বিশ^কাপের টিকিটের দাম নিয়ে নানা কথা

বিবিসি প্রতিবেদনঃ এবারই প্রথম বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বেড়ে ৪৮টি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ম্যাচ, সবচেয়ে বড় ভৌগোলিক বিস্তৃতি এবং সম্ভাব্য সর্বোচ্চ টেলিভিশন দর্শকসব মিলিয়ে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ।

ভ্যাঙ্কুভার থেকে মেক্সিকো সিটি পর্যন্ত বিস্তৃত এই আয়োজনের ভৌগোলিক পরিসরও নজিরবিহীন। চ্যাম্পিয়ন দলকে এমন দূরত্ব ভ্রমণ করতে হতে পারে, যা প্রায় পৃথিবীর ব্যাসের সমান।

তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় টিকিটের দাম। মার্কিন ডলারে ফাইনালের টিকিটের দাম বেড়ে পাঁচ অঙ্কে পৌঁছেছে। আকর্ষণীয় গ্রুপ ম্যাচের গড় টিকিটমূল্য প্রায় এক হাজার ডলার। তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের টিকিটও কয়েক ডলারের নিচে নয়।

এটি মূল্য নির্ধারণের নতুন এক পরীক্ষাও বটে।ডায়নামিক প্রাইসিংপদ্ধতিতে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও বাড়ে। সংগীতানুষ্ঠান বা কিছু ক্রীড়া আসরে আগে পদ্ধতি ব্যবহৃত হলেও এত বড় পরিসরে তা এবারই প্রথম দেখা গেল।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফুটবল লীগ বা এনএফএল মডেলে সাধারণত প্রতিটি আসন থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য থাকে। স্টেডিয়াম পূর্ণ হলো কি না, সেটি মুখ্য নয়; মূল লক্ষ্য থাকে সর্বোচ্চ আয় নিশ্চিত করা।

কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়াঙ্গনে টিকিট অনেক সময় বিলাসপণ্যের মতো মূল্য পায়। অনেক স্টেডিয়ামে সাধারণ আসনের পরিবর্তে গড়ে তোলা হয়েছে করপোরেট বক্স, আতিথেয়তা স্যুইট বিলাসবহুল লাউঞ্জ। এই মডেলে দর্শকসংখ্যার চেয়ে দর্শকপ্রতি আয় বেশি গুরুত্ব পায়। চলমান বিশ্বকাপেও মডেলটির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

ভবিষ্যতের ইঙ্গিত

এখন প্রশ্ন হলো, টিকিটের মূল্য নিয়ে ফিফা কি এমন এক সীমায় পৌঁছেছে, যেখানে এই পরীক্ষার স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় তৈরি হতে পারে?

আগামী ২০৩০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ হবে স্পেন, পর্তুগাল মরক্কোয়। অনেকের ধারণা, ওই অঞ্চলের সমর্থকেরা এমন মূল্যনীতি সহজে গ্রহণ করবেন না। ইউরোপে এখনো গ্যালারির আবেগ, ঐতিহ্য সাধারণ সমর্থকের উপস্থিতিকে ফুটবল সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করা হয়।

একই কারণে ব্রিটেন আয়ারল্যান্ড ২০২৮ সালে অনুষ্ঠেয় ইউরোর জন্য ধরনের মূল্যনীতি আগেভাগেই বাতিল করা হয়েছে।

এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মূল্য নির্ধারণে আরও বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করছে। ভবিষ্যতে টিকিটের দাম সবার জন্য এক না হতে পারে। ব্যক্তির তথ্য, আগ্রহ, কেনাকাটার অভ্যাস আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে আলাদা মূল্য নির্ধারণ করা হতে পারে।

অর্থাৎ ফিফার বর্তমান পরীক্ষা শুধু আজকের টিকিটমূল্য নিয়ে নয়; এটি ভবিষ্যতের এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত, যেখানে একই ম্যাচের জন্য দুজন মানুষকে ভিন্ন মূল্য পরিশোধ করতে হতে পারে।

কেআকৃতিরঅর্থনীতি

বিশ্বকাপে এখন যুক্তরাষ্ট্রের এনএফএল অর্থনৈতিক মডেলের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

ঋণমান নির্ণয়কারী প্রতিষ্ঠান মিডিসের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের ব্যয় মোট ভোক্তা ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যয় প্রায় স্থবির।

এই বৈষম্যমূলককেআকৃতির অর্থনীতি প্রতিফলন বিশ্বকাপের গ্যালারিতেও দেখা যেতে পারে। ডায়নামিক প্রাইসিং মূলত উচ্চ আয়ের দর্শকদের লক্ষ্য করেই পরিচালিত হয়। এর ফলে যে ফুটবল একসময় গণমানুষের সমর্থন, উন্মাদনা অভিজ্ঞতার অংশ ছিল, সেটি ধীরে ধীরে উচ্চমূল্যের বিশেষ অভিজ্ঞতায় রূপ নিতে পারে।

বিশ্বকাপকে ঘিরে ভোক্তা আস্থা বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাগতিক দেশ ভালো করলে ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব দেখা যায়, আর দল বিদায় নিলে শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

সাম্প্রতিক মার্কিন কর্মসংস্থানের তথ্য অনুযায়ী, আতিথেয়তা খাতে কয়েক হাজার নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে, যার সঙ্গে বিশ্বকাপের সম্পর্ক রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এত বড় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ এত ব্যাপক যে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব তুলনামূলক সীমিতই থাকবে।

অন্যদিকে আয়োজক শহরগুলো টিকিট বিক্রির অর্থ থেকে সরাসরি কোনো অংশ পাচ্ছে না; সেই অর্থ যাচ্ছে ফিফার কাছে। কিছু শহরে হোটেল বুকিংও প্রত্যাশার তুলনায় কম।

তবে বিশ্বকাপকে ঘিরে ভোক্তা আস্থা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের সময় গবেষণা সংস্থা কান্তার হিসাব করেছিল, ঘরে বসে খেলা দেখার জন্য মানুষ অতিরিক্ত কোটি ৩০ লাখবার সুপার মার্কেটে গিয়েছিল। যদিও গভীর রাতে ম্যাচ হলে উৎপাদনশীলতায় নেতিবাচক প্রভাবও পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে টিকিটের দাম নিয়ে ফিফার এই বিতর্কিত পরীক্ষা ভবিষ্যতে ফুটবলের অর্থনীতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। একই সঙ্গে এই অস্বাভাবিক বিশ্বকাপ হয়তো বৈশ্বিক অস্থিরতা কিছুটা কমানোর ক্ষেত্রও তৈরি করতে পারে।

অবশ্য সেটি নিশ্চিত নয়। তবু এমন আশাই ফুটবলকে বাঁচিয়ে রাখবে, তেমনটাই আশা করা যায়।

Related Posts