দেশ বিক্রির দাসখত
২০২৪ সালে যারা পরিচয় গোপন করে ছদ্মবেশে, মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করে অভ্যুত্থানের নামে ক্ষমতা দখল করেছে, তারা এতটই নির্বোধ যে বুঝতেও পারেনি মিথ্যা বা শঠতা সবসময় ক্ষণস্থায়ী। আজ হোক কাল হোক সত্য প্রকাশিত হবেই। তাদের অদূরদর্শিতার আর একটি উদাহরণ একাত্তরকে অসম্মান করা, বঙ্গবন্ধুকে অসম্মান ও অস্বীকার করা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা। তারা যে সংবিধান ছুঁয়ে শপথ গ্রহণ করল, দুদিন পরে সেই সংবিধানকেই ছুঁড়ে ফেলতে চেয়েছে। পরে সেই সংবিধান সংস্কার করার দায়িত্ব যাকে দেয়া হয়েছে, তিনি কোনো সংবিধান বিশেষজ্ঞ নন, এমনকি আইন বিশেষজ্ঞও নন। এই সব কিছুর নেতৃত্ব যিনি দিয়েছেন তিনি একজন নোবেল জয়ী এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেসের সর্বোচ্চ সম্মাননা পাওয়া ব্যক্তি। তিনি ক্ষমতার শীর্ষে গিয়ে চরম স্বার্থপরতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে প্রথমে নিজের মামলা ডিসমিস করেছেন, তারপর নিজের কোম্পানির প্রদেয় কর মওকুফ করেছেন, অতঃপর আগামী ৫ বছরের জন্যও তা মওকুফ করিয়ে নিয়েছেন। একটু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখুন তো স্বাধীনতা উত্তরকালে বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে কোনো রাজনৈতিক বা মিলিটারি সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান এই রকম চরম স্বার্থপর ছিলেন কিনা?
তবে সব অপরাধের চূড়ান্ত অপরাধ হলো দেশকে তড়িঘড়ি করে বিক্রি করে দেয়ার জন্য একটি বৃহৎ শক্তির সাথে দেশ বিরোধী চুক্তি করা।
১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শেষে বিজয় অর্জনের পর থেকেই পরাজিত শক্তি নানা ছলে—বলে—কৌশলে বলার চেষ্টা করেছে, বাংলাদেশ ভারতের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। দেশের জনগণের একাংশ এই অপপ্রচারে বিশ্বাস করেছে। তারা বঙ্গবন্ধুকে ভারতের দোসর হিসাবে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু তারা দেখেও না দেখার ভান করেছে যে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশের মাটিতে পা দেয়ার আগেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু প্রতিশ্রম্নতি নিয়ে এসেছিলেন যে দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবসের আগেই ভারত সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে। বাস্তবে তাই হয়েছে। মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে বঙ্গবন্ধু ভারতকে ততটুকু সমীহ করেছেন যতটুকু করা প্রয়োজন এত বড় প্রতিবেশি রাষ্ট্র হিসাবে। তিনি ভারতের কথায় ওঠা—বসা করেননি। বরং এই সময়ের মধ্যেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ঢাকায় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দিয়েছেন, এই সময়ের মধ্যেই লাহোরে গেছেন ইসলামিক সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতের ওপর দিয়ে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন জাতীয়তাবাদী নেতা। নিজের দেশ তার কাছে সব কিছুর উর্ধে। এই দেশকে স্বাধীনতা এনে দেয়ার জন্য তারুণ্য থেকে লড়াই করছেন। কখনো আপোষ করেননি। পিছিয়ে যাননি। জেলজুলুমের ভয় করেননি। কিন্তু একাত্তরের পরাজিত শত্রুরা সবসময় অপপ্রচার চালিয়েছে এই বলে যে, বাংলাদেশকে বিক্রি করে দেয়ার লক্ষ্যে ভারতের সাথে ২৫ বছরের চুক্তি করেছেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর এবং আওয়ামী লীগ বা বাকশালের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়ার পর সেই চুক্তিতে কোথাও দেশবিক্রির শর্ত পাওয়া যায়নি। তারপরও আওয়ামী লীগ নির্বাচনে যাওয়ার আগে তাদের পরাজিত করার জন্য এবং ক্ষমতায় যাওয়ার পর এই অপপ্রচার অব্যাহত রয়েছে। যেমন আওয়ামী লীগ ২০১৮ ও ২০২৪ সালের দুটি চরম দুনীর্তিদুষ্ট নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকাকালে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে ২৬ লক্ষ ভারতীয় নাগরিক নাকি বাংলাদেশে চাকরী করছে, অভিযোগ করা হয়েছে পুলিশ এবং সেনাবাহিনীতে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় নিয়োগ পেয়েছে। অতএব দেশ ইতিমধ্যেই বিক্রি হয়ে গেছে গোপনে গোপনে।
