বিচারহীনতার অন্ধকারে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম || দীপু মাহমুদ
‘বিচার করতে না পারলে রামিসার অপরাধীকে আমাদের হাতে তুলে দিন’— রাজধানীর রাজপথে দাঁড়িয়ে কয়েকজন কিশোরের উচ্চারিত এই বাক্য কেবল একটি হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি গভীর হতাশা, ক্ষোভ এবং আস্থা হারানোর নির্মম দলিল। এমন কথা কোনো সভ্য সমাজে উচ্চারিত হওয়ার কথা নয়। কারণ সভ্য রাষ্ট্রে মানুষ বিচার নিজের হাতে তুলে নিতে চায় না; মানুষ রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখতে চায়। আদালত, আইন, তদন্ত এবং বিচার ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে চায়। কিন্তু যখন মানুষ বছরের পর বছর দেখে অপরাধ ঘটে, প্রতিবাদ হয়, সংবাদ প্রকাশিত হয়, সামাজিক মাধ্যম উত্তাল হয়— তারপরও বিচার ঝুলে থাকে, তখন মানুষের ভেতরে জমতে থাকে ভয়ংকর এক বিশ্বাস: ‘বিচার পাওয়া যায় না’।
রামিসা হত্যাকান্ড জমে থাকা ক্ষতের ওপর নতুন করে আঘাত করেছে।
রাজধানীর মিরপুরে স্কুলশিক্ষার্থী রামিসার রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে সহপাঠী ও কিশোরদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করে, বিক্ষোভ করে, সংবাদ সম্মেলন করে। তাদের হাতে লেখা নানা প্ল্যাকার্ডে উঠে আসে। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগজনক স্লোগানটি ছিল— ‘বিচার করতে না পারলে অপরাধীকে আমাদের হাতে তুলে দিন’। এই একটি বাক্যই বুঝিয়ে দেয়, নতুন প্রজন্মের একাংশ রাষ্ট্রীয় বিচার ব্যবস্থার প্রতি কতটা অনাস্থাশীল হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকগুলোর একটি ছিল রামিসার বাবার বক্তব্য। সংবাদমাধ্যমে তিনি বলেছেন, তিনি আর বিচার চান না, শুধু চান যেন আর কোনো বাবাকে এমন কষ্ট সহ্য করতে না হয়। একটি সন্তানের হত্যার পর একজন বাবা যখন রাষ্ট্রের কাছে দৃঢ়ভাবে বিচার দাবি না করে হতাশা, ক্লান্তি ও অবিশ্বাসের ভাষায় কথা বলেন, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত শোকের প্রকাশ থাকে না, সেটি বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের গভীর আস্থাহীনতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
কারণ সাধারণত একজন বাবা—মা সন্তানের হত্যার পর ন্যায়বিচারের জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে চান। কিন্তু যখন কেউ মনে করেন বিচার হয়তো হবে না, অথবা হলেও দীর্ঘ সময়ের অনিশ্চয়তায় হারিয়ে যাবে, তখন সেই মানুষটির কণ্ঠে ক্ষোভের বদলে এক ধরনের ভাঙা নিরাশা তৈরি হয়। রামিসার বাবার বক্তব্য সেই সামাজিক বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর একটি প্রশ্নও তৈরি করে, কেন একজন শোকাহত বাবা রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছেন না? কেন তিনি মনে করছেন, বিচার চাওয়ার চেয়েও বড় কথা হলো ভবিষ্যতে আর যেন এমন ঘটনা না ঘটে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের বিচারহীনতার দীর্ঘ ইতিহাস, বিলম্বিত বিচার, প্রভাবশালী অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি এবং মানুষের ক্রমশ ভেঙে পড়া আস্থার দিকেই তাকাতে হয়।
এই অনাস্থা হঠাৎ তৈরি হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, তদন্তের দুর্বলতা এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রতার ফল।
বাংলাদেশে বহু আলোচিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনায় জনমনে একই ধরনের হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। তনু হত্যা, নুসরাত জাহান রাফি হত্যা, বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যা, আবরার ফাহাদ হত্যা, সিলেটের শিশু রাজন হত্যা— প্রতিটি ঘটনায় মানুষ রাস্তায় নেমেছে। সামাজিক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে মানুষের মনে জন্ম নিয়েছে আরেকটি প্রশ্ন: ‘বিচার কি সত্যিই হবে?’
