মানবিকতার ঐকতান
গত দুই সপ্তাহে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের আনন্দধারা দেখে বিস্মিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিশ্বজুড়ে মানুষ জীবনধারণের জন্য সকাল—সন্ধ্যা বা সন্ধ্যা থেকে সকাল কাজ করে। নানা ধরনের কাজ। কাজের প্রতি তাদের নিঃশর্ত ডিভোশন পৃথিবীকে চলমান রেখেছে। সেনিটারি ওয়ার্কারই হন আর ডেলিভারি পার্সন, কিংবা সিপিএ, ডাক্তার, এটর্নি অথবা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিই হন সকলে নিজ নিজ কাজ সঠিকভাবে করেন বলেই পৃথিবীটা সুন্দর, অর্থনীতি সচল। রাজনীতিকদের দায়িত্ব দেশের মানুষ যাতে তাদের কাজ সঠিকভাবে করতে পারে, নিরাপদে বাঁচতে পারে তার সার্বিক ব্যবস্থা করা। কিন্তু পৃথিবীতে অনেক দেশের রাজনীতিকরা এমনই স্বার্থান্ধ যে তারা দেশের ও দেশের মানুষের জন্য যে দায়িত্ব পালন করার কথা তা করেন না। অনেক গুরুত্বপূর্ণ দেশ এই তালিকায় আছে। এর মধ্যে সম্প্রতিকালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে।
এ বছরের বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজিত হচ্ছে আমেরিকাসহ মেক্সিকো ও ক্যানাডায়। আগে এই আয়োজন হতো একটি দেশে একটি মাত্র শহরে। কিন্তু সম্প্রতি এই প্রথা ভেঙে কয়েকটি দেশে যুগপৎ আয়োজিত হয় বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শহরে। ফলে এই খেলা দেখার সুযোগ পায় অনেক বেশি এলাকার বেশি সংখ্যক মানুষ। বিশ্বকাপ ফুটবল যে কত জনপ্রিয় হতে পারে এ বছর তা আরো স্পষ্টভাবে বোঝা গেল। একদিকে এই নির্মল আনন্দ উপভোগ করার জন্য মানুষের আকুতি, আবেগ ও অনুভব, অন্যদিকে সেই অনুভূতি ও আবেগের বেলুন চুপসে দেয়ার জন্য রাজনীতিকদের নির্লজ্জ বাধা প্রদান স্তম্ভিতই করেছে। কিন্তু তারপরও প্রমাণিত হয়েছে মানুষের আনন্দে বালি ছিটিয়ে দেয়ার অসৎ ইচ্ছাকে চপেটাঘাত করে মানুষ হয় ছুটে যাচ্ছে নিজ নিজ শহরের স্টেডিয়ামে, কিংবা বিভিন্ন শহরের ওয়াচ পার্টিতে, অথবা ঘরে ঘরে বসে গেছে টিভি সেটের সামনে।
নতুন করে আবার প্রমাণ হলো একমাত্র খেলাই বিশ্বজুড়ে রাজনীতিকদের নানা স্বার্থান্ধতা ও কূপমন্ডুকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদ এমনই যে, যতই রাজনীতির কলুষ থাবা বিস্তার করা হোক না কেন, মানুষ কোন্ দলকে, কোন্ দেশকে সমর্থন করবে, কার খেলা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে দেখবে বা ঘরে বসে দেখবে সেখানে কোনো ছড়ি ঘোরানোই কার্যকর হয় না। রাজনীতিকরা যেখানে মানুষের সাথে মানুষের বিভেদ সৃষ্টি করছে, ধর্ম—বর্ণসহ অন্য নানা পরিচয়ের সূত্র ধরে তাদের মাঝে দেয়াল তুলে দিচ্ছে, এক দলকে বড় করতে গিয়ে অপর দলকে ক্ষুদ্র করার অপচেষ্টা বা কু—চেষ্টা করছে, সেখানে খেলা মানুষকে একই স্টেডিয়ামে বসাচ্ছে। সহ¯্রাধিক ডলারের টিকিটও তাদের প্রতিরোধ করতে পারছে না।
