কারিনা কায়সার ও দিক নির্দেশনার বিভ্রান্তি || মনজুর কাদের
দাবায় বিশ্বজোড়া সম্মান অর্জন করে যে নারী বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন তিনি রানী হামিদ। তাঁর ছেলে খ্যাতনামা ফুটবলার কায়সার হামিদ। তার মেয়ে কারিনা কায়সার। তিনি সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন। তাকে নিয়ে বিশ্বের যেখানে যত বাঙালি আছে সবাই সোশাল মিডিয়ায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। এরা দুই ভাগে বিভক্ত। কেউ দিচ্ছে দোয়া, আবার কেউ দিচ্ছে দুয়ো।
মেয়েটি তার নামের সাথে দাদা—দাদীর নাম ধারণ করেনি। করেছে বাবার নাম। ফলে তিনি যে জগদ্বিখ্যাত দাবাড়ু রানী হামিদের নাতনীÑ সেকথা কেউ কেউ জানে, সবাই জানে না। দাদীর নামটি জানা থাকলে হয়তো কৃতজ্ঞতাবশত হলেও দুয়োর মাত্রা কম হতে পারতো। বাংলাদেশের মানুষের এই কৃতজ্ঞতা বোধটুকু কখনো কখনো উদয় হতে দেখা গেছে।
অতীতে একটি সরকারের আমলে ‘খাম্বা’ একটি আলোচিত প্রতিপাদ্য ছিলো। কিন্তু জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আত্মীয় হওয়ার কারণেই হয়তো খাম্বা কেলেংকারির অন্যতম নায়কের নাম প্রেসে আসেনি। বাবুল কাজী সম্প্রতি অগ্নিদগ্ধ হয়ে অকাল প্রয়াত হলেও তার কপালে তেমন দুয়ো জোটেনি। কাজী পরিবারকে তারা সসম্মানেই রেখেছে।
কিন্তু কারিনার পরিবার ছাড় পায়নি। সোশ্যাল মিডিয়ার মুক্ত আকাশে কারিনা ও তার পরিবারের প্রতি এতো কালিমার মেঘ ছড়ানো হয়েছে যে, কারিনার মা অর্থাৎ রানী হামিদের বউমাকে প্রেসের সামনে এসে অনেকগুলো কাকুতি মিনতি করতে হয়েছেঃ
এক. বঙ্গভবনে আমরা লুটপাট করিনি
দুই. আমরা, প্রকাশ্যে বঙ্গভবন থেকে লুট করা যে সব মালামাল দেখিয়েছি সেসব আসলে বঙ্গভবন থেকে লুট করা না
তিন. সবাই এটা সেটা লুটের মাল দেখিয়ে আনন্দ করছিলো, আমরাও একটু ফান করেছিলাম।
চার. আমার হাজবেন্ড বলেছিলো, তোমরা বঙ্গভবন থেকে সবার মতো এটা সেটা নিয়ে আসলে তো আমরা সেগুলো দেখাতে পারতাম।
পাঁচ. আমরা জুলাই যোদ্ধা না। জুলাই যোদ্ধা যে ঘৃণিত সেটা আপনারা সবাই জানেন এবং আপনারা সবাই তো সেসব প্রতিরোধ করেছেন
ছয়. আমার মেয়ের জানাজায় দয়া করা সাংবাদিকরা যোগ দেবেন না
সাত. ইত্যাদি।
কারিনা তো এযুগের মেয়ে এবং ইউটিউবের কল্যাণে জনপ্রিয় ছিলেন। তাছাড়া এরকম তরুণ, টগবগে, মেধাবী, প্রাণচঞ্চল হাসিখুশি একটা মেয়ের প্রাণ অকালে প্রায় বিনা চিকিৎসায় ঝরে যাওয়ায় দেশব্যাপী যে দীর্ঘশ্বাস ও মাতম হওয়ার কথা ছিলো ততোটা না হয়ে বরং উল্টোটা কেন হলো? এই প্রশ্নের উত্তর তার মায়ের আকুতিগুলো বিশ্লেষণ করলেই পাওয়া যাবে।
