ঈদ উপলক্ষে দুই পাতা কবিতা
স্মৃতির রক্তাভা
বদরুজ্জামান আলমগীর
অচেনা এক যাজক আসে আমার ঘাটে
নোঙর করে মাঠের ওপারে অন্য কারো বাড়ি।
এতোদিন এক স্থবির মঠ ছিল যা
হিলচিয়া বাজারের ঢালুর মোড়ে— রাঙা ঠোঁট
মরিচ গুল্মের পাড়ায়, আজ তা উড়ে এসে
আসন পাতে সরিষার হলুদ ঢেউয়ের পাড়ায়।
ঘুম ঘুম হাডসন জেগে রও ট্রেনের ভিতর
ধুম ধুম এস্রাজে তোলো সুর বুড়িগঙ্গার সতর
তোমার খয়েরি ধূলা কেমন রুয়ে দেয় দ্বিধার স্বনন
ডুবসাঁতারে ভাসে কুমার, কুমার এক অন্ধ হোমার।
কার নামে কাটা গাছ এতোটা নুয়ে নুয়ে পড়ে
কার নামে নদী কাতরায় এমন ব্যাকুল
মাছের চোখ কতো ঝুম ঝুম কাঁপে নির্ঘুম
আগস্ট মাসের তীব্র রোদ রূপালি সীসার দিন
কপালে স্মৃতির রক্তাভা খোঁটে পদ্মাগাঙের মীন।
—পেনসিলভেনিয়া
এ বার্ড বিয়োন্ড দ্যা বর্ডার
শামীম আজাদ
পৃথিবী যে আমার জন্য
গালে হাত দিয়ে অপেক্ষা করবে না
আমি জানলাম।
তাই জীবনের সালুনে নিজেই
আনকোরা এ্যাসপারাগাস আর
তরকারীতে নতুন ঝোল দিয়ে
আমার মেনু নবায়ণ করলাম।
কবিতা ও স্টোরি টেলিং এর সাথে
এবার শেক্সপীয়ার এ্যান্ড চিপ্যুক্ত হল।
কিন্তু সবাই বল্লেও পুরানো ডি এল রায় ডেজার্ট
রেখেই দিলাম, রয়ে গেল।
পাল্টানো মেনুতে দেখি মানুষের পাল
বুকিং ভাল হচ্ছে
এপ্রিল—মে এলে কদম ও বর্ষা ছাড়াই
আড্ডাও দারুন জমে যাচ্ছে।
ভোজ শেষে চমৎকার চায়ে চুমুক দিলেই
আর কেউ না গাইলেও আমি গেয়ে উঠি
‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।’
তখন আমার সংগে বাকিরাও গায়
আর আমার চোখ ভিজে
সুরমা কুশিয়ারার বাঁক বেয়ে
শামীম আজাদ’স কমপ্লিট ওয়ার্ক হয়ে যায়।
—লন্ডন
প্রতিবিম্বে প্রতিপক্ষ
হোসাইন কবির
হাঁটছি, অথচ পায়ের সঙ্গে পথের
দেখার সঙ্গে দৃশ্যেরÑকোনো আত্মীয়তা নেই
পথ আর দৃশ্যগুলো
অস্বচ্ছ কাচে আটকে থাকেÑ যেন মৃত প্রজাপতি
জানি
কেবল দেশের নয়Ñ
আমাদের সমূহ অঙ্গ—প্রতঙ্গ
শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সেই কবে
যেন পরিত্যক্ত ছিন্নভিন্ন এক দেহের নগরী
যেখানে রক্তের বদলে
শুধুই বয়ে যায় হিম—শীতলতা
আজকাল প্রিয় রঙ
আন্দোলনের সমূহ স্লোগান
নিথর পাখির ডানায়Ñনিশ্চুপ নিস্তেজ
চারিদিকে বিভাজনের প্রাচীরÑ
যাবো কোন্ দিক?
