৩০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে ইরান

রয়টার্স আলজাজিরাঃ যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মধ্যে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে সমঝোতা স্মারকে সই করেছেন দুই দেশের প্রেসিডেন্ট। ১৪ দফা সমঝোতার এই স্মারককেঅন্তর্বর্তী চুক্তিবলা হচ্ছে। এখন চূড়ান্ত একটি চুক্তির জন্য সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আলোচনায় বসবেন ওয়াশিংটন তেহরানের প্রতিনিধিরা। আলোচনা চলার কথা ৬০ দিন পর্যন্ত। যদিও শান্তির দেখা শেষ পর্যন্ত পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

গত বুধবার সই হওয়া এই স্মারককেঐতিহাসিকবলেছে ইরান। দেশটি ইতিবাচক থাকলেও শঙ্কা যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের দিক দিয়ে। স্মারকে সই করার পরই হুমকি আসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছ থেকে। সমঝোতার শর্ত মেনে না চললে ইরানে হামলা করা হবে বলে জানান তিনি। আর সমঝোতা স্মারকের বিপরীতে গিয়ে লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল।

শঙ্কা থাকলেও ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই স্মারকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর সবচেয়ে বড় ঘটনা। যুদ্ধে সাত হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা। ছাড়া যুদ্ধের কারণে দেখা দিয়েছে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা। এর ধাক্কা বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের ওপর পড়েছে।

যদিও সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পর পরিস্থিতি ভালো হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সমঝোতা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিছু জাহাজ পারাপারের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ফ্রান্সের পতাকাবাহী একটি জাহাজ রয়েছে। ইরানের ১১টি জাহাজও দেশটির বন্দর ছেড়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়েছে। এদিন তেলের দামও প্রতি ব্যারেলে কমে ৭৯ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।

এই পরিস্থিতিতে চুক্তি টেকসই করার বড় দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের বলে মনে করেন তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোস্তাফা কোসচেশম। তাঁর শঙ্কাও ইসরাইলকে নিয়ে। আলজাজিরাকে তিনি বলেন, লেবাননে যদি ইসরাইল হামলা চালিয়ে যায়, তাহলে ইরান চুক্তি থেকে সরে যেতে পারে। ইসরাইলকে সামলে রাখার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই পড়ে।

সমঝোতা সহজ ছিল না

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করেনি যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল। লক্ষ্য হিসেবে কখনো ইরানের সরকার পতন, কখনো দেশটির পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসএমনকিসভ্যতা ধ্বংসেরকথাও বলেছেন দুই দেশের নেতারা। তবে এপ্রিল যুদ্ধবিরতি শুরুর আগপর্যন্ত প্রায় ছয় সপ্তাহ হামলা চালিয়ে সেসব লক্ষ্যের একটিও অর্জন করতে পারেননি তাঁরা।

এখন যুক্তরাষ্ট্র ইরান যে চুক্তিতে পৌঁছেছে, তাতেও ট্রাম্পের অর্জন খুব কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যেমন সমঝোতা স্মারকে ইরানের সরকার পরিবর্তনের প্রসঙ্গ নেই। ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে নিতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প। তেহরান বিষয়টি চুক্তিতে যুক্ত করতে রাজি হয়নি। হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ও চুক্তিতে আসেনি।

উল্টো এই সমঝোতা থেকে ইরান যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় কিছু সুবিধা করে নিতে পেরেছে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। বিদেশে জব্দ থাকা শত শত কোটি ডলারের অর্থ ছাড় পেতে চলেছে ইরান। যুদ্ধপরবর্তী ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩০ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ পাচ্ছে দেশটি। অবাক করা বিষয় হলো, স্মারকে সইয়ের পর ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র না থাকাকিছুটা অন্যায্য

সব মিলিয়ে এই সমঝোতা স্মারকে সই করাসহজ ছিল নাবলে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। তাঁর কথা ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ভার্সাই প্রাসাদে বুধবার স্মারকে সই করার সময়ের। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করার চুক্তি এই প্রাসাদেই হয়েছিল। স্মারকে সইয়ের পর এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প আবার বলেন, ‘ইরান যদি চুক্তি লঙ্ঘন করে, তাহলে আমরা ভয়াবহ বোমা হামলা চালাব।

ইরান স্বাধীনতা বিক্রি করেনি

১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কোনো চুক্তিতে সই করলেন। বিপ্লবপরবর্তী সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক সব সময়ই ছিল অবিশ্বাসে ঘেরা। হয়তো কারণেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা হওয়া বিষয়গুলো মেনে চলছে কি না, তা ইরান কঠোরভাবে নজরদারি করবে।

ইরানের গণমাধ্যমে গালিবাফের ভাষ্য, ওয়াশিংটন যদি নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে তেহরানও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে না। ছাড়া লেবাননে হামলা না চালাতে ইসরাইলকে বাধ্য করাও যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের বক্তব্য হলোসমঝোতা স্মারক এটাই দেখিয়েছে যে ইরান কোনোহুমকি বা চাপের কাছে নিজেদের মর্যাদা স্বাধীনতা বিক্রি করেনি

আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুতের শিক্ষক রামি খুরি আলজাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প বুঝতে পেরেছেন, ইসরাইলের অতিরিক্ত সামরিক আগ্রহের কারণে তিনি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তবে এখন বুঝতে পেরেছেন যে এটি ভুল ছিল। তাই সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে, ইসরাইলকেও নিয়ন্ত্রণে আনবে। তবে তা এত দ্রুত ঘটবে না।

Related Posts