জনরোষ এবং ফাঁসিতে ঝোলানো || আমীন আল রশীদ
উৎসব মণ্ডলের নামটি আপনি হয়তো ভুলে গেছেন। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের ঠিক এক মাসের মাথায় খুলনায় কথিত ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে জনরোষের মুখে পুলিশ আটক করেছিল এই হিন্দু তরুণকে। কিন্তু উত্তেজিত জনতা চাইছিল বিচার তারাই করবে। যে কারণে তারা নগরীর সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকায় উপ—পুলিশ কমিশনারের (সাউথ) কার্যালয় ঘেরাও করে এবং পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে তাকে গণপিটুনি দেয়। মুমূর্ষু ওই তরুণকে হেফাজতে নেয় সেনাবাহিনী। প্রথমে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, উৎসব মণ্ডল নিহত হয়েছেন; কিন্তু সেনাবাহিনীর তরফে জানানো হয় তিনি বেঁচে আছেন। যদিও এরপরে ওই তরুণ বা তার পরিবার কোথায় আছে, ওই বিষয়ে কোনো ফলোআপ খবর সংবাদমাধ্যমে আসেনি।
আসা যাক সাম্প্রতিক ঘটনায়। চট্টগ্রাম নগরীতে শিশু ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর আটক সন্দেহভাজনকে নিজেদের জিম্মায় নেওয়ার চেষ্টায় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর সঙ্গে দফায় দফায় পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। একপর্যায়ে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেয় উত্তেজিত জনতা। গত ২১ মে সন্ধ্যার পর থেকে থেমে থেমে চলা এই সংঘর্ষের কারণে শাহ আমানত সেতু থেকে বহদ্দারহাট সড়কে দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ থাকে।
বন্দরনগরী চট্টগ্রামে যেদিন এই ঘটনা ঘটল, সেদিন দিনভর আরেকটি ধর্ষণের ঘটনায় উত্তাল রাজধানী। মিরপুরে রামিসা নামে এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তের দ্রুত এবং প্রকাশ্যে বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা। এদিন দুপুরেই আইন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দ্রুত এই মামলার চার্জশিট তথা বিচার প্রক্রিয়া শুরুর আশ্বাস দেন। লোমহর্ষক ও মর্মান্তিক এই ঘটনায় তোলপাড় সোশ্যাল মিডিয়া। অনেকেরই অভিযোগের আঙুল সরকার, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে। এদিন বিকেলে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে জাতীয় নাগরিক পার্টি—এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী হুঁশিয়ার করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি জনগণ ও সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারেন, তাহলে জনগণই তাকে টেনে নামাবে।
রামিসা হত্যা নিয়ে দিনভর নানা ঘটনার মধ্যেই সন্ধ্যায় খবর আসে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যাচ্ছেন রামিসার বাসায়, তার বাবা—মায়ের সঙ্গে কথা বলতে। রাতে তিনি রামিসার বাসায় যান এবং তাদের অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেন।
যার সন্তান নিহত হয়েছে, বীভৎসতার শিকার হয়েছে, তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা পৃথিবীর কোনো গ্রন্থে, কোনো আইন বা কোনো সংবিধানে লিখিত নেই। অপরাধীর দ্রুত এবং সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হলেও যিনি সন্তান হারিয়েছেন, তিনি তার বুকের ধন ফিরে পাবেন না। কিন্তু তারপরও রাষ্ট্রকে অপরাধীর বিচার করতে হয়, যাতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় এবং যাতে নির্মমতার শিকার পরিবার কিছুটা হলেও শান্তি পায়। কিন্তু ওই দ্রুত বিচার করতে গিয়ে অবিচার হলো কি না, রাষ্ট্রকে সেটিও নিশ্চিত করতে হয়।
খুলনায় উৎসব মণ্ডল কিংবা এর আগে—পরেও অসংখ্য লোক উত্তেজিত জনতার রোষানলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের প্রচলিত আইনে বিচার হতে পারত। যারা এভাবে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন, তারা সকলেই যে প্রকৃত অপরাধী, তা প্রমাণেরও কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। হতে পারে, এভাবে নিহত অনেকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগই সঠিক ছিল না বা তথ্যগুলো বিভ্রান্তিকর ছিল অথবা অসম্পূর্ণ। হতে পারে এসব ঘটনার পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা রয়েছে। কিন্তু যখন আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কাউকে এভাবে বিনাবিচারে হত্যা করা হয়, তার মধ্য দিয়ে প্রথমত ন্যায়বিচারের দরজা বন্ধ করা হয় এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা প্রদর্শন করা হয়। উপরন্তু এরকম ঘটনায় যদি নিরীহ কারও প্রাণ গিয়ে থাকে, তাহলে সেটি আরেকটি অপরাধের জন্ম দেয়। অর্থাৎ, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে গিয়ে অবিচারের শঙ্কা তৈরি হয়Ñযা সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে বড় অন্তরায়।
চট্টগ্রামে ধর্ষণের অভিযোগে যে লোককে পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে চাইল উত্তেজিত জনতা, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আসলেই সঠিক কি না, তা আদালতে প্রমাণের আগে তাকে ধর্ষক বলার সুযোগ নেই। একইভাবে শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যাকারী কে, সেটি মোটামুটি নিশ্চিত হলেও এই ঘটনারও বিচার হতে হবে আইনি প্রক্রিয়ায়। তার হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশে কেউ কেউ অপরাধীর প্রকাশ্যে বিচার চেয়েছেন। তার মানে তারা চান হত্যাকারীর প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড হোক। এটি ইসলামি শরিয়া আইন অনুমোদন করলেও বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুমোদন করে না। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা যে আইনে চলে, সেভাবেই বিচার হবে। তবে এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় যে দুর্বলতা আছে, সেটি নিয়ে নিশ্চয়ই আমাদের কথা বলতে হবে।
