যা দেখেছি যা বুঝেছি—১৬ || মনিরুল ইসলাম

মানবজন্মদিবস

কিছুটা বড় হয়ে মানুষ সামাজিকতায় জন্মলাভ করে, যখন সে কোনো এক গোষ্ঠীর সদস্য হয়ে সৌজন্যবোধ পারস্পরিকতা সহযোগিতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখে। নিজেকে প্রকাশ করার জন্য সে সমাজের অন্য সদস্যদের সামনে সাংস্কৃতিক জন্মলাভেরও চেষ্টা করে। তাই সে সাহিত্য, কলা, শিল্প, ধর্ম, ফ্যাশন, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদির আশ্রয় নেয়। পরিণত বয়সে প্রতিষ্ঠা, প্রতিপত্তি, প্রভাববলয় সম্মান বৃদ্ধির জন্য সে অর্থসময়চিন্তা ব্যয় করে। সুখ্যাতি, লিগাসি, অমরত্ব, পরকাল ইত্যাদি চিন্তা করে সে জীবনসায়াহ্নে আরেকবার নিজেকে আবিষ্কার করে। 

জীবনের কোনো এক সময়ে, সাধারণত সর্বশেষ ধাপে এসে, মানুষ আধ্যাত্মিকতায় জন্মলাভ করে। চারদিকের জরা মৃত্যু কষ্ট কান্না দেখে এবং নিজের আসন্ন জীবনাবসান অনুধাবন করে সেভাল মানুষহওয়ার চেষ্টা করে। কৃত অন্যায়গুলোর ক্ষতিপূরণ হিসাবে এবং আত্মসান্ত্বনাস্বরূপ ধর্মকর্ম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তার অন্যায় অন্যরা না দেখলেও সে নিজে দেখেছে, বুঝেছে। তাই নিজের কাছে সমাজের চোখে পরিশুদ্ধ হতে চায়, ঈশ্বরতুষ্টি স্বর্গলাভের আশায়সৎকর্মেউৎসাহবোধ করে। কারণে একই মানুষ ধর্মাচার পালন করলেও অধর্মের কাজ করতে তেমনটা দ্বিধান্বিত হয় না। প্রার্থনায় বসে স্বর্গলাভের জন্য কাঁদে, সংসারে এসে পাপাচারে লিপ্ত হয়।

মানুষ প্রায়ই বলে, আমি প্রতিদিন শিখি। আসলে সে প্রতিদিনই নতুন করে জন্মলাভ করে। দুঃখ বিরহ বঞ্চনা লাঞ্ছনা শোক সন্তাপে প্রতিদিন সে মৃত্যুকেও বরণ করে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জন্ম এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মৃত্যুর সিঁড়ি পার হয়ে সে তার ঘটনাবহুল জীবন শেষ করে। তাই এক জীবনে মানবজন্ম মানবমৃত্যু একটি নয়, দুটি নয়একাধিক, বহুবিধ, বিবিধ।

সময়ের সাথে মানুষ, সমাজ পরিবেশ যতবেশি জটিল হতে থাকবে, একজন মানুষের জন্মমৃত্যুর সংখ্যাও ততবেশি বাড়তে থাকবে। যার যতবেশি জন্মলাভ হবে, সেই জটিল সমাজে সে ততবেশি প্রতিষ্ঠালাভ করতে পারবে। মৃত্যুর আগে যত বেশিবার সে মরবে, তার দুর্দশা তত বাড়বে। দুর্ভাগ্য যাদের, মৃত্যুর আগে তারা অসংখ্যবার মরে। প্রতিদিন বেঁচে থেকে পলে পলে মরে প্রতিদিন।

ধর্ম বিজ্ঞান নিয়ে মানবচরিত্রের এই যে বৈপরীত্য দ্বৈততা দ্বিধাদ্বন্দ্ব, তা থেকে আমি মুক্ত হতে পারি না। বিবর্তনবাদের মাধ্যমে মানবজন্মের ইতিহাস যতই বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তিপূর্ণ হোক, গ্রেট এপস্ এবং আধুনিক পূর্ণমানবএর মধ্যে কোথাও একটা গরংংরহম খরহশ আছে, যাকে আমি বলিঈশ্বরের সুনিপুণ হাত’, যা দিয়ে তিনি এই অপূর্ব অতুলনীয় অদম্যমানুষপ্রাণীসৃষ্টি করেছেন। 

অনস্বীকার্য যে, মানবজন্ম এক সার্থক ঘটনা। আমাকে সৃষ্টি করে ঈশ্বর সার্থক, আমাকে জন্ম দিয়ে পিতামাতা সার্থক। বেঁচে থেকে ব্যক্তি আমিও সার্থক। যদিও অসহ্য দুঃখক্ষণে অথবা আবেগের তুঙ্গে বলে উঠি করুণস্বরে: হে ঈশ্বর, তুমি কেন আমাকে সৃষ্টি করে পৃথিবীতে পাঠালে? অনিন্দ্যের জন্মদিনে আমি পিতা স্বীকার করি: বাবারে, পৃথিবী সত্যি সুন্দর। তুই যে কেন এমন সুন্দর পৃথিবী না দেখে চলে গেলি, আমি এখন কি করে তা দেখি একা? প্রবোধ দেয় কেউ: সবাই যাবে, আগে আর পরে, একই কথা। তবে আগে কেন, পরে নয় কেন? একথার জবাব কেউ দেয় না রে বাবা।

প্রত্যেক জিনিসের জন্মতেই তার মৃত্যুর কারণ নিহিত থাকে অর্থাৎ জন্ম বা সৃষ্টিই মৃত্যু বা ধ্বংসের বার্তা নিয়ে আসে। যেদিন এইমানুষপ্রজাতি উদ্ভব হল, সেদিন তার অবলুপ্তির ক্ষণগণনাও শুরু হয়ে গেছে। তবে অভূতপূর্বভাবে অগ্রসরমান এই প্রাণীটির বিলুপ্তি কখন কিভাবে শুরু হবে, নাকি আকস্মিক হবে, সেকথা বলতে না পারলেও আমি নিশ্চিত যে মানবজাতির বিলুপ্তি একদিন হবেই। কারণ মাত্র ১০ হাজার বছরে এই একটি প্রজাতি অন্য সহ¯্রকোটি প্রজাতিকে পেছনে ফেলে পৃথিবীকে যেভাবে পাল্টিয়ে দিচ্ছে তা কোনোক্রমেই সীমাহীনভাবে অনন্তকাল অব্যাহত থাকতে পারে না। সব প্রজাতি যদি একে একে বিলুপ্ত হতে পারে, মানুষও তাই হবে একদিন। সব তলিয়ে যাচ্ছে মহাকালের মহাে¯্রাতে, মানুষের পালা কবে আসবে, কে বলতে পারে? তবে আমার আপনার পালা আসবে শীঘ্রই, কারণ আমরা জন্ম নিয়েই মৃত্যুর সারিতে এসে দাঁড়িয়েছি।

কৃষিপূর্ব শিকারযুগে ১২ হাজার পূর্বে যখন আফ্রিকা থেকে যাযাবর মানুষপ্রাণী পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের সংখ্যা ছিল ