বিশ^কাপ ফুটবল ২০২৬ || নতুন রেকর্ডের পথে লিওনেল মেসি
ঢাকা থেকেঃ লিওনেল স্কালোনির বিশ্বকাপ দল ঘোষণার পর ফুটবল বিশ্বে আবারও নতুন উন্মাদনা শুরু হয়েছে। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মহাতারকা লিওনেল মেসি আবারও আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে বিশ্বমঞ্চে নামছেন। কাতার ২০২২ বিশ্বকাপের মহাকাব্যিক জয়ের পর, এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপে বিশ্বখেতাব ধরে রাখার মিশনে আলবিসেলেস্তেদের নেতৃত্ব দেবেন এই জাদুকর।
তবে এবারের বিশ্বকাপটি মেসির জন্য কেবলই শিরোপা রক্ষার লড়াই নয়, এটি তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে এক সম্পূর্ণ ধরাছোঁয়ার বাইরের উচ্চতায়। এই টুর্নামেন্টে মাঠে নামার সাথেই তিনি গড়তে যাচ্ছেন বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশিবার অংশগ্রহণের এক অবিশ্বাস্য ঐতিহাসিক রেকর্ড।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সাথে ইতিহাসের পাতায়
২০০৬ সালে জার্মানির মাটিতে এক তরুণ প্রতিশ্রুতিমান প্রতিভা হিসেবে মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল। এরপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২২ সালে কাতার জয়, সব মিলিয়ে ইতিমধ্যেই পাঁচটি বিশ্বকাপ খেলেছেন তিনি। ২০২৬ আসরটি হতে যাচ্ছে মেসির ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ।
ফুটবল ইতিহাসে এর আগে লোথার মাথেউস, আন্তোনিও কারবাহাল, রাফা মারকেস এবং আন্দ্রেস গুয়ারদাদোর ৫টি বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ড ছিল, যা গত বিশ্বকাপে মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো স্পর্শ করেছিলেন। এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে মাঠে নেমে মেসি এবং রোনালদো হতে যাচ্ছেন ইতিহাসের প্রথম দুই ফুটবলার, যাঁরা টানা দুই দশক ধরে বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ স্তরে নিজেদের টিকিয়ে রেখে ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ খেলার অনন্য কীর্তি স্থাপন করবেন।
বিদায়ী সংবর্ধনা নয়, মেসি আসছেন রাজার বেশে
অনেক কিংবদন্তি ফুটবলারই ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে কেবল একটি ‘বিদায়ী ম্যাচ’ বা রূপক উপস্থিতির জন্য বিশ্বকাপে আসেন। কিন্তু ৩৮ বছর বয়সী মেসির ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপটটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি কোনো আলংকারিক বিদায় নিতে আসছেন না; তিনি আসছেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দলের সেনাপতি ও মূল কাণ্ডারি হিসেবে। ফ্রান্সের বিপক্ষে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনাল জেতার পর, এবার বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টিনার শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার মূল অনির্বাণ শিখা তিনিই।
যে ঐতিহাসিক রেকর্ডগুলো আরও সমৃদ্ধ করবেন মেসি:
কাতার বিশ্বকাপেই মেসি অসংখ্য রেকর্ড নিজের নামে করেছিলেন, যা ২০২৬ সালের ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাইয়ের মধ্যে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন তিনি:
সবচেয়ে বেশি ম্যাচ ও মিনিট: কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে নিজের ২৬তম ম্যাচটি খেলে জার্মানির লোথার মাথেউসকে (২৫ ম্যাচ) টপকে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়েন মেসি। এছাড়া ২,৩১৪ মিনিট মাঠে থেকে পাওলো মালদিনির রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি সময় খেলার কীর্তিও তাঁর। আসন্ন টুর্নামেন্টে প্রতিটি ম্যাচ খেলার সাথে সাথে এই দুটি রেকর্ড আরও অনতিক্রম্য হয়ে উঠবে।
অধিনায়কত্বের রেকর্ড: বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচে অধিনায়কত্ব করার রেকর্ডটি ইতিমধ্যেই মেসির দখলে। বিভিন্ন প্রজন্ম ও কোচের অধীনে খেললেও, স্কালোনির এই অপরাজেয় দলের নেতা হিসেবে তাঁর অবস্থান এখন অনন্য উচ্চতায়।
গোলদাতার মাইলফলক: বিশ্বকাপে ১৩টি গোল করে মেসি ইতিমধ্যেই গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতাকে (১০ গোল) ছাড়িয়ে আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলদাতা। এবার তাঁর সামনে সুযোগ থাকবে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার করা সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ডটি স্পর্শ করার বা ছাড়িয়ে যাওয়ার।
লক্ষ্য ইতিহাস পুনরাবৃত্তি
বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজেদের শিরোপা ধরে রাখার কীর্তি রয়েছে কেবল দুটি দেশের—ইতালি (১৯৩৪ ও ১৯৩৮) এবং ব্রাজিল (১৯৫৮ ও ১৯৬২)। স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা এখন একটি সুসংগঠিত, শক্তিশালী এবং আবেগীয় বন্ধনে আবদ্ধ দল, যা কেবল ইন্টার মায়ামির এই মহাতারকার ওপর নির্ভরশীল নয়। তবে দলের প্রধান প্রেরণা হিসেবে মেসিই থাকবেন।
২০২৬ বিশ্বকাপই হয়তো বিশ্বমঞ্চে মেসির শেষ মহাকাব্যিক অধ্যায় হতে যাচ্ছে। কাতার বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে ফাইনাল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে গোল করে যে রূপকথা তিনি লিখেছিলেন, ৩৮ বছর বয়সে এসে উত্তর আমেরিকার মাটিতে সেই কিংবদন্তির বইয়ে আরও একটি সোনালী পাতা যোগ করতে পারবেন কি না, তা দেখার অপেক্ষায় পুরো বিশ্ব।
