কাগজের ক্যানভাসে পৃথিবীর গল্প—১৪ কাগজের মুদ্রায় ফুটবল || আখতার আহমেদ রাশা
সবুজ মাঠের বুকে নব্বই মিনিটের যে চিরন্তন লড়াই কোটি মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে কখনো হাসায়, কখনো কাঁদায়Ñতা কেবল জয়—পরাজয়ের কোনো সাধারণ খেলা নয়, এ এক বৈশ্বিক জীবনের স্পন্দন আর সংস্কৃতির মেলবন্ধন। বিশ্বজুড়ে যখন ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা তুঙ্গে, তখন একজন কাগজের মুদ্রা সংগ্রাহক হিসেবে চোখ চলে যায় আমার অ্যালবামের বিশেষ কিছু নোটে। আজ পাঠকদের শোনাবো আমার সংগ্রহে থাকা রাশিয়া, কাতার, মরক্কো, মালদ্বীপ এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের পাঁচটি ভিন্ন নোটের গল্প। যেখানে কাগজের ক্যানভাসে বন্দি হয়ে আছে ফুটবলের একেকটি সোনালী ইতিহাস। সাধারণত বিভিন্ন দেশ তাদের নোটে ইতিহাস, ঐতিহ্য বা রাজনৈতিক মহানায়কদের স্থান দেয়। কিন্তু যখন কোনো দেশ তার রাষ্ট্রীয় মুদ্রায় ফুটবল বা কোনো ফুটবল মহাতারকাকে স্থান দেয়, তখন বুঝে নিতে হয় সেই জাতির ধমনীতে ফুটবল কীভাবে মিশে আছে।
২০১৮ সালের রাশিয়ার বিশ্বকাপের সময় দেশটির সেন্ট্রাল ব্যাংক যে বিশেষ ১০০ রুবল নোটটি প্রকাশ করে, তা কেবল একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের স্মারক নয়, বরং বিশ্ব মুদ্রার ইতিহাসেও এক বৈপ্লবিক মাইলফলক। এটি রাশিয়ার ইতিহাসে প্রথম সম্পূর্ণ পলিমার বা প্লাস্টিক ব্যাংকনোট। প্রচলিত নোটের মতো না বানিয়ে, এই নোটটি তৈরি করা হয়েছে উলম্ব বা খাড়া (ঠবৎঃরপধষ) বিন্যাসে, যা এর আধুনিকতাকে ফুটিয়ে তোলে। নোটটির সম্মুখভাগে স্থান পেয়েছেন ফুটবলের কিংবদন্তি সোভিয়েত গোলরক্ষক লেভ ইয়াশিন (খবা ণধংযরহ)—যাঁর শূন্যে ভেসে ডাইভ দিয়ে বল ঠেকানোর সেই চেনা দৃশ্যটি এখানে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর ঠিক নিচেই ফুটবল হাতে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে এক কিশোর। এই দুইয়ের মেলবন্ধনে মূলত ফুটবলের অতীত, ভবিষ্যৎ এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ার চিরন্তন ঐতিহ্যকে বোঝানো হয়েছে। নিখুঁতভাবে খেয়াল করলে দেখা যায়, নোটের ফুটবলে খোদাই করে লেখা রয়েছে লেভ ইয়াশিনের নাম। এছাড়া নোটটিতে একটি অত্যাধুনিক হলোগ্রাফিক ফিল্ম বা থ্রি—ডি ইমেজ ব্যবহার করা হয়েছে; আলোর বিপরীতে নোটটি সামান্য ঘোরালেই গোলপোস্টের জাল এবং বলের চমৎকার একটি অ্যানিমেশন চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ছিল ফুটবলের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। মধ্যপ্রাচ্যের বুকে প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই মহাযজ্ঞ কেবল মাঠের খেলায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা জায়গা করে নিয়েছে মুদ্রার ইতিহাসেও। এই ঐতিহাসিক আয়োজনকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে কাতার কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক রাজকীয় স্মারক নোট প্রকাশ করে। ফুটবল বিশ্বকাপের ৯২ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো কোনো নোটের ফেস ভেলু নির্ধারণ করা হয় ‘২২ রিয়াল’Ñযা অবধারিতভাবেই ২০২২ সালের সাথে এক সেতুবন্ধন তৈরি করে। পলিমারে তৈরি এই নোটটির ক্যানভাসে উঠে