মুক্তিযোদ্ধা রথীন্দ্রনাথ রায় আমার বাবা সুপারহিরো চন্দ্রা রায়

বাবাÑ দুই অক্ষরের এই শব্দটি আমার জন্য বিশাল অর্থবহ। আমার জীবনের পরতে পরতে রয়েছে আমার বাবার সাহচর্য, সমর্থন আর উৎসাহ। তার কঠিন অনুশাসনের অন্তরালে যেমন আছে কাঠিন্য, তেমনি তার উল্টোদিকে আছে গভীর ভালোবাসা। বাবার শব্দটাই বুঝি এমন হয়! আমার বাবা একজন প্রচন্ড সংগীত অনুরাগী এবং সংগীত পিপাসু মানুষ। ঠাকুমার কাছে শুনেছি আমার বাবা ছোটবেলা থেকেই নাকি ছিলেন গানের প্রতি অতিরিক্ত অনুরক্ত। আমার দাদু শ্রদ্ধেয় হরলাল রায় তার পুত্রের এই গানআসক্তি সম্পর্কে যতদিনে জেনেছিলেন ততদিনে বাবা দাদুর গানের ডায়েরি নিয়ে ক্ষেতের আইলে বসে চিৎকার করে গান গাইবার প্রচেষ্টায় রত। পরবর্তীতে আমার দাদুর কাছে আমার বাবার প্রাথমিক গান শেখার হাতেখড়ি হয়। নিজের সাধনা আর চেষ্টায় বাবা আজকের কিংবদন্তি শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়, যাকে বাংলাদেশের মানুষ অনেক অনেক ভালোবাসে এবং শ্রদ্ধা করে। 

বাবার সাথে অনেক অনুষ্ঠানে যাওয়ার আমার সৌভাগ্য হয়েছে। দেখেছি বাবাকে একটু কাছে থেকে দেখার জন্য, তার সাথে একটু কথা বলার জন্য মানুষের কতটা উন্মাদনা। আমি ভীষণভাবে বাবার এই জনপ্রিয়তা উপভোগ করি। আমার বাবা আমার কাছে অনেক অহংকারের এবং সম্মানের। 

আমার বাবা একজন সৎ, নিষ্ঠাবান এবং পরিশ্রমী মানুষ। অন্যায়ের সাথে কখনো তাকে আপোষ করতে দেখিনি। বাবার এই চারিত্রিক গুণাবলীর প্রতি প্রচন্ড আকৃষ্ট আমি। বাবাকে অনুসরণ করেই আজকে আমি আমেরিকার কঠিন জীবনযাপনেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি এবং আশা করছি আগামীতেও তার পদচিহ্ন অনুসরণ করে এগিয়ে যেতে পারবো। বাবার আদর্শ আসলেই অনুকরণীয়। 

বাবা ভীষণ ভাব গাম্ভীর্যপূর্ণ মানুষ, তবে সেটা ক্ষেত্র বিশেষে। কেন বললাম কথা? কারণ তিনি প্রচন্ড রকমের বন্ধু বৎসল, আসর মাতানো মানুষ। বিশেষভাবে, বাবাকে যদি একবার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সম্পর্কে কিছু বলতে বলা হয়, তবে উনি নির্দ্বিধায় সাত দিন একনাগাড়ে কথা বলে যেতে পারবেন। শুনলে মনে হবে যেন আমি চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি ঘটনাগুলো। এত গুছিয়ে কথা বলতে পারেন বাবা যেন মনে হয় শুনতেই থাকি। বাবা দারুণ একজন বক্তা। অনেক কিছু শেখার আছে আমার বাবার কাছ থেকে। চেষ্টা করি এবং সুযোগ পেলেই চেষ্টা করি শেখার বাবার কাছ থেকে, সেটা গানই হোক বা অন্য কিছু। 

বাবা একজন প্রচন্ড পরোপকারী মানুষ। ছোটবেলায়এমনকি বড় হয়েও অনেক সময়ই দেখেছি দেশের আনাচেকানাচে এবং অবশ্যই তার নিজের গ্রামের বাড়ি রংপুর থেকেও মানুষ বিষন্ন মুখে এসে হাসিমুখে ফিরে যাচ্ছে। কারো মেয়ের বিয়ে, কারো চিকিৎসা, কারো পড়াশোনা, অথবা ঢাকা শহর দেখতে এসেছে এমন আবদার আমার বাবা নির্দ্বিধায় পূরণ করেছেন। আমার বাবা যেন একজন সুপারহিরোর মতো সবকিছু সমাধান করে দিতে জানেন। কোন এক সুপার পাওয়ার নিয়ে যেন বাবা জন্মেছেন। আমার বাবা আমার কাছে গ্রেট সুপারম্যান। 

তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে, নোঙ্গর তোলো তোলো সময় যে হলো হলো, পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, ছোটদের বড়দের সকলের... স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গাওয়া এই গানগুলো বাবাকে অমরত্ব দিয়েছে। যখনই, যেভাবেই, আর যতবারই গানগুলো শুনেছি বা শুনি ততোবারই আবেগে আপ্লুত হই আমি নিজেও। কণ্ঠের দৃঢ়তা দিয়েও যে একটা দেশকে স্বাধীন করা যায় সেটা একাত্তরে আমার কণ্ঠযোদ্ধা বাবা প্রমাণ করেছেন। আমার বাবাকে ঈশ্বর অনেক ভালোবাসেন। তাই তার কণ্ঠে দিয়েছেন এমন জাদু যে জাদুতে ৭১এর বীর মুক্তিযোদ্ধারা সম্মুখ সমরে নিজেদের প্রাণ দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। যতদিন বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের মানচিত্র থাকবে ততদিন আমার বাবা আর তার গাওয়া এই গানগুলো অনুরণিত হবে। 

পরিশেষে বলতে চাই, গান অনুরাগী আমার বাবা দীর্ঘজীবী হন। বাবা, তোমাকে অনেক ভালোবাসি, কথাটা সেভাবে বলাই হয়ে ওঠে না। আজকে এই কথাটি বলার সুযোগ করে দেয়ার জন্য কৌশিক আহমেদ আঙ্কেলকে তথা সাপ্তাহিক বাঙালী পত্রিকার প্রত্যেককে আমার কৃতজ্ঞতা জানাই। অনেক ধন্যবাদ আর অশেষ কৃতজ্ঞতা।

নিউইয়র্ক, /১৬/২৬

Related Posts