গদ্যের মোহ, মোহের গদ্য

এক. আমার জীবনের প্রথমপড়া বইটি ছিল একটি কিশোর উপন্যাস। সৌরিন্দ্র মোহন মুখোপাধ্যায়েরবাবলা আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। এই লেখক ছিলেন আমার অচেনা, বইটি পড়ে আমি কেঁদেছি। সেই বই পড়ার স্মৃতি নিয়ে আমার সাম্প্রতিক একটি লেখায় আমি এই লিখেছি যে, “উপন্যাসটির কাহিনী আমি বিস্মৃত হয়েছি। কিন্তু এটুকু আমার মনে আছে যে, এক দুপুরে কপাটবন্ধ ঘরে আমি আমার জীবনের প্রথম উপন্যাস পড়ছি আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছি; আমি উপন্যাসেরবাবলারমতোই নিঃসঙ্গ এক বালক, সেই বালকের মনোকষ্টের সঙ্গে আমি একাত্ম হয়েছি, আর আমি কী এক নিদারুণ একাকীত্বের কষ্টে হাবুডুবু খচ্ছি! কী কারণে এই নিঃসঙ্গতা, সেসব আমার কিছুই মনে নেই, শুধু কান্নার কথা মনে আছে। আমি স্পষ্ট অনুভব করে নিতে পারি, এই আমিই তখনও, মুহূর্মুহূ আনন্দ তীর্থ খুঁজে পাই জীবনের সব আয়োজনে, আমার কোনো কিছুতেই কোনো অপেক্ষা নেই; চারপাশের মানুষের পরিবেশের অঢেল আদরে আর প্রীতিতে আমার চরাচর সর্বদা প্রফুল্ল থাকে, আমার কটমটে দিবসটিও আনন্দ বিনা উপোস থাকে না। তবু কোন্ এক অলীক নিঃসঙ্গতার ভাবনায়, কেন আমি কেঁদে কেঁদে দুপুর ভাসিয়েছি, জানি না!”

সে সময়টায়, আমার বড় খালা, তখন তিনি কলেজের শেষভাগে, প্রায়ই পাবলিক লাইব্রেরি থেকে একটি বই আনতে বলতেন, বইতিথিডোর’, লেখক বুদ্ধদেব বসু। দুটো নামই আমার অচেনা। বইটি তখন আমি নানা কারণে খুঁজে পাইনি যে ওঁর হাতে তুলে দেব। বছর তিনেক পরে, আমি তখন ক্লাস নাইনে, আমাদের স্কুলের লাইব্রেরিতেতিথিডোরপেয়ে যাই আচমকা। যেন কোনো কিছুর পুনরাগমন, আমার ভেতর একটা কৌতুহল জাগল, এই বইটা বড়খালা কেন এক সময় আমার কাছে ঘন ঘন অনুরোধ করেছেন এনে দিতে! কৌতুহল বশে স্কুলের লাইব্রেরি থেকেতিথিডোরআমি বাসায় নিয়ে আসি।

তারপর টানা পাঁচ রাত জেগে জেগেতিথিডোরশেষ করি।বাবলাপড়ে কেঁদেছি, ‘তিথিডোরপড়ে, আমার জীবনের প্রথম, অচেনা একটি আত্মধ্বনির শিহরণ পাই। বুদ্ধদেব বসুর লেখা প্রথম উপন্যাসপাঠে অনুভব করি, আমার একলা জাগা ঘরে শিশির ঝরছে। আমি সেসব রাতগুলো অনিদ্রিত থেকেছি। আটকে রই বুদ্ধদেব বসুর শব্দে, বাক্যে, গল্পে, গল্পের চরিত্রে।