এসেছে বিশ্বকাপের দুই আইকনিক স্থাপনা। এর একপাশে রয়েছে বিশ্বকাপের ফাইনাল ভেন্যু সেই রাজকীয় ‘লুসাইল স্টেডিয়াম’, আর অন্যপাশে উদ্বোধনী ম্যাচের সাক্ষী ‘আল বায়েত স্টেডিয়াম’। ব্যাকগ্রাউন্ডের সূক্ষ¥ কারুকার্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কাতারের ঐতিহ্যবাহী ট্রফি এবং দেশটির সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। নোটটির আধুনিক সিকিউরিটি থ্রেড এবং আল্ট্রাভায়োলেট (টঠ) নকশা আলোর নিচে ধরলে চমৎকারভাবে জ্বলে ওঠে, যা সংগ্রাহকদের কাছে এর আকর্ষণ অনেক বাড়িয়ে দেয়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মরক্কোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ব্যাংক আল—মাগরিব’ ৩৫তম আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (অঋঈঙঘ ২০২৫) উদযাপন উপলক্ষে এক বিশেষ ১০০ দিরহামের স্মারক নোট ইস্যু করে। এই মুদ্রাটি মূলত মরক্কোর ফুটবল—উন্মাদনা এবং তাদের আধুনিক ক্রীড়া অবকাঠামোর এক অনন্য দলিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফুটবলের আঙিনায় মরক্কো যে অভাবনীয় জোয়ার এনেছে, বিশেষ করে ২০২২ সালের বিশ্বকাপে রূপকথার মতো সেমিফাইনাল যাত্রা এবং এই মহাদেশীয় আসরের সফল আয়োজনÑতারই এক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এই মুদ্রা। নোটটির সম্মুখভাগে রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের প্রতিকৃতির পাশে শোভা পাচ্ছে রাবাতের বিখ্যাত ‘প্রিন্স মৌলে আবদেল্লাহ স্পোর্টস কমপ্লেক্স’ এবং আফ্রিকার মানচিত্র। তবে এর আসল নান্দনিকতা লুকিয়ে আছে নোটের উল্টো পিঠে। সেখানে স্টেডিয়ামের ক্যানভাসে সিলুয়েট বা ছায়ামূর্তিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বল পায়ে ফুটবলারদের এক জীবন্ত ও ছুটন্ত অ্যাকশন। এর সাথে ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকা তারকারাজি এবং মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী জ্যামিতিক কারুকাজ (অৎধনবংয়ঁব) নোটটিকে দিয়েছে এক অনন্য শৈল্পিক পূর্ণতা।
বিশ্বকাপ বা মহাদেশীয় কাপের বাইরে একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্রের ফুটবল প্রেম কেমন হতে পারে, তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ মালদ্বীপের ২০১৭ সালের ৫ রুফিয়ার পলিমার নোটটি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মালদ্বীপের ফুটবল উন্মাদনা বরাবরই একটু আলাদা। কোনো বিশেষ টুর্নামেন্ট ছাড়াই, তারা তাদের নিয়মিত মুদ্রা সিরিজের অংশ হিসেবে ফুটবলের ছবি ব্যবহার করেছে। নোটটির সম্মুখভাগে মালদ্বীপের মানুষের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পাশাপাশি খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ফুটবল খেলার দৃশ্য। সেখানে স্থানীয় যুবকদের ফুটবল খেলার একটি প্রাণবন্ত ছবি রয়েছে। একটি দেশের মূলধারার মুদ্রায় ফুটবলকে এভাবে সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ হিসেবে তুলে ধরা সত্যিই বিরল এবং প্রশংসনীয়।