শুধু আলোচিত ঘটনাই নয়, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা ও সহিংসতার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতিবছর শত শত শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অনেক ঘটনায় মামলা পর্যন্ত হয় না, অনেক ঘটনায় তদন্ত শেষ হয় না, আবার অনেক ক্ষেত্রে বিচার দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকে। ফলে অপরাধীর মনে ভয় কমে যায়, আর সাধারণ মানুষের মনে জন্ম নেয় হতাশা।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার একটি বড় অংশ বছরের পর বছর নিষ্পত্তিহীন থাকে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বহু ঘটনায় অভিযোগ গঠনের পরও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকে। আদালতের জট, তদন্তের ধীরগতি, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ— সব মিলিয়ে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষয়ে যাচ্ছে।
জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলেছে, সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতা একজন শিশুর মানসিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক আচরণে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ বিচারহীনতা কেবল আইনি ব্যর্থতা নয়; এটি ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরির ক্ষেত্রেও গভীর সংকট সৃষ্টি করে।
সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এই বাস্তবতা এখন শিশু—কিশোরদের মানসিকতাকেও প্রভাবিত করছে।
একজন শিশু যখন টেলিভিশনে দেখে খুনের সংবাদ, ধর্ষণের সংবাদ, নির্যাতনের সংবাদ; তারপর দেখে মাসের পর মাস, বছরের পর বছরেও বিচার শেষ হচ্ছে না— তখন তার মানসিক জগতে রাষ্ট্রের যে নৈতিক প্রতিচ্ছবি তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেটি ভেঙে যেতে থাকে। সে ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শেখে, আইন সবার জন্য সমান নয়। ক্ষমতাবানরা রক্ষা পায়, দুর্বলরা ন্যায়বিচার পায় না।
এটি কেবল আইনি সংকট নয়; এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক সংকট।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি অস্ত্র নয়; জনগণের বিশ্বাস। মানুষ যদি আদালতের ওপর আস্থা হারায়, তাহলে আইন কেবল বইয়ের পাতায় থাকে, বাস্তবে নয়। তখন সমাজে প্রতিশোধের সংস্কৃতি জন্ম নেয়। মানুষ মনে করতে শুরু করে— ‘আইন কিছু করবে না, তাই নিজেদেরই কিছু করতে হবে।’ এর ফল হয় গণপিটুনি, সামাজিক সহিংসতা এবং অরাজকতা।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গণপিটুনির ঘটনাগুলোও এই সামাজিক অনাস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। কোথাও চোর সন্দেহে, কোথাও গুজব ছড়িয়ে, কোথাও শিশু অপহরণের অভিযোগ তুলে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। কারণ মানুষের একাংশ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে বিচার ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর নয়। এই মানসিকতা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
রামিসা হত্যাকাণ্ডের পর কিশোরদের মুখে উচ্চারিত স্লোগান তাই কেবল আবেগ নয়, এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি সতর্কবার্তা। কারণ একটি প্রজন্ম যদি ন্যায়বিচারের বদলে প্রতিশোধে বিশ্বাস করতে শেখে, তাহলে ভবিষ্যৎ সমাজ আরও সহিংস হয়ে উঠবে।
কিন্তু এই ঘটনার আরেকটি দিকও গভীরভাবে ভাবার মতো। এত বড় একটি ঘটনার পর সমাজের যেসব অংশ সাধারণত নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করে, সেই সুশীল সমাজ, লেখক সমাজ, সাংস্কৃতিক অঙ্গন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী সমাজ কিংবা বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের কাছ থেকে প্রত্যাশিত মাত্রার ধারাবাহিক ও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। কিছু বিচ্ছিন্ন বিবৃতি, কিছু সামাজিক মাধ্যম পোস্ট কিংবা সাময়িক প্রতিবাদের বাইরে বৃহত্তর সামাজিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়নি।
একটি সমাজে যখন শিশু হত্যার মতো ঘটনায়ও বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে যায়, তখন সেটি সমাজের সংবেদনশীলতা হারানোর লক্ষণ। আমরা ধীরে ধীরে এমন এক সময়ে প্রবেশ করছি, যেখানে ভয়াবহ ঘটনাও মানুষকে দীর্ঘ সময় নাড়া দেয় না। কয়েকদিন ক্ষোভ প্রকাশ হয়, তারপর মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যায়। যেন মৃত্যু, নির্যাতন ও বিচারহীনতা এখন আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতার অংশ।
এই নীরবতা কেবল উদাসীনতা নয়, এটি বিপজ্জনক সামাজিক ক্লান্তি। মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এত অন্যায়, এত সহিংসতা, এত বিচারহীনতা দেখেছে যে অনেকেই এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে— ‘কিছুই বদলাবে না’। ফলে প্রতিবাদের শক্তিও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন মানবাধিকারকর্মী, মনোবিজ্ঞানী এবং শিক্ষাবিদও বারবার সতর্ক করেছেন যে সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সেটি শুধু অপরাধ বাড়ায় না, মানুষের নৈতিক সংবেদনশীলতাও ক্ষয় করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক বিভিন্ন আলোচনায় বলেছেন, শিশু ও কিশোরদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশা রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক সংকেত। কারণ তারা যদি ছোটবেলা থেকেই দেখে অপরাধের বিচার অনিশ্চিত, তাহলে ভবিষ্যতে নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়বে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, নিয়মিত সহিংসতা ও বিচারহীনতার সংবাদ শিশু—কিশোরদের মধ্যে সামষ্টিক ভীতির সংস্কৃতি তৈরি করে। তারা নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারে না। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি নিরাপত্তাবোধ দুর্বল হয়ে যায়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পুরো জাতির সামাজিক আচরণে পড়ে।