বুদ্ধদেবের গদ্যের মোহ আমি প্রতিক্ষণ তখন বহন করি। নতুন কায়দা লেখার, অচেনা স্টাইল গল্প বলার, কিন্তু অনুভব করি, হৃদয়েমমহয়ে বসছে। সেই শুরু, তারপর একের পর এক, অন্বেষণের পথে পথে প্রাপ্তিযোগ। পড়িমৌলিনাথ’, ‘সাড়া’, ‘কালো হাওয়া যে বয়সে যে লেখাটি না পড়লে জীবন থেকে বাদ পড়ে যায় যতসব প্রথম অনুভুতিঃ প্রখরকোমল মুখোমুখি হওয়ার ব্যাকুলবিষাদবিস্ময়; পড়ি, গল্পআমরা তিনজন’; পড়ছি আর অনুভব করছি, অসিত আর হিতাংশুর সঙ্গে আমিও মোনালিসার প্রেমে পড়ে গেছি; প্রেম কী কে জানে, কিন্তু তবু হৃদয়ের ডালপালা মেলে দিয়ে মোনালিসার মুখোমুখি বসে আছি; পড়ি, ‘আবছায়া’, যৌবন কী জানিনা, তবুও অনুভব করি, বেদনা কত মিষ্টি, কত বিচূর্ণসুন্দর হয় শিহরণ, আর, তা অকুণ্ঠ চিত্তে অতিশয় করে তুলি।

তারপর তাঁরউত্তর তিরিশ’, ‘কালের পুতুল’! যেন গদ্য সুষমার সমুদ্র মন্থন। তিরিশকূলের তো বটেই, উত্তর তিরিশেরকৃত্তিবাস কারিগররাও তাঁর গদ্যপাঠের এই প্রাঞ্জলতায় আচ্ছন্ন থেকেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, বুদ্ধদেবের মৃত্যুতে, ‘পরবর্তী কালের লেখকদের পক্ষে এটা এক বিরাট ক্ষতি। বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যাদর্শে কারুর বিশ্বাস থাক বা না থাক, যে বুদ্ধদেব বসুর সব রচনা পড়বে না, সে বাংলা ভাষার অনেক কিছুই শিখবে না। সে দরিদ্র থেকে যাবে।’ (আমাদের ঋণ)

এই যে আমাদের বিহ্বলতা তাঁর গদ্যপাঠে, তরতর করে আমরা পড়ে যাই, অবাক হই না, যখন তাঁর কন্যা মীনাক্ষী দত্ত বলেন, ‘প্রাতরাশের পর লেখার টেবিল, সকাল ৯টার মধ্যে। মাঝে এগারোটার সময় এক কাপ চা। একটায় উঠে একটু চেয়ারে বসতেন..দুপুরের খাওয়ার পরই বসে যেতেন..বাবার রুটিনটার উল্লেখ করলাম বোঝাতে যে, কতো পরিশ্রমী হতে হয়বুদ্ধদেব বসুহতে গেলে..’ (আমার বাবা বুদ্ধদেব বসু)

তারপর আরও আরও, কত কত আকাশে জ্বলজ্বল করছে অগুনতি সব গদ্যনক্ষত্র। এক জীবন বড়ই সামান্য এইসব নক্ষত্রের দিকে একটু, কেবল একটু চেয়ে থাকার; অসামান্য সব কীর্তি কত কত সাহিত্যজনের, নিঃশব্দ অভিমানে সেসব অবলুপ্ত হয়ে আছে, এই অনুভব করে, আত্মগ্লানি বাড়ে, আর শুধু এরই জন্য আরো অনেক জীবন প্রার্থনা করি। যখন বিভূতিভূষণেরআরণ্যক’— পড়ি, ‘দিন যতই যাইতে লাগিল, জঙ্গলের মোহ ততই আমাকে ক্রমে পাইয়া বসিল। এর নির্জনতা অপরাহ্নের সিঁদুরছড়ানো বনঝাউয়ের জঙ্গলের কি আকর্ষণ আছে বলিতে পারি নাআজকাল ক্রমশ মনে হয় এই দিগন্তব্যাপী বিশাল বনপ্রান্তর ছাড়িয়া, ইহার রোদপোড়া মাটির তাজা সুগন্ধ, এই স্বাধীনতা, এই মুক্তি ছাড়িয়া কলিকাতার গোলমালের মধ্যে আর ফিরিতে পারিবনা’— অবাক হই, কোন কৌশলে বিভূতি বাক্যটি চিরদিনের করে গেলেন! অমন অরণ্যচিত্র আমি না দেখেও যেন স্পষ্ট দেখি, মানুষের অন্তরাত্মার ভেতরে না ঢুকেও অনুভব করি মানুষের হৃদজমিনের খড়খুটো! সত্যজিত রায় (পথের পাঁচালি) এই প্রসঙ্গে শ্যাম বেনেগালকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, ওঁর গদ্য পড়ে আমাকে স্কেচ আঁকতে হয় না, আলাদা করে সংলাপ লিখতে হয়না! কী শক্তি বিভূতির; বিভা, কেবলি বিভা!