যদি এসব অভিযোগ সত্য হতো, এর মত বড় অপরাধ আর কিছুই হতো না। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, গ্রামের স্বল্প শিক্ষিত থেকে বড় বড় নগরীর তথাকথিত শিক্ষিত বাঙালিরাও এইসব ন্যারেটিভে বিশ্বাস করেছে। ২০২৪ সালে রাতারাতি কোনো ফাইলপত্র সরিয়ে ফেলার সুযোগ না দিয়ে শেখ হাসিনাসহ তার সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা হলো, তারপর থেকে সচেতন জনগণ উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছিল উপরুক্ত অভিযোগগুলোর প্রমাণ দেখার জন্য। না, এর কিছুই আজ পর্যন্ত প্রমাণ হয়নি।
স্মরণ করা যেতে পারে, ভারতবিরোধী ট্রাম্পকার্ড নিয়ে রাজনীতি শুরু করে বৃটিশরা। ১৮৫৭ সালে তারা শুধু ডিভাইড এন্ড রুল দিয়ে হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে বিভেদের দেয়াল উঁচু করেছে তাই নয়, তারা এই দুই ধর্মের মানুষদের পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় শাসকরাও ২৩ বছর এই কার্ডই খেলেছে পূর্ব পাকিস্তানে। আর স্বাধীন বাংলাদেশে সামাজিক—রাজনৈতিক—অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে এই ভারতবিরোধী অপপ্রচারই চালু রাখার ষড়যন্ত্র চলেছে। যার জন্য মিলিটারি জান্তারা ক্ষমতা জবরদখল করেই নিজে ধর্ম পালন না করলেও ইসলামকে সামনে এনেছে যাতে ভারত বিরোধিতাকে প্রমাণ করা যায়। তারপর সেই আওয়ামী লীগকে ভারতের দোসর বানিয়ে তাদের ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। সেই জন্যই ১৯৭১কে অস্বীকার করার, মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান অস্বীকার করার, জাতীয় সংগীতকে অস্বীকার করার আলামত স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। জনগণ এসব কথায় বিশ্বাস করেছে বলেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আপামর মানুষ রাস্তায় নেমে এসে সরকারের পতন ঘটিয়েছিল।
আজ একটি নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনে সেন্টার—রাইট দল বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসাবে নতুন শক্তি নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে একাত্তরে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি তারা। আর ২০২৪ সালের পানি ঘোলা করে মাছ শিকারিরা আজ ক্ষমতার বাইরে। এতদিন যারা দেশ বিক্রির প্রমাণহীন অভিযোগ করে এসেছে, তারা ক্ষমতা দখল করে দেড় বছরের কম সময়ে কলমের খোঁচায় দেশটাকে বিক্রি করে দিল। দেশ বিক্রির এই চুক্তি আর গোপন কোনো নথি নয়। সকলেই জেনে গেছে ইতোমধ্যে। ফলে সে সময় যারা দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তারাই এখন কাচুমাচু করে বলছেন, এসব করেছে প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি কিচেন ক্যাবিনেট। তারা নাকি এই চুক্তির কিছুই জানতেন না। দোষটি এতই গুরুতর যে এদের অনেকেই নিজেদের চামড়া বাঁচাতে ‘আমি কিছুই জানতাম না’ বলে পার পাওয়ার চেষ্টা করছে।
সোশাল মিডিয়াতে বিষয়গুলো এখন প্রকাশ্যে আসছে। টক শোতে আসছে। সংবাদমাধ্যমে আসছে। কিন্তু তৎকালীন উপদেষ্টাদের অনেকেই বলছেন তারা জানতেন না এর কিছুই। এমন কি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা পর্যন্ত একই কথা বলছেন। আর বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার এ ব্যাপারে টু শব্দটি করছে না। চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা করছে না। আলোচনা করার জন্য প্রস্তাব উঠছে না।
হায়, ৫৩ বছর ধরে দেশ বিক্রির ভয় দেখিয়ে, নিজেরাই নিজ হাতে দাসত্বের শিকল পরিয়ে দিল বাংলাদেশের পায়ে। বাঙালিরা যে আত্মঘাতি নয় তা প্রমাণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু, বাঙালিরা যে স্বাধীনতাপ্রিয় তাও প্রমাণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু এই মহান নেতাকে যে হত্যা করা হয়েছিল দেশ বিক্রির সুদূরপ্রসারি লক্ষ্য সামনে রেখে, আজ তাই প্রমাণিত হলো।