বাংলাদেশে ধর্ষণ বা যে কোনো অপরাধের ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে বড় বাধা প্রধানত দুটি। পুলিশের তদন্ত এবং উচ্চ আদালতে গিয়ে রায়ের বাস্তবায়ন আটকে যাওয়া বা প্রলম্বিত হওয়া।
রামিসার হত্যার বিচার দাবিতে যেদিন দেশ উত্তাল, সেদিনই শিশু ধর্ষণ ও শিশু হত্যা সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠনের অনুরোধ জানিয়ে প্রধান বিচারপতির দপ্তরে আবেদন করেছেন ৯ জন আইনজীবী। আবেদনে বলা হয়, ‘বিভিন্ন সময় অধস্তন আদালতে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার হলেও হাইকোর্ট বিভাগে ডেথ রেফারেন্স (বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের আবেদন), আপিল এবং আপিল বিভাগের আপিল শুনানি করতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে। মাগুরার শিশু আসিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসামির ফাঁসি হলেও ডেথ রেফারেন্স কবে শুনানি হবে, তা অনিশ্চিত। ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলাসহ বহু মামলা এভাবে অপেক্ষমাণ। ফলে রাজধানীর মিরপুরে ধর্ষণের পর হত্যা করা শিশু রামিসার বাবা বলেই বসেছেন, আপনারা বিচার করতে পারবেন না। এমতাবস্থায় শিশু ধর্ষণ ও শিশু হত্যা সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে শুনানির ব্যবস্থা করার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।
বাংলাদেশে সম্ভবত সবশেষ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ধর্ষণ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত একজন আসামির ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এরপরে আর কারও ফাঁসি কার্যকর হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ২০২৩ সালের ২২ জানুয়ারি রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় হাই সিকিউরিটি কারাগারে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় দণ্ডিত শুক্কুরের ফাঁসি কার্যকর হয়। ২০০৪ সালে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে সংঘটিত একটি দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় শুক্কুর জড়িত ছিলেন বলে আদালতে প্রমাণিত হয়।
২০২০ সালের ১৬ অক্টোবর প্রথম আলোর একটি খবরে বলা হয়, দেশে ধর্ষণসংক্রান্ত মামলায় গত ১১ বছরে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। যখন ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়, তখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কারাগারে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আসামি ছিলেন আরও ১৪৪ জন।
বিভিন্ন মামলার রায় বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বলছেন, মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে প্রমাণের দায়ভার অনেক বড় হয়। সে ক্ষেত্রে চুলচেরা সুনিশ্চিত প্রমাণের অভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তির খালাস পাওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। নিম্ন আদালতে হওয়া মৃত্যুদণ্ডের বেশির ভাগ উচ্চ আদালতে টেকে না। বিচারপ্রার্থীর অপেক্ষা দশকের পর দশক গড়ায়। এমনিতেই ধর্ষণ মামলা ঝুলে থাকে, সাজার হারও নগণ্য।
বেসরকারি সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার পর ২০০০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত উচ্চ আদালতে আসামিদের ৪৮টি আপিল মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, সব কটি মামলার আসামিরাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পর্যন্ত গিয়েছিলেন। সর্বোচ্চ আদালত পাঁচটি মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করেন। বাকি দুটি ক্ষেত্রে হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছিলেন; তারা আপিল বিভাগে গিয়েছিলেন কি না, তা জানা যায়নি (প্রথম আলো, ১৬ অক্টোবর ২০২০)।
যখনই কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, সঙ্গে সঙ্গে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় এবং অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ওঠে। এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্র কি চাইলেই দ্রুত বিচার করতে পারে? দ্রুত বিচার আইনে অনেক ঘটনার বিচার হয়; কিন্তু সেখানেই আইনি প্রক্রিয়া মানতে হয়। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে গিয়ে যাতে অবিচার না হয়, যাতে নিরপরাধ কেউ শাস্তি না পায় কিংবা কেউ লঘুপাপে গুরুদণ্ড না পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হয়।
ন্যায়বিচারের ধর্মই হলো, আইনের ফাঁক দিয়ে কিংবা অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় কোনো অপরাধী যদি ছাড়া পেয়েও যায়, কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে শাস্তি না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। সুতরাং রাষ্ট্র চাইলেই জনরোষের মুখে কাউকে ধরে এনে প্রকাশ্যে রাস্তায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিতে পারে না বা ফায়ারিং স্কোয়াডে দিতে পারে না। কোনো সভ্য রাষ্ট্র এই ধরনের বর্বরতা অনুমোদন করে না। করে না বলেই বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারের মতো ঘটনায় অনেক সময় শীর্ষ সন্ত্রাসী, জঙ্গি বা বড় অপরাধী নিহত হওয়ার ঘটনায় মানুষ খুশি হলেও দিন শেষে যে কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাই ন্যায়বিচারের পরিপন্থি।
২০১৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারির একটি সংবাদ সম্মেলনের কথা অনেকেরই হয়তো মনে আছে। ধর্ষণের শিকার মেয়েকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে বিচার চেয়েছিলেন একজন বাবা। ধর্ষিত শিশু সন্তানকে বুকে জড়িয়ে একজন বিচারপ্রার্থী অসহায় বাবার এমন সংবাদ সম্মেলনের দৃশ্য এর আগে বাংলাদেশ কখনো দেখেনি। নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার ওই অসহায় পিতা কি তার শিশুসন্তানের ধর্ষণের বিচার পেয়েছিলেন?
