মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌস নাজমী বাবার গল্প রূপকথা নয়, বাস্তব সাইদা আফরিন, ইশরাক নাজমী

বড় হতে হতে আমরা খুব কমই আব্বুর মুখে মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনেছি। আমরা জানতাম আব্বু মুক্তিযোদ্ধা, কিন্তু সেই জানাটা আমাদের কাছে গল্পের চেয়ে তথ্য হিসেবেই বেশি ছিল। আব্বু কখনও আমাদের বসিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের রোমাঞ্চকর কাহিনী বা সাহসী অভিযানের গল্প শোনাননি। নিজের বীরত্ব নিয়ে কখনো কথা বলেননি, নিজেকে নায়ক হিসেবে তুলে ধরারও চেষ্টা করেননি। বরং জীবনের সেই অধ্যায় নিয়ে তাঁর নীরবতাই আমাদের অন্য এক শিক্ষা দিয়েছে, যা আমাদের মনে গভীর শ্রদ্ধার জন্ম দিয়েছে, শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌস নাজমীর প্রতি নয়, বরং সেই ফেরদৌস নাজমী যিনি পরে আমাদের বাবা হয়ে উঠেছেন।

আমাদের কাছে আব্বু শুধু আব্বুÑ এমন একজন মানুষ, যিনি তাঁর পরিবারকে আগলে রেখেছেন, সন্তানদের বড় করেছেন এবং নীরব দৃঢ়তায় নিজের জীবনযাপন করেছেন। একজন নিভৃতচারী মানুষ, যিনি আমাদের ভালোবাসেন, কিন্তু সেই ভালোবাসার প্রকাশ খুবই নিঃশব্দ। 

আব্বু কখনও বলেননি আমাদের কোন বিষয় পড়া উচিত, কোন পেশা বেছে নেওয়া উচিত। অনেক সময় ঠিক করে বলতেও পারেননি আমরা কোন ক্লাসে পড়ি। হয়তো বিশ্বাসই হতো না যে আমরা বড় হয়ে গেছি। তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমরা সময়মতো বাড়ি ফিরেছি কি না, ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করেছি কি না।

আব্বু খুব সাধারণ জিনিসে আনন্দ খুঁজে পান। আমরা যদি তাঁর জন্মদিন বা ফাদার্স ডেতে শুভেচ্ছা জানাতে ভুলেও যাই, তাতেও বোধহয় মন খারাপ হবে না। কারণ আমরা মনে না করালে তাঁর হয়তো তা মনেও পড়বে না। জীবনের কাছে আব্বুর চাওয়া খুব কম। তবে সেই কম চাওয়ার মধ্যেও একটি জিনিস তিনি সত্যিই ভালোবাসেনÑগান। আব্বু একা একা হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করেন। ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথ কে তা জানতাম না, জানতাম রবীন্দ্র গান। এখনও কোনো বাংলা গান শুনলে আমরা বুঝতে পারি কোনটি রবীন্দ্রসঙ্গীত। আমরা ছোটবেলা থেকেই গান শুনেই বড় হয়েছি। গানের মানুষ বলেই হয়তো আমরা ইংরেজি গান শুনলেও আব্বু কখনও আপত্তি করেননি।

মনে পড়ে, আমরা যখন ছোট, তখন ঘুম ভাঙার আগেই আম্মু অফিসে চলে যেতেন। বিকেলে ফিরতেন। আব্বুই আমাদের স্কুলে নিয়ে যেতেন, নিয়ে আসতেন। সকালের নাশতাও তিনিই দিতেন। ছুটির দিনে বাড়িতে পরোটা আর আলুভাজি হতো। আমরা বলতামআব্বুর আলুভাজি অনেক পরে জেনেছি, আসলে আলুভাজি আম্মুই করতেন। 

আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে আব্বুর উদ্বেগ ছিল গভীর। সময়মতো বাড়ি না ফিরলে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। ছোটবেলা থেকেইআব্বুমানে অনেক কিছুতেনা’Ñ এটা ধরো না, ওটা করো না। আবারআব্বুমানে ছিল অনেক স্বাধীনতাও। স্কুলে যেতে ইচ্ছে করছে না? তাহলে আজ যেও না। কার্টুন দেখতে চাও? দেখো, তবে আম্মু ফেরার আগে হোমওয়ার্ক শেষ করতে হবে।