এমন কি যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে যাওয়া দেশের বারুদের গন্ধ মেখেও খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপের মাঠে নেমেছেন। কেউ দেখছে না কে কোন্ ধর্মের। সেখানে কেবল পরিচয় দুটি, একটি তার দেশ, অপরটি তার খেলার মেধা। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত কি কেউ প্রশ্ন করেছে লিওনেল মেসির ধমীর্য় পরিচয় নিয়ে? সত্যিকার খেলার স্পিরিট কেমন হওয়া উচিত এসব তারই প্রমাণ।
কিংবা আমেরিকার এনবিএ বা ন্যাশনাল বাস্কেটবল এসোসিয়েশনের ফাইনালসের কথাই ধরা যাক। নিউইয়র্কের দল নিউইয়র্ক নিকস আর টেক্সাসের দল স্যান এন্টোনিও স্পারস এর ফাইনালস নিয়ে যে উন্মাদনা তার সাথে কি আমেরিকার রাজনীতির কোনো সম্পর্ক আছে? এরেনার গ্যালারিতে প্রেসিডেন্ট বসুক আর মেয়র বসুক জনগণ ততটুকুই বিরক্ত, যতটুকু তাদের নিরাপত্তার জন্য আনন্দ উপভোগের জায়গাটুকু সংকুচিত করা হয়েছে। এইসব খেলার সাথে আমেরিকার প্রশাসনের সম্পর্ক কেবল এবটি জায়গায় তাহলো জনগণের নিরাপত্তা বিধান করা, শৃঙ্খলা রক্ষা করা। বর্তমান মেয়র জোহরান মামদানি নতুন হলেও তার এই শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করার অদম্য আগ্রহ এবং প্রশাসনকে নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্যবহার করে সেই কাজটি করে যাচ্ছেন। এর ফলে সিটি, স্টেটসহ বহিরাগত পর্যটকদের মনে নিরাপত্তা নিয়ে এক ধরনের নিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে ঘাটতি বাজেট নিয়ে যাত্রা শুরু করে তিনি এনবিএ ফাইনালস এবং ফিফা বিশ্বকাপের কারণে বিপুল রেভিনিউ আয় করতে সক্ষম হয়েছেন। এটা তার গুড ম্যানেজারিয়াল দক্ষতা প্রমাণ করে।
বৃহস্পতিবারের টিকার—টেপ প্যারেডে মানুষের বিপুল আগ্রহ দেখে এর সাথে তুলনীয় মনে হয়েছে কেবল সুপারবৌলে নিউইয়র্ক জায়ান্টসর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর (২০০৮) এবং এর আগে সেই নব্বইএর দশকে ১৯৯৬, ১৯৯৮, ১৯৯৯, ২০০০ এবং ২০০৯ সালে ওয়ার্ল্ড সিরিজে নিউইয়র্ক ইয়াংকিস চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরের কথা। এই ধরনের বিজয় র্যালির আয়োজক নিউইয়র্ক সিটি এবং নিউইয়র্ক স্টেট। এই বহুজাতিক সিটি ও স্টেটকে গভীর উল্লাসের পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ করা এবং দিন—রাত্রি জেগে থেকে এই সিটির কর্মযোগী মানুষদের মনে আনন্দধারা বইয়ে দেয়ার মত নির্মল উদ্দেশ্য বারবার সফল হয়। কনফেটিতে ছেয়ে যায় আকাশ। এই নানা বর্ণের কনফেটি বহুজাতিক এই সিটির যেমন মোজাইক সংস্কৃতিক প্রতীক এবং ধর্ম—বর্ণ—ধনী—দরিদ্র ও লিংগ পরিচয়ের বেজাড়াল অতিক্রম করে মানবিকতার ঐকতান তুলে ধরে।
ক্রীড়া যেমন মানুষের দেহ ও মনকে সুস্থ রাখে, তেমনই ঐক্যবদ্ধ আনন্দ কূপমন্ডুক রাজনীতিকদের জন্য বড় চপেটাঘাত। ফিফা বিশ্বকাপ ও এনবিএ ফাইনালস সেই কথাই প্রমাণ করল।