ডানে—বামে প্রতিধ্বনি
সামনে কুয়াশা
পেছনে শূন্যতা
নিজের দিকেও ফিরতে পারি না আর
আয়নায় তাকালে দেখিÑ আমিও এক শববাহক
নিজের কাঁধে নিজের লাশ
বয়ে নিচ্ছি দূরে কোথাওÑ একাই
প্রতিক্ষণে অনুভব করি
প্রতিবিম্বে দুলছে যে ছায়াÑ সে আমার নয়
সে এক নীরব সাক্ষীÑ আমারই প্রতিপক্ষ
আলোতে কিংবা আঁধারে
অনিবার্য এক পরিণয়ে
আমাদের যেতে হবে বহুদূর—পথে
পাথর—দেয়াল ভেঙে জলের প্রপাতে
—নিউইয়র্ক
আত্মজীবনী
রাকীব হাসান
তোমার গল্পের কাহিনী অবলম্বনে
আমি নির্মিত
দৃশ্যের আলোতে অন্ধকার আমি,
তোমাকে বিস্তৃত করে আত্মজীবনী লিখে যাই —
তুমি নিজেই মোটা অমর গ্রন্থ,
সহস্র পৃষ্ঠার অক্ষরে অক্ষরে
তোমার পায়ের ছাপ
আমি পড়তে থাকি মুখস্ত অভ্যাস।
মৃত্যুতে তোমাকে ভালোবসতে হয়,
তুমি যুদ্ধে লেখা দীর্ঘ কবিতা।
সীমান্ত পার হয়ে যাচ্ছি
গাইতে বাইতে বাউল নদী —
পার হয়ে গেছি মাটির সেতু।
সব বিশ্বাসে মিথ্যাবাদ বড় হয় —
আমার নিজের কোন পৃষ্ঠা নেই
দেশ প্রেমের কোন দেশ থাকে না।
—মন্ট্রিয়েল
অনুমতি
লায়লা ফারজানা
আমি চাই তুমি প্রেমে পড়ো—
বৃষ্টিতে হাত মেলে দাঁড়িয়ে থাকা
নাটকীয় কোনো প্রেম নয়।
নিঃশব্দে পুড়িয়ে দেওয়া
সকালের গরম কফির মতো—
বেতনহীন স্বেচ্ছাসেবীর
এলোমেলো ফাইলের
মতো, ভুলে থাকা কোনো গান—
যেমন হঠাৎ মনে পড়ে যায়।
আমি চাই কেউ তোমার নাম
উচ্চারণ করুক,
যেন নামটা সত্যিই তোমার।
যেন পায়ের কাছে ফুলটিকে
ফুটে ওঠার জন্য ক্ষমা
চাইতে না হয়।
সৌন্দর্যের কি অনুমতির
প্রয়োজন হয়?
—নিউইয়র্ক
দূরত্বের ভাঁজ
ফারহানা হক
দূরত্ব শব্দটা এখন এক গাঢ় অনুভব
স্ক্রিনের নীল আলোয় ভেসে থাকা এক মুখ
কখনো দীর্ঘশ্বাস
কখনো ছলোছলো চোখ।
তোমার জানালার আকাশ আর আমার জানালার আকাশ
একসাথে মেলেনা
আমি সন্ধ্যার চায়ে ডুবাই সকাল বেলার কথা
ঘড়ির কাঁটা আলাদা অপেক্ষার সময় এক।
তবু আমরা জানি
এই একই পৃথিবী, একই দ্রাঘিমা গোলার্ধে এসে মিশবে
একই বিকেলের আলো দেবে
আমরা এখন দুই শহরের মানুষ
দুই সময়ের ঘুম,
দুই রকমের ব্যস্ততা
তবু একটাই আগামীকাল।
একদিন সহসাই দূরত্ব ভেঙে যাবে খুব সাধারনভাবে ....