আমাদের চেনা কোমল মনের আব্বু আর মুক্তিযোদ্ধা আব্বুÑএই দুই মানুষকে একসঙ্গে কল্পনা করা আমাদের জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল।

যে বাবা সবসময় আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকতেন, তিনি কীভাবে সেই একই মানুষ, যিনি কিশোর বয়সে নিজের বাবাকে না জানিয়ে ভারতে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে গিয়েছিলেন

আব্বুকে জানিয়ে কোনো মিছিলে যাওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। অথচ এই মানুষই জানতেন কীভাবে গ্রেনেড ছুড়তে হয়। যুদ্ধের সময় যিনি একজন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দুঃসাহসিক অভিযানে অংশ নিয়েছেন, ঢাকার ডিআইটি ভবনে টেলিভিশন ভবনের ট্রান্সমিশন উড়িয়ে দেওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশন, গোপনেগেরিলাপত্রিকা প্রকাশ করেছেন। 

তাঁর মানে কি সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা একজন মানুষকে বদলে দেয়

দেশের জন্য নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে তাঁর দ্বিধা ছিল না। অথচ কখনও তার জন্য কোনো স্বীকৃতি বা প্রশংসা খোঁজেননি। হয়তো এই কারণেই তাঁর ত্যাগ আমাদের কাছে আরও বেশি মহান মূল্যবান বলে মনে হয়।

বছরের পর বছর ধরে আমরা তাঁর জীবনের গল্পের টুকরো টুকরো অংশ জেনেছি। বেশিরভাগ গল্পই আমরা শুনতাম বড়দের আড্ডায়, একের পর এক কাপ চায়ের ফাঁকে ফাঁকে। কখনো তা এসেছে পরোক্ষভাবেকোন সাক্ষাৎকার থেকে, আমাদের মা এবং অন্যদের লেখা থেকে। খুব কমই সেগুলো সরাসরি আব্বুর কাছ থেকে এসেছে। আর যখন এসেছে, তখনও তা ছিল একেবারে সাধারণ ভঙ্গিতে, কোনো নাটকীয়তা বা আত্মপ্রশংসা ছাড়াই।

আমাদের কাছে সেই গল্পগুলো ছিল অসাধারণ। সেগুলো ছিল এমন এক কিশোরের গল্প, যে পূর্ণবয়স্ক হওয়ার আগেই নিজের দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে নেমেছিল। আমাদের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা বাবা এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন, যা কল্পনা করা আমাদের জন্য কঠিন। যুদ্ধের মূল্য তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। মৃত্যু আর মানুষের কষ্ট, ধ্বংস, ভয় আর ক্ষতির সেই অভিজ্ঞতার ক্ষতচিহ্ন তিনি দীর্ঘদিন নিজের মধ্যে বহন করেছেন। কারণ যুদ্ধ কোনো মিথ নয়; যুদ্ধ এক নির্মম বাস্তবতা, যা একজন যোদ্ধা সারাজীবন নীরবে বয়ে বেড়ান।

তাঁর গল্পগুলোকে বীরত্বের গল্প হিসেবে বলা সহজ, এবং অনেক অর্থেই সেগুলো বীরত্বের গল্প। কিন্তু আমাদের মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছে বীরত্ব নয়, মানবিকতা। 

যুদ্ধ মানুষের মনে শরীরে এমন ক্ষত তৈরি করে, যার কিছু দেখা যায়, আবার কিছু দেখা যায় না। আব্বু কখনও যুদ্ধকে রোমাঞ্চকর বা গৌরবময় ঘটনা হিসেবে দেখেন না। তাঁর কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল ন্যায়সঙ্গত প্রয়োজনীয়। সেই প্রয়োজনে যুদ্ধে যাওয়াকেই তিনি একজন মানুষের জন্য গৌরবের বিষয় মনে করেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাওয়াকেই তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য বলে মনে করেন। 

শৈশবে আমরা মাঝে মাঝে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন করতাম। কখনও স্কুলের প্রজেক্টের জন্য, কখনও সেই অল্পবয়সী আব্বুকে কল্পনা করার জন্য। আব্বু নিজের চেয়ে বেশি বলতেন তাঁর মডেল স্কুলের বন্ধুদের কথাচৌদ্দপনেরো বছরের কিশোর, যারা কৈশোরের স্বাভাবিক জীবন পেছনে ফেলে বিপদ, ত্যাগ এবং সংগ্রামের পথে হেঁটেছে। যারা একসঙ্গে ঢাকা শহরে গেরিলা অপারেশনে অংশ নিয়েছিল। যাদের সাহসের উৎস ছিল বন্ধুত্ব, বিশ্বাস এবং অদম্য আত্মবিশ্বাস, যা কেবল কিশোর বয়সেই সম্ভব। 