বিশ্বকাপ বা কোনো মহাদেশীয় টুর্নামেন্টের স্মারক গন্ডি ছাড়িয়ে, একজন একক ফুটবলারের জাদুকরী কীর্তিকে রাষ্ট্রীয় মুদ্রায় অমর করে রাখার এক কালজয়ী উদাহরণ রয়েছে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ‘উলস্টার ব্যাংক’ কর্তৃক ইস্যুকৃত ৫ পাউন্ডের বিশেষ স্মারক নোটটিতে। ফুটবল মাঠের সবুজ ক্যানভাসে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই কিংবদন্তি রাইট উইঙ্গার জর্জ বেস্ট ছিলেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক। তাঁর অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং, ক্ষিপ্রতা এবং দুই পায়ে নিখুঁত বল নিয়ন্ত্রণের জাদুতে পরাস্ত হতো বিশ্বের বাঘা বাঘা ডিফেন্ডার। পেলের মতো মহাতারকাও যাকে সর্বকালের সেরা বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। ফুটবলের পাশাপাশি রকস্টারের মতো জীবনযাপন ও স্টাইল তাঁকে পপ কালচারের আইকন হিসেবেও পরিচিত করেছিল। এই সেরা ফুটবল তারকাকে সম্মান জানাতেই ২০০৬ সালের নভেম্বর মাসে তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে এই নোটটি বাজারে ছাড়া হয়। তিনিই বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার, যাঁর ছবি যুক্তরাজ্যের কোনো ব্যাংক নোটে স্থান পাওয়ার গৌরব অর্জন করে। সীমিত সংস্করণের এই নোটটির সম্মুখভাগে জর্জ বেস্টের দুটি আইকনিক রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছেÑএকটি উত্তর আয়ারল্যান্ডের জাতীয় জার্সিতে এবং অন্যটি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ঐতিহ্যবাহী লাল জার্সিতে বল পায়ে ড্রিবলিংয়ের সেই চিরচেনা ভঙ্গিমায়। আর নোটের বিপরীত পিঠে স্থান পেয়েছে তাঁর বর্ণিল ক্যারিয়ারের সোনালী মুহূর্তগুলোর এক নান্দনিক কোলাজ। মাত্র দশ লাখ কপি মুদ্রিত হওয়া এই নোটটি ছাড়ার সাথে সাথেই বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমী এবং সংগ্রাহকদের মাঝে রীতিমতো হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। মাঠ মাতানো এক মহানায়কের প্রতি কাগজের মুদ্রার এই রাজকীয় শ্রদ্ধা ফুটবল ও সংস্কৃতির চমৎকার মেলবন্ধন। আর একজন সংগ্রাহক হিসেবে এই ঐতিহাসিক নোটটি নিজের অ্যালবামে যুক্ত করতে পারা আমার জন্য পরম তৃপ্তির।
রাশিয়ার প্লাস্টিক নোটে কিংবদন্তি লেভ ইয়াশিনের অবিস্মরণীয় ডাইভ কিংবা উত্তর আয়ারল্যান্ডের নোটে জর্জ বেস্টের জাদুকরী ড্রিবলিং থেকে শুরু করে, কাতারের ২২ রিয়ালের আধুনিক স্টেডিয়াম, কিংবা মরক্কোর চোখে আফ্রিকার ফুটবল রূপকথা আর মালদ্বীপের সাধারণ মানুষের নিটোল ফুটবল প্রেমÑএই পাঁচ টুকরো পলিমার আর কাগজের মুদ্রা আসলে একটি চিরন্তন সত্যকেই বারবার মনে করিয়ে দেয়। ফুটবল কেবল মাঠের কোনো খেলা নয়— এটি সীমানা পেরিয়ে, ভাষা ও সংস্কৃতির গন্ডি ডিঙিয়ে গোটা বিশ্বকে এক সুতোয় বাঁধার এক অদ্ভুত জাদুমন্ত্র।
বর্তমানে চোখের সামনে যখন আরেকটি বিশ্বকাপের মহোৎসব চলছে, চারদিকের দেওয়ালে দেওয়ালে যখন প্রিয় দলের পতাকা আর মানুষের উন্মাদনাÑতখন আমার সংগ্রহে থাকা এই স্মারকগুলো যেন আরও বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই নোটগুলো যখনই আমি হাতে নিই, কান পাতলে যেন টিভির পর্দার ধারাভাষ্য ছাড়িয়ে শুনতে পাই গ্যালারি কাঁপানো লাখো দর্শকের সেই চিরচেনা অবিরাম উল্লাস। মুদ্রার ছোট্ট ক্যানভাসে ফুটবলের এই ইতিহাস বেঁচে থাকুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, আর বর্তমানের এই ফুটবল বসন্তও কোনো না কোনো দেশের মুদ্রায় এভাবেই অমর হয়ে থাকুক।