যেদিন ফিরবে
এ শহরটা আবার
ঠিকানার মত শোনাবে
আর আমি বলব, “এতদিন যে দূরত্ব ছিল তা শুধু সময়ের ভাঁজ।
দূরে ছিলেনা শুধু ছিলে অন্য আকাশ।”
—নিউজার্সি
এক দেহে দুই মেরু
জেবুন্নেছা জোৎস্না
কিছু জন্মে পায় সে, কিছুটা পেয়েছে শোধে
জানি বসন্ত তাকে বিমুখ করেছে অনাদরে
আলো অস্বচ্ছতায় নিঃশ্বাসের স্পর্শে
সুগন্ধি নেকটার নিষিদ্ধ গন্দমে মরে —
বুকে তার দেবতার অলিম্পাস প্রাসাদ
ইরোসের অদৃশ্য ছোঁয়া খোলে প্রাচীন দরাজ
তার নরম ঠোঁটের অমরাবতীর আদি কোষে
ফণি— মণসার হেম ভালোবাসতে তাই নারাজ
তার সাথে দেখা রোজ মননের প্রকোষ্ঠে
সুন্দর মুখে ঢেউ আফ্রোদিতির আয়নায়
মুহূর্তে দীপ্ত সে, পরক্ষণে বিলীন
চাঁদের নেশায় মেঘ, আমি বধ অ্যামব্রোসিয়ায়
এক দেহে দুই মেরু তীব্র বিকর্ষণে
দূরে যাওয়ার পরে যা থাকে, সেটাই ভালোবাসা
হৃদয় গ্রন্থি কূপে শ্বাশত যে ফুল ফোটে
আত্মার উত্তাপে — সে আমার প্রেম, সর্বনাশা
—নিউইয়র্ক
রুমাল
মনিজা রহমান
রুমালের ভাঁজে লুকিয়ে রেখেছি তোমার ছোঁয়া
হেমন্তে আসে বৃষ্টি বাতাসে কুয়াশার ধোঁয়া
আমার হৃদয় সরোবরে ভাসে কোজাগরী ভোর
রঙিন সুতায় তোমার নামের অদ্যাক্ষর
একটি বর্ণে দুই চোখ জুড়ে দৃষ্টি—পরশ
কাহারবা রাগে রুমালে মুছেছি উষ্ণ কাজল
রুমাল দেখেছে আমরা ভেসেছি মেঘের গায়ে
ঘাসের শরীরে জমানো শিশির কুড়িয়ে নিয়ে
উড়িয়ে দিয়েছি রোদের ঘড়িতে সময়ের ঋণ
রুমাল সাক্ষী ঠোঁট মোছা চুমু চিরায়ত স্বাদ
রুমাল সাক্ষী কে কত কেঁদেছে— নীল সুখ নিয়ে
কে চলে গেছে জ্যোৎস্না নদীতে চাঁদের ভেলায়
রুমালের ভাঁজে সব জমা আছে সপ্তকাহন
যোগ বিয়োগের হিসাব নিকাশ মিলবে না জানি
তবু উড়বেই ধূসর রুমালে স্মৃতির পতাকা
রুমাল সাক্ষী তুমি আমি আছি, হয়ত থাকব
মেঘের এপারে মেঘের ওপারে অচিন্ত্য—কাল।
—নিউইয়র্ক
আনন্দ কুসুম
মুজিব ইরম
টগর ফুটেছে বনে নিরিবিলি
নিঃসঙ্গ নিঝুম
আমি তারে
দূর থেকে
রাতদিন দেখি..
সেও বড়ো ফুটে থাকে
সাদা সাদা
শুভ্র বেশ
বিলুপ্ত ভেষজ..
দুলিচাঁপা ফুটে থাকে দূরে
দেমাগি পাতারা তারে ঘিরে রাখে
বিদেশী বিদেশী লাগে
আমি তারে দূরে থেকে দেখি..
জ্যাকারান্ডা ফুটেছে খুব
উদ্ধত কুসুম
নীল নীল
রং দেখি
রূপ দেখি
দূরে দূরে থাকি..
দূর বনে ফুটে ফুল কেড়ে নেয় ঘুম
আমি তারে নাম দিই আনন্দ কুসুম।
—লন্ডন
অসীম বৃত্তের নকশা
কাজল রশীদ
শূন্যের ক্যানভাসে আঁকা হয় অদৃশ্য রেণু,
প্রতিটি বিন্দুর মাঝে লুকিয়ে আছে একটি মহাবিশ্ব।
আকাশের জ্যামিতিতে যেখানে মেঘের কাটাকুটি,
সেখানে সূর্য বুনে দেয় এক সুনিপুণ সোনালী জাল।
আমি এক বৃত্তাকার পথ ধরে ঘুরি,
যার কোনো শুরু নেই, কোনো শেষ নেই—
শুধু আছে অজানার এক অমোঘ আকর্ষণ।
রেখায় রেখায় আঁকা হয় জীবনের ছবি,
যেখানে আলো হয়ে হাসে এক সত্যের রবি।
—লন্ডন