যে মানুষটি আজও আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, তিনিই একসময় গোলাবারুদ বহন করতে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছিলেন। নির্যাতনের মুখেও সত্য বলেননি। ভয় পেয়ে যুদ্ধের মাঠে থেকে সরে যাননি।

এই বৈপরীত্য আমাদের অবাক করত, মুগ্ধ করত। আমাদের স্নেহময়, রক্ষাকবচের মতো বাবা আর নির্ভীক গেরিলা যোদ্ধাকে যেন দুই ভিন্ন মানুষ মনে হতো। কিন্তু বড় হতে হতে আমরা বুঝেছি, তাঁরা আসলে একই মানুষ।

যে ভালোবাসা তাঁকে আমাদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন করে, সেই ভালোবাসাই তাঁকে দেশের ভবিষ্যতের জন্য লড়তে বাধ্য করেছিল। যে দায়িত্ববোধ তাঁকে প্রতিদিন পরিবারের পাশে দাঁড় করায়, সেই একই দায়িত্ববোধ তাঁকে কিশোর বয়সে নিজের জীবনের চেয়ে বড় একটি আদর্শের জন্য নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

আমরা যখন কলেজে পড়ি, আমাদের বন্ধুরা যখন বাড়িতে আসত এবং জানত আব্বু মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তখন তাদের প্রতিক্রিয়াও আমাদের মতোই হতোÑবিস্ময়, কৌতূহল আর তাঁর মুখে গল্প শোনার আগ্রহ। কিন্তু আব্বু সেসব খুব হালকাভাবে বলতেন, কখনও প্রসঙ্গই বদলে দিতেন। তখন মনে হতো, দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একজন সাক্ষী মানুষ কেন কথা বলতে এত অনাগ্রহী?

এটা বুঝতে আমাদের অনেক বছর লেগেছে। তাঁর এই অনাগ্রহ কখনও ভান করা বিনয় ছিল না। বরং এটি ছিল তাঁর সহযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রকাশ, বিশেষ করে তাদের প্রতি, যারা আর কখনও বাড়ি ফিরে আসতে পারেননি। যুদ্ধ কখনও শুধু তাঁর গল্প ছিল না। এটি ছিল একটি জাতির সংগ্রাম, একটি প্রজন্মের আত্মত্যাগ, অসংখ্য মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে একটি দেশের জন্মের ইতিহাস।

আজ আমরা বুঝি, তাঁর নীরবতার ভেতরেই হয়তো তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা লুকিয়ে ছিল।

আব্বুর কাছ থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার যুদ্ধের গল্প নয়, বরং তাঁর জীবনÑযা মানুষের সেবা কল্যাণে নিবেদিত ছিল।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা জেনেছি, যুদ্ধের পরও মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা আব্বুর মধ্যে একই রকম ছিল। ছাত্রজীবনে তিনি থাইকাম্বোডিয়া সীমান্তের শরণার্থী শিবিরে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন, আর কর্মজীবনে বেছে নিয়েছিলেন ননপ্রফিট অর্গানাইজেশনে কাজ করার পথ।

আজ ফিরে তাকিয়ে বুঝি, আমরা রূপকথার গল্প শুনে বড় হইনি। গল্পগুলো আমাদের শিখিয়েছে যে, সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়, আর শুধু প্রশংসা বা গৌরব অর্জন নয়। সত্যিকারের সাহস হলো ভয়, অনিশ্চয়তা এবং হারানোর আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও যা করা প্রয়োজন, তা করে যাওয়া। আমরা দেখেছি একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প। আর সেখান থেকেই শিখেছি, সাহস শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়Ñমানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।

এই শিক্ষা আজও আমাদের পথ দেখায়। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর অর্জন নিয়ে অনেকেই কথা বলবেন। কিন্তু আমাদের কাছে তিনি প্রথমে এবং সবসময়ই আব্বু। আর সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য

Related Posts