কিন্তু ইতিহাস বলে, যখন সমাজের বিবেক নীরব হয়ে যায়, তখন অন্যায় আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
একজন লেখকের কলম, একজন শিক্ষককের বক্তব্য, একজন সাংস্কৃতিক কর্মীর প্রতিবাদ, একজন সাংবাদিকের অনুসন্ধান— এসবই সমাজে নৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রকে জবাবদিহির মধ্যে রাখে। কিন্তু যদি সমাজের চিন্তাশীল অংশই ধীরে ধীরে নীরব হয়ে পড়ে, তাহলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়।
এখানে রাষ্ট্রেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। কারণ মানুষের আস্থা শুধু বক্তৃতা দিয়ে ফিরে আসে না, আস্থা ফিরে আসে দৃশ্যমান ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং সমতার মাধ্যমে।
মানুষের আস্থা পুনর্গঠনে রাষ্ট্র ও সরকারের কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও সহিংসতার মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ও নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক বিচার প্রক্রিয়া কার্যকর করতে হবে। বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে সেটি কার্যত বিচারহীনতায় পরিণত হয়।
দ্বিতীয়ত, তদন্ত ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক ও প্রভাবমুক্ত করতে হবে। একটি মামলার তদন্ত যদি শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে পুরো বিচার প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। দক্ষ তদন্ত কর্মকর্তা, ফরেনসিক সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত বাড়ানো জরুরি।
তৃতীয়ত, সাক্ষী সুরক্ষা আইন বাস্তবিকভাবে কার্যকর করতে হবে। বহু ক্ষেত্রে সাক্ষীরা ভয়, চাপ কিংবা নিরাপত্তাহীনতার কারণে মুখ খুলতে চান না। এতে বিচার দুর্বল হয়ে পড়ে।
চতুর্থত, বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি জনসমক্ষে নিয়মিত তুলে ধরতে হবে। আলোচিত মামলাগুলোর কী অবস্থা, কোথায় বিলম্ব হচ্ছে, কেন হচ্ছে— এসব বিষয়ে রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। নীরবতা মানুষের সন্দেহ বাড়ায়।
পঞ্চমত, শিশু সুরক্ষাকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে না দেখে জাতীয় সামাজিক অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। স্কুল, পরিবার, স্থানীয় সরকার, সামাজিক সংগঠন— সবাইকে সম্পৃক্ত করে শিশুবান্ধব নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
ষষ্ঠত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং এবং শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করা প্রয়োজন। কারণ সহিংসতার অভিজ্ঞতা বা ভয়ের পরিবেশ শিশুদের মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে।
সপ্তমত, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। যখন সমাজের সর্বস্তরে প্রতিপক্ষকে অপমান, দমন ও ধ্বংস করার ভাষা শক্তিশালী হয়, তখন সহিংসতা সামাজিকভাবে বৈধতা পেতে শুরু করে। শিশুরা সেই সংস্কৃতিই শেখে।
এখানে গণমাধ্যমের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ঘটনাকেন্দ্রিক আবেগ নয়; বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি, তদন্তের গতি, মামলার বর্তমান অবস্থা— এসবও নিয়মিত সামনে আনতে হবে। কারণ সংবাদ যদি কেবল ‘ঘটনা’ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি অদৃশ্যই থেকে যায়।
রাষ্ট্রের বুঝতে হবে, বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে শুধু একটি মামলা ঝুলে থাকা নয়; এর অর্থ সমাজে অপরাধের সাহস বেড়ে যাওয়া। অপরাধী যখন দেখে বিচার হতে বছরের পর বছর লেগে যায়, তখন অপরাধের ঝুঁকি তার কাছে কমে যায়। আর সাধারণ মানুষ যখন দেখে ন্যায়বিচার অনিশ্চিত, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তার আস্থা কমে যায়।
এই অবস্থায় রামিসা হত্যার দ্রুত, স্বচ্ছ এবং বিশ্বাসযোগ্য বিচার অত্যন্ত জরুরি। এটি শুধু একটি পরিবারের জন্য ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়, এটা রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার প্রশ্ন। কারণ মানুষ দেখতে চায় রাষ্ট্র সত্যিই অপরাধীর বিরুদ্ধে দাঁড়ায় কিনা।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের শিশু—কিশোরদের সামনে কেমন রাষ্ট্রের ছবি তৈরি হচ্ছে, সেটি এখন গভীরভাবে ভাবতে হবে। তারা যদি বিশ্বাস করতে শেখে যে ন্যায়বিচারের একমাত্র পথ প্রতিশোধ, তাহলে সেটি হবে একটি সভ্য সমাজের ভয়াবহ ব্যর্থতা।
কোনো কিশোরের মুখে এই বাক্য শোভা পায় না— ‘বিচার করতে না পারলে অপরাধীকে আমাদের হাতে তুলে দিন।’ এই বাক্য একটি সমাজের ক্ষত, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের হতাশা এবং বিচারহীনতার দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতীক।
রামিসার বিচার তাই শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়; এটি মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনার লড়াই। রাষ্ট্র যদি এই আর্তনাদ শুনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বহু কিশোরের কণ্ঠে একই স্লোগান ধ্বনিত হবে। আর সেটিই হবে আমাদের সভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় অশনিসংকেত।
দীপু মাহমুদ: কথাসাহিত্যিক