তারপর মানিক বন্দোপাধ্যায়ের গদ্য! ‘পুতুল নাচের ইতিকথায়তিনি লিখছেন, ‘পৃথিবীর বহু ঊর্ধে, স্তরে স্তরে সাজানো ভয়ের তলে প্রোথিত পৃথিবীর ঊর্ধে, একটা জঙ্গলাকীর্ণ মাটির টিলার শীর্ষে শশী হঠাৎ হারাইয়া গিয়াছে। সামনে রূপধরা অনন্ত; সীমাহীন ধারণাতীত কী যে তাহার চারিদিকে ঘনীভূত হইয়া সীমাবদ্ধ হইয়া আসিয়াছে শশী তাহা জানে না; কিন্তু আর কখনও নিঃশ্বাস সে লইতে পারিবে না।আর পড়ি, ‘কুসুম নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল, আপনার কাছে দাঁড়ালে আমার শরীর এমন করে কেন ছোটবাবু?’

শরীর! শরীর! তোমার মন নাই কুসুম?’

এই কয়েকটি শব্দে, বাক্যে আমাদের মনের চিরন্তন মর্মরধ্বনির অর্কেস্ট্রা, নিপুণ অসহায় বেদনায় নিঃশব্দে বেজে যায়। চেনা পৃথিবী আর চেনা মানুষকে বড়ই রহস্যময় লাগে; সব জটিল হয়ে ওঠে!

তারপর আরো আরো। এই রচনাবক্ষে সেসবের এক তিল তুলে ধরি তার উপায় নেই। গদ্যের শ্রেয়তা আছে, আবার পাঠকের নিজস্ব একটা ভাললাগাও আছে। এর মধ্যে কোনো একটা বিভাজন তৈরি করেও গদ্যভ্রমণের সূঁচাগ্রও স্পর্শ করা যায় না। ধীরে ধীরে সময় সুযোগ সহায় হলে, এই নিয়ে আরও কিছু বলার ইচ্ছা রইল।

দুই

কয়েকমাস আগে সাগুফতা শারমীনের একটি গদ্যরচনা পড়িফেইস বুকে লেখক আমার পরিচিত নন, মানে ওঁর লেখার সঙ্গে আমি, আমার অক্ষমতা স্বীকার করে বলছি, তেমন পরিচিত নই। তবে একদম অপরিচিত তাও বলা যাবে না। সুবিমল চক্রবর্তী, আমার কলেজকালের বন্ধুঅগ্রবীজনামের একটি ঢাউস সাময়িকপত্রের কয়েকজন সম্পাদকের একজন। ভাল এবং দুরূহ এই কাজটি এঁরা বেশ কয়েক বছর ধরে করে এসেছেন। তা কোনো একটি সংখ্যায় আমি সাগুফতা শারমীনের একটি লেখা পড়ি। লেখাটি আমার ভাল লাগে। সুবিমলকে আমি আমার ভাললাগার কথা জানাই। ব্যস এই পর্যন্তই। আমার অক্ষমতা এই যে, তার আর কোনো লেখা এর আগে আমি পড়িনি।

