক দৃষ্টিতে উপস্থাপিত হয়। তাঁর লেখা বিভিন্ন স্বনামধন্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে এবং সমালোচকদের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়েছে।

জনপ্রিয় এই উপন্যাসটি পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়, যা বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে।

Related Posts