গাজীপুরের হযরত আলীর কথা মনে আছে? ৮ বছরের মেয়ে আয়েশা আক্তারের শ্লীলতাহানির বিচার না পেয়ে মেয়েকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। মেয়ের সম্ভ্রম রক্ষায় স্থানীয় প্রভাবশালী থেকে শুরু করে পুলিশ প্রশাসন সবার কাছেই গিয়েছিলেন হযরত আলী। কিন্তু পদে পদে অপদস্থ হতে হয়েছে তাকে; পেয়েছেন ‘পাগল’ উপাধি। সবশেষ ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের আয়োজনও চূড়ান্ত করা হয়। প্রকাশ্যে দা, লাঠিসোটা নিয়ে দরিদ্র হযরত আলী দম্পতির ওপর চড়াও হয় স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। অবশেষে এই অমানবিক এবং ন্যায়বিচারহীন পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। হযরত আলীকে নিশ্চয়ই আমরা এতদিনে ভুলে যেতে পেরেছি।
বলা হয়, বিচার বিলম্বিত হলে অবিচারের ঝুঁকি বাড়ে। সে ক্ষেত্রে যে কোনো ঘটনার দ্রুত বিচার হলে সেখানে ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা বাড়ে। ফলে আইনের নাম যখন হয় দ্রুত বিচার আইন, তাতে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়। কিন্তু দ্রুত বিচার করতে গিয়ে যাতে অবিচার না হয়, সেদিকেও রাষ্ট্রকে খেয়াল রাখতে হয়।
বিচার নির্ভর করে মূলত মামলার তদন্ত রিপোর্ট ও সাক্ষ্য—প্রমাণের ওপর। নৃশংস কোনো ঘটনায়ও অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না, যদি তদন্ত প্রতিবেদন দুর্বল হয় বা পর্যাপ্ত সাক্ষ্য—প্রমাণ না থাকে। সুতরাং শুধু দ্রুত বিচার নয়, বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। অর্থাৎ ধর্ষণের মিথ্যা মামলায় যেন কোনো নিরপরাধ লোক শাস্তি না পান বা কেউ যাতে অবিচারের শিকার না হন; জায়গা—জমি বা রাজনৈতিক বিরোধের কারণে প্রতিপক্ষের লোক যাতে ধর্ষণ মামলায় ফেঁসে না যান, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
ধর্ষণ বা নারীর প্রতি সহিংসতার মামলাগুলো ঝুলে যায় মূলত তদন্তের দুর্বলতার কারণে। প্রথমত যারা তদন্ত করেন তাদের অদক্ষতা এবং একই সঙ্গে তাদের অসততাই এর জন্য প্রধানত দায়ী। সুতরাং তদন্তকারীদের দক্ষতা বাড়ানো এবং তদন্ত যাতে পক্ষপাতমুক্ত হয়, সেটি নিশ্চিত করতে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এর জন্য আইন সংশোধনের চেয়ে বেশি জরুরি সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি।
মনে রাখতে হবে, শুধু কঠোর আইন দিয়ে ধর্ষণ বা নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন নারী ও কন্যাশিশুর ব্যাপারে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। পুরুষ যদি নারীকে কেবল ‘নারী’ ভাবতে থাকে, তাকে ‘মানুষ’ ভাবতে না শেখে বা ভাবতে না পারে; যদি সে পুরুষ হিসেবে নিজেকে সুপিরিয়র (শ্রেষ্ঠ) ভাবতে থাকে এবং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র যদি তার এই ভাবনায় সায় দেয়, সে ক্ষেত্রে নারীর ওপর পুরুষের খবরদারি কমবে না। আর খবরদারি না কমলে ধর্ষণও বন্ধ হবে না।