ফেইসবুকের এই লেখা পড়ে আমি মুগ্ধ হই। ফ্রেশ, নতুন ভাষা, নতুন স্বাদ। অন্যরকম। এরকম গদ্য সহজে মেলে না। একটা বিস্ময় খেলা করেছে গোটা লেখায়। মানে, এভাবেও চরাচরের সুখ দুঃখকে সকলের পাতে পাতে তুলে দিয়ে নিজের নিজের করে তোলা যায়! লেখক তার শ্রেয়তা নির্মাণ করেছেন তার মেধা মননে কল্পনায়। যেন একটা সুড়ঙ্গ থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসছে অভাবনীয় ভাবনা! আটপৌরে বস্তুর গৃহে ঋদ্ধমনের গেরস্তের প্রবেশ! বুকের অতল থেকে মানব জীবনের একটা চিরন্তন হৃদটানকে, দুমড়ে মুচড়ে ভেঙ্গে ভেঙ্গে, সুখের স্তবকে স্তবকে, লেখক নিপুণ কৌশলে স্থাপন করেছেন। শারমীন লিখছেন, “আমাদের ফ্রিজটা একটা সারকোফ্যাগাস, এখানে মমিফাইড হয়ে বহুকিছু রয়ে যায়।নাতিদীর্ঘ এই লেখাটির স্থান সংকুলান হবে না এই রচনাবক্ষে, গোটা লেখা তুলে ধরার অপারগতা প্রকাশ করছি। তা ফ্রিজ থেকে জিনিস কমিয়ে ফেলা হচ্ছে। এই পরিষ্কার করার প্রক্রিয়ায় এক একটি পুরনো জিনিসের নাম উল্লেখ করে সেসবের বর্তমান হালের বর্ণনা দিয়ে দিয়ে লেখক তার গদ্যে এগুচ্ছেন। লেখকের বাবা নিজ হাতে খুব যত্ন করে বাংলাদেশ থেকে তার মেয়েকে গুড়ের প্যাকেট দিয়েছিলেন মেয়ের বিদেশে ফেরার আগে। লেখক লিখছেন, “মোটা প্লাস্টিকের প্যাকেটটা খুললাম, ভেতর থেকে বের করলামআকরিকের ডেলার মত দেখতে, পাথরের মতো ঠান্ডা কঠিন মসৃণসামান্য কেলাসিত পাটালি গুড়, পাথরের মতোই তার ভঙ্গুর খাঁজে অশ্রুজলের মতো জমাট মিনারেল..কালো কয়লার রেখার মতো গলিত গুড়। আমার কঠিনেকোমলে অসমসত্ত মিশ্রণ বাবা যেন ডেলার মতো আমার হাতে গড়িয়ে এলো। কোথাও ফাঙ্গাস নেই, পুরনো জিনিষের বুড়োমানুষী গন্ধ নেই। হাঁড়িতে সামান্য জল দিয়ে গুড় গলতে দিলাম, গুড় গলে আর আমিও গলি। ঝর ঝর। গল গল। শিলা রাশি রাশি পড়িছে খসে,/ফুলিয়া ফুলিয়া ফেনিল সলিল/ গরজি উঠিছে দারুন রোষে। গুড় গলে যে হোকুসাইয়ের আঁকা সামুদ্রিক সেই উৎক্ষিপ্ত ঢেউয়ের মতো ফুলে ফেঁপে ওঠেতা কি আর আমি জানি! বলে ফোঁস ফোঁস, আমি ডাকিআব্বা আব্বা! এই প্রগাঢ় কালো তরল যেন পৃথিবীর শেষ প্রান্তের নদীরিভার স্টিক্স, ওপারে পাতাল, ওপারে বরযখ।

তিন

আমার আব্বাকে দেখি নায়েগ্রা জলপ্রপাতের প্রান্তে দাঁড়িয়ে বিস্ময় নিয়ে দেখছেন, জল পড়ছে অন্তহীন। জলের কণা বাতাসে, ঝাপটা আসছে চোখে মুখে, সারা শরীরে। তিনি ভিজে যাচ্ছেন। আমি পেছন থেকে ডাকি, আব্বা, আব্বা। আমার ডাকে তাঁর সাড়া নেই, একমনে তিনি জলপতনের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন! আবারও ডাকিআব্বা, আব্বা! আমাদের যেতে হবে, আসুন।

সেটা ছিল ১৯৮৩ সামার। আজো ওদিকটায় গেলে দেখি, আব্বা অনড়, কোনো তাড়া নেই ঘরে ফেরার! আমার সংসারবাউল আব্বা জলের, হাওয়ার আর প্রকৃতির মুগ্ধতার আদরে বিলীন হয়ে আছেন!

লং আইল্যান্ড, নিউইয়র্ক

জুন ১৪, ২০২৬

Related Posts