মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইমাম বাবার সবচেয়ে বড় পরিচয় মুক্তিযোদ্ধা || অথৈ উর্মিলা ইমাম

কখনও ভেবে দেখেছেন, আপনার বাবা মা তাঁদের প্রথম জীবনে কেমন মানুষ ছিলেন? তাঁদের স্বপ্ন কী ছিল? কী ছিল তাঁদের আশাআকাক্সক্ষা? কোন অভিজ্ঞতাগুলো তাঁদের এমন স্নেহময় মানুষে পরিণত করেছিল, যাঁরা একদিন আমাদের লালনপালন করবেন? আমি সৌভাগ্যবান যে আমার বাবার জীবনের সেই অধ্যায় সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়েছি। তিনি আমার বাবা হওয়ার অনেক আগে থেকেই ছিলেন একজন শিল্পী। আমার শৈশবের সকালগুলো ভরে থাকত তাঁর কণ্ঠসাধনার সুরে, কবিতা আবৃত্তির ধ্বনিতে, এবং শিল্পসৃষ্টির নীরব মনোযোগে। আমি দেখেছি তাঁকে নানা মাধ্যমে শিল্পচর্চা করতেÑভাস্কর্য, তৈলচিত্র, ডিজিটাল ইলাস্ট্রেশন এবং সঙ্গীত। একাধিকবার তাঁর শিল্পসৃষ্টির অনুপ্রেরণা বামিউজহওয়ার সৌভাগ্যও আমার হয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি ভাবতে শুরু করলাম, তাঁর এই সৃজনশীলতার উৎস কোথায়? তাঁর গানের আবেগ কোথা থেকে আসে? তাঁর শিল্পের গল্পগুলোর পেছনে কী অনুপ্রেরণা কাজ করে? ধীরে ধীরে উপলব্ধি করলাম, এর উত্তর কেবল শিল্পের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। এর শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত। বাংলাদেশের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসায়। খুব অল্প বয়স থেকেই বাবা আমাকে তাঁর শৈশবের গল্প শুনিয়েছেন, শুনিয়েছেন সেই পথচলার কথা, যা তাঁকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন মুক্তিযোদ্ধায় পরিণত করেছিল। তিনি বলতেন সেই মানুষদের কথা, যাঁদের তিনি শ্রদ্ধা করতেন, যাঁদের হৃদয়ে মাতৃভূমির প্রতি ছিল অটল ভালোবাসা গভীর নিবেদন। তাঁর গল্পগুলোর মাধ্যমে আমি বুঝতে শিখেছিলাম যে দেশপ্রেম তাঁর কাছে কোনো বিমূর্ত ধারণা ছিল না, এটি ছিল তাঁর জীবনের চালিকাশক্তি। আমি সেই ছোট্ট গ্রামটিতে গিয়েছি, সিলেটের যে গ্রামে আমার বাবার বেড়ে ওঠা। তখন যেমন ছিল, আজও জীবন সেখানে অনেকটাই সরল। গ্রামের তরুণেরা খ্যাতি বা সম্পদের স্বপ্ন দেখত না। তারা বড় হতো পরিবার, সমাজ এবং তাদের জীবনধারণের ভিত্তি সেই মাটির সঙ্গে গভীর বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে। বস্তুগত প্রাচুর্য হয়তো ছিল না, কিন্তু ছিল দেশ মানুষের প্রতি অসীম ভালোবাসা এবং পারস্পরিক আত্মিক সংযোগ। বাবা প্রায়ই বলতেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল নিজের মাতৃভূমিকে রক্ষা করা এবং তার স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে অংশ নেওয়া। জীবনের সেই নিয়ামকগুলোতেই গড়ে উঠেছিল তাঁর সাহসিকতা এবং তাঁর শিল্পীসত্তা। যে অভিজ্ঞতাগুলো তাঁকে বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল, সেগুলোই তাঁর সৃজনশীল প্রকাশকে দিয়েছিল গভীরতা শক্তি। আজ যখন আমি তাঁর আঁকা ছবি দেখি, তাঁর গান শুনি, অথবা তাঁর প্রিয় কবিতার আবৃত্তি শুনি, তখন আর সেগুলোকে তাঁর অতীত থেকে আলাদা করে দেখি না। বরং সেগুলো তাঁর অতীতেরই প্রতিফলন। প্রতিটি তুলির আঁচড়, প্রতিটি সুর, প্রতিটি গল্প বহন করে সেই তরুণের স্মৃতি, যে নিজের দেশের ভবিষ্যতের ওপর গভীর বিশ্বাস রাখত এবং সেই ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত ছিল। অনেকের কাছে আমার বাবা একজন শিল্পী। কিন্তু আমার কাছে তিনি আরও বড় কিছু। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, যার দেশপ্রেম শুধু সেই দেশকেই রক্ষা করেনি, যার জন্য তিনি যুদ্ধ করেছিলেন, বরং গড়ে তুলেছেন তাঁর পরবর্তী জীবনের প্রতিটি অধ্যায়। তাঁর শিল্প তাঁর হৃদয়ের গল্প বলে, আর তাঁর মুক্তিযুদ্ধের অবদান বলে তাঁর চরিত্রের কথা। এই দুইয়ের সমন্বয়েই ফুটে ওঠে সেই মানুষটির পূর্ণ পরিচয়, যিনি আমার বাবা হওয়ার আগে ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, একজন শিল্পী, একজন দেশপ্রেমিক এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা। আর সেই মানুষটিকেই আমি আজ গভীর গর্বের সঙ্গে আমার বাবা বলে পরিচয় দিই।

Related Posts