পাক ঘরের প্যাঁচাল এবং কতিপয় ক্যাঁচাল || আনিস আহমেদ
সম্প্রতি বাংলাদেশের সদ্য প্রাক্তন অন্তর্বর্তী সরকারের বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা সম্ভবত নিজেদের দায়মুক্ত করার অভিপ্রায়ে জানিয়েছেন যে অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক সিদ্ধান্তে তাঁদের কোন ভূমিকা ছিল না, সকল সিদ্ধান্ত নেয়া হতো ‘কিচেন ক্যাবিনেটে’। রান্না ঘর, রসুই ঘর কিংবা পাক ঘর যাই বলুন না কেন, প্রকৃত পক্ষে উপদেষ্টা পরিষদের কিছু বাছাই করা সদস্য এই কিচেন ক্যাবিনেটে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন বলে অনুমান করা যায়। সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বিগত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন সাত সদস্যের একটি কিচেন কেবিনেট। যারা সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার নিয়মিত বৈঠক করতেন।’ তৌহিদ হোসেন বাংলাদেশের যমুনা চ্যানেলকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অন্য একাধিক উপদেষ্টার প্রভাব ছিল।’ তার ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির বিষয়েও তার মন্ত্রণালয় কিছুই জানতো না। ওই চুক্তির নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন বাণিজ্য ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা। এসব নানা অনিয়মের কথা জানিয়ে অন্তর্বর্তী উপদেষ্টা পরিষদ থেকে তিনবার পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন বলেও জানিয়েছেন তৌহিদ হোসেন। এদিকে আরেক সাবেক উপদেষ্টা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারে ‘কিচেন কেবিনেট’ ছিল তবে তিনি এই ‘কিচেন কেবিনেটের’ সদস্য ছিলেন না। ’কিচেন ক্যাবিনেট’ আসলে কোন আনুষ্ঠানিক মন্ত্রী সভা নয় কিন্তু প্রধানমন্ত্রী (এক্ষেত্রে) প্রধান উপদেষ্টা তাঁর আজ্ঞাবহ কিছু লোককে নিয়ে যখন গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে আলোচনা করতেন কিংবা সিদ্ধান্ত নিতেন, তখনই সেটি ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়। বাংলাদেশে বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে কারণ ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ কথাটি ব্যবহার না করেও বেশ কিছু উপদেষ্টা বলেছেন যে ইউনুস যে সব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তার অনেকগুলোই তাঁরা জানতেন না কিংবা সেগুলোতে আদৌ কোন সহমত পোষণ করেননি।
প্রশ্ন উঠছে এ নিয়েও যে এই ‘পাক ঘরের’ কথা জেনেও, উপদেষ্টারা কেন এর প্রতিবাদ করেননি কিংবা পদত্যাগ করেননি! উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন যদিও তিন বার পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন বলে ওই সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন কিন্তু কেন শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগ করেননি সেই কথাটি কিন্তু জানাননি। ড. ইউনুসের পাকঘরে যে সব উপদেষ্টা প্রবেশ করেননি তাঁদের কেউ পদত্যাগ করেছিলেন বলে আমরা জানিনা। এমনকি ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন, যাঁকে প্রথমে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা করা হলেও অত্যন্ত অল্প দিনের ব্যবধানে তাঁকে সেই পদ থেকে সরিয়ে অন্য মন্ত্রকে দেয়া হয় তিনিও পদত্যাগ করেননি। ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে গোড়াতেই যে সব পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিলেন সেই বিষয়গুলো সম্ভবত ইউনুস সরকার এবং শিক্ষার্থী নেতাদের স্বার্থের অনুকুলে ছিল না বলেই তাঁকে সেখান থেকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকে স্থানান্তরিত করা হয়। সেই সময়ে সাখাওয়াত হোসেনও পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন বলে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন। কিন্তু ইউনুস সাহেব তাঁকে উপদেষ্টা পদ ত্যাগ করতে দেননি কারণ ইউনুসের মনে এই আশংকা ছিল যে সদ্যগঠিত উপদেষ্টা পর্ষদ থেকে সাখাওয়াত সাহেব যদি পদত্যাগ করেন, তাহলে ড. ইউনুসের ভাবমূর্তি নিয়ে হয়ত প্রশ্ন উঠতে পারে। শেষ পর্যন্ত ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াতও থেকে গেলেন ইউনুসের উপদেষ্টা পর্ষদে। থাকলেন, অন্যরাও যাঁদের মধ্যে অনেকেই এখন বলছেন যে তাঁরা ইউনুস সাহেবের অনেকগুলো পদক্ষেপের সঙ্গে একমত নন।
