উদীচীর সেমিনারে বক্তারা || বাঙালিই আমাদের অসাম্প্রদায়িক পরিচয়
বাঙালী প্রতিবেদনঃ বাংলাদেশে যখন ছায়ানট, উদীচীর অফিস আক্রমণ হয়েছে, নাটক বন্ধ হয়েছে, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নানা অপপ্রচারসহ এই রকম ধারাবাহিকভাবে বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত আসছে, তখন নিউইয়র্কের সংস্কৃতিকমীর্রা সেমিনারের মাধ্যমে তার প্রতিবাদ জানালেন। গত রবিবার বিকেলে ‘সংস্কৃতিতে ধমীর্য় আস্ফালন’ শিরোনামে একটি সেমিনারের আয়োজন করে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠি যুক্তরাষ্ট্র সংসদ। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করার কথা ছিল বিশিষ্ট বেতার সাংবাদিক ও লেখক আনিস আহমেদের। অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি উপস্থিত হতে না পারায় তার প্রবন্ধটি পাঠ করেন সংস্কৃতিজন সৈয়দ জাকির আহমদ রনি। উদীচীর সভাপতি ও আবৃত্তিজন ক্লারা রোজারিও’র সভাপতিত্বে আয়োজিত সেমিনারে বক্তব্য রাখেন ড. বিরূপাক্ষ পাল, মুক্তিযোদ্ধা খোরশেদুল ইসলাম ও সাগর লোহানী।
আনিস আহমেদ তার প্রবন্ধে বলেন, আমরা সকলেই বাঙালি এই পরিচয়টাই আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়। বাঙালি পরিচয়ই আমাদের একমাত্র অসাম্প্রদায়িক পরিচয়। এই পরিচিতিকে কোনো খোঁড়া যুক্তি দিয়ে খন্ডন করা যায় না।
তিনি বলেন, ধমীর্য় বিশ্বাসকে খাটো না করেই বলা যায়, এখন সবকিছুর উর্ধে স্থান পাওয়া উচিত মানবতাবোধের। সেই সাথে এটাও তো সত্যি কথা যে কোনো ধর্মই মানুষকে খাটো করে দেখার কথা বলে না। তারপরও ধর্ম ব্যবসায়ীরা ধর্মের নাম ব্যবহার করে ঘৃণ্য ও নিপীড়নমূলক আচরণ করে কেবল অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে তাই নয়, স্বধর্মের লোকদের ওপরও। ধর্মের রাজনীতিকরণ ধর্ম ও রাজনীতি দুটোকেই কলুষিত করেছে।
আনিস আহমেদ বলেন, যে বিষয়টি আমাদের ক্রমাগত ভাবিয়ে তোলে, তাহলো আমরা কি ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছি! বেশভূষায়, পোশাকে—আশাকে আমরা কি সরে যাচ্ছি বাঙালিয়ানা থেকে? অপর আলোচক ড. বিরূপাক্ষ পাল বলেন, ধর্মান্ধতার অর্থ ক্রমবর্ধমান শেকল পরানোর প্রবণতা। অথচ সংস্কৃতির মূল কথা হলো শিকল ভাঙা। আমরা সেই মূল জায়গা থেকে অনেকটা সরে গেছি।
ড. পাল বলেন, ভাষা হচ্ছে সংস্কৃতির মূল অনুষঙ্গ, বড় আশ্রয়। সে কারণেই ভাষার ওপর আক্রমণ হয়েছে। কিন্তু সংস্কৃতি সচেতন বাঙালিদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ষড়যন্ত্রকারীরা পিছু হটে।
তিনি দীর্ঘ আলোচনায় বলেন, পশুপাখি জন্মেই পশুপাখি, কিন্তু মানুষকে মানুষ হতে হয়। মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষ হয় না। মানুষকে যারা বা যে সংস্কৃতি মানুষ করে তোলে তাকে নিয়ে যত ভয়।
তিনি অন্তর্বতীর্ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহম্মদ ইউনুসকে মবযুগের অগ্নিপুরুষ এবং আধুনিক ইতিহাসের খলনায়ক উল্লেখ করে বলেন, তিনি দারিদ্রকে যাদুঘরে পাঠিয়ে দেয়ার চটকদার কথা বলে দেশকে চরম দারিদ্রের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন।
মুক্তিযোদ্ধা খোরশেদুল ইসলাম তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, অনেকে প্রশ্ন করে আমি বাঙালি না মুসলমান। আমি বলি একজন বাঙালি মুসলমান হতে পারেন, আবার একজন মুসলমান বাঙালিও হতে পারেন। এ নিয়ে অহেতুক বিতর্কের কোনো কারণ নেই।
তিনি বলেন, দুনীর্তি আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে। দরবেশ, লোটাস, ফালুরা যে দলেরই হোক তাদের কখনো শাস্তি হয় না।
বাঙালিয়ানার সম্পাদক সাগর লোহানী বলেন, সংস্কৃতি প্রবহমান প্রক্রিয়া। তার নিজস্ব গতিধারা তাকে বেগবান করে। কিন্তু সা¤্রাজ্যবাদের ক্রীড়নকরা নিজেদের স্বার্থে একে ব্যবহার করে।
তিনি বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির একটি মাইলফলক ঘটনা। এর পিছনে সা¤্রাজ্যবাদের কোনো মদদ বা প্ররোচনা ছিল না। প্ররোচনা ছিল একে বাধাগ্রস্ত করার।
সাগর লোহানী ক্ষোভের সাথে বলেন, এত সাম্প্রদায়িক হামলা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত কোনো সাম্প্রদায়িক হামলার বিচার হয়নি। এই বিচারহীনতাই আজ এই রকম দুর্বিসহ এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশে শিক্ষার সামান্যতম উন্নয়ন হয়নি। শিক্ষার উন্নয়ন হলে, অনেক সমস্যার সমাধান হতো।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে ধর্মের যে অপব্যবহার তা রাজনীতির হাত ধরে এসেছে। রাজনীতির সংস্কৃতির উন্নতি না হলে সংস্কৃতি পরিশীলিত হবে না।
সবশেষে সভাপতি ক্লারা রোজারিও সকলকে ধন্যবাদ জানান।
শুরুতে সকলে মিলে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন এবং আমেরিকার ন্যাশনাল এ্যানথেম বাজানো হয়।