বঙ্গভবনে যারা লুটপাট করেছে তারা একটি বিশেষ শ্রেণির। তারা বাগে পেলেই আগে খাবে এটা জানা কথা। কিন্তু যাদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পড়াশোনা আছে, যাদের নানী—দাদীরা দেশবরেণ্য তারকা তারা যখন এসব নোংরা অপকর্মে হাত লাগায় তখন জাতির হতাশার সীমা পরিসীমা থাকে না। তরুণ সমাজ যখন পথ হারায় তখন আলোর পথযাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা হাত ধরে তাদের আবার পথে চিনিয়ে দেবেÑ এটাই জাতি প্রত্যাশা করবে। তা না করে কারিনার মতো সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছেলেমেয়েরা এমনকি তাদের বাবা মায়েরা সহ নিজেরাই লুটপাটে হাত লাগিয়ে জাতিকে হতবাক করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সমগ্র জাতি যাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আলোক মাখা ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর, তারা কোথা থেকে রাজ্যের নিকৃষ্টতম অশ্লীল শব্দ ও গালাগাল নিজেদের মুখে তুলে নিয়ে মানুষের মন ভেঙে দিয়েছে। এরা এসব আচরণ ও গালাগাল যে নিজেদের মধ্যে চালাচালি করেছে তাই নয়, লাইভ ভিডিও, ব্লগ, ফোটোকার্ড এমনকি টেলিভিশন লাইভেও অবলীলায় বর্ষণ করে চলেছে। এই কাজগুলো যে শুধু ছেলেরাই করেছে তা কিন্তু নয়। বরং মেয়েরাও এক কাঠি সরেস হয়ে লুটপাট, এর ওর গায়ে হাত তোলা, অশ্লীল গালাগাল ও আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার মতো যাবতীয় অপকর্ম করে আশার শেষ আলোকবর্তিকাটুকুতেও জল ঢেলে দিয়েছে।
বাবারা তাদের মেয়েদের হাত ধরে, মায়েরা তাদের ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, ছাত্ররা ছাত্রীরা একজোট হয়ে এই যে লুটপাট, অশ্লীল শব্দচয়ন ও অযাচিত যথেচ্ছাচার জাতিকে দেখিয়ে দিলো তাতে আমাদের কোমলমতি ছাত্রছাত্রী ও তরুণ প্রজন্মের প্রতি আপত্যস্নেহে নিঃসন্দেহে আঁচড় পড়েছে। তারই ফলশ্রুতিতে কারিনাদের অকাল মত্যুতে কপোল বেয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরার পরিবর্তে কারো কারো হৃদয় থেকে দুয়োর উত্তপ্ত প্রশ্বাস বেরিয়েছে।
একটি শিশুর জন্মের পর থেকেই বাবা মায়ের সতর্ক দৃষ্টি থাকে যেন শিশুটি কোনো খারাপ শব্দ মুখে না তোলে বা খারাপ কাজে মনোনিবেশ না করে। তারপর দীর্ঘ পারিবারিক শিক্ষা, অনুশীলন, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা হিরকের টুকরা কুড়াতে কুড়াতে শিশুটি একদিন সোনার মানুষ হবেÑ এ প্রত্যাশাই করে বাবা—মা, পাড়া—পড়শি ও পুরো জাতি।
জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় বিদ্যা ও সভ্যতা শিখে মুলত সে ‘গড়ার’ জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠে।
কিন্তু যদি বিপরীতটি ঘটে। তাহলেই মহা প্রলয়। এই প্রলয়টি কিন্তু ঘটে গেছে।
জীবনের এতো সময়, এতো অর্থ, এতো পরাকাষ্ঠায় একজন তরুণের ‘গড়ার’ যে আত্মমহিমা ও গৌরবের সোপান নির্মিত হয়, সেখানে বিনা শ্রমে, বিনা সময়ে, বিনা পরাকাষ্ঠায় যখন সে ভাঙার মহা বিকৃত সুখ পেয়ে যায় এবং সেই সাথে বিপুল অবৈধ অর্থ হস্তগত হয় তখন এই বিপথগামী তরুণ জনগোষ্ঠীকে থামাবে কে?
এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে সঠিক পথ দেখানোর দিকনির্দেশনা দিতে কে এগিয়ে আসবে?