ড. ইউনুসের পাক—ঘরের পাক—প্রীতির সেই সব উপদেষ্টার কথা না হয় বাদই দিলাম কিন্তু যারা সেই পাক ঘরের ক্যাবিনেট অর্থাৎ কিচেন ক্যাবিনেটের বাইরে ছিলেন তাঁরাও কি ক্ষমতায় থাকার জন্যই প্রতিবাদ করেননি সেই বিষয়ে যে বিষয়গুলোতে তাঁরা সহমত হননি? বঙ্গবন্ধুর বাড়ি যখন চূড়ান্তভাবে বুলডোজার এনে ভেঙে গুড়িয়ে দেয়া হলো তখন কেন উপদেষ্টাদের কেউই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বেরিয়ে এলেন না? নাকি তাঁরাও ছিলেন সেই কিচেন ক্যাবিনেটেরই অংশ যাঁরা রান্না ঘরের সেই ক্যাবিনেট অর্থাৎ কাঠের আসবাবের মতই নীরব ছিলেন গোড়া থেকেই? শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচারী শাসক বলে যাঁরা তিরস্কার করেছেন বার বার, তাঁরা কি অন্য এক স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হননি! এই প্রশ্নগুলো উঠছে বার বার, উঠবে আবারও। যাঁরা ড. ইউনুসের এই কিচেন ক্যাবিনেটের কথা বলেছেন, এমনও বলেছেন যে এই পর্ষদ প্রতি মঙ্গলবার ইউনুস সাহেবের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হতো, তাঁরাও এখন পর্যন্ত এটাও জানাননি যে সেই একান্ত পর্ষদের সদস্য কারা ছিলেন, তাঁদের মতবাদ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো যে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সৎ সাহস দেখাতে পারেননি অবশিষ্ট উপদেষ্টারা।
আমি কেন এই কিচেন ক্যাবিনেটকে পাক ঘর বলছি সে কেবল এ কারণে নয় যে রান্নাঘরকে তো পাক ঘরই বলেন অনেকে। বরঞ্চ এই কারণেই যে এই মূল পর্ষদে যাদের সঙ্গে নিয়ে বৈঠক করতেন তাঁরা সম্ভবত পাকিস্তানের প্রতি অনুগত ব্যক্তি। ড.ইউনুসের সরকার ভারত বিরোধিতায় যতটা উচ্চ কন্ঠ ছিল, ততটাই পাকিস্তানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আর এর পেছনে যে দর্শন কাজ করে তাহলো মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতা। ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভাঙার পর পাকিস্তান যে উচ্ছ্বসিত আনন্দ প্রকাশ করেছে তাতেই প্রমাণিত হলো যে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরাই দেশের শাসন ব্যবস্থায় চলে এসেছিল। এখনও পাকিস্তান প্রীতির খুব যে একটা ইতি ঘটেছে তা কিন্তু নয়। অতি সম্প্রতি বিএনপি সরকারের শিক্ষা মন্ত্রী পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বিএনপি’র অপর এক মন্ত্রী কিছু না দেখেই পাকিস্তানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থারও প্রশংসা করেছেন। এরকম পাক প্রীতিতে আচ্ছন্ন ড. ইউনুসের যে কিচেন ক্যাবিনেট ছিল তাকেই আমি পাক ঘর বলেছি। সেখানেই ষড়যন্ত্র হতো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে, উপদেষ্টাদের উপদেশ দেওয়া হতো মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের সমর্থন দেওয়ার জন্য। পাকিস্তানের পক্ষে এই প্যাঁচালগুলোকে বৈধতা দেয়ার জন্যই ওই পাকঘরের বৈঠক হতো বলে অনুমান করি। কিচেন ক্যাবিনেটের একটি বৈঠকে যোগ দেয়ার কথা স্বীকার করেছেন তদানীন্তন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন কিন্ত বিষয়টা জানান নাই।
তবে এ নিয়ে যতই প্যাঁচাল কিংবা ক্যাঁচাল হোক না কেন, বর্তমান বিএনপি সরকারও যদি এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে না পারে, তাহলে সেটা হবে গোটা জাতির জন্য লজ্জাজনক বিষয়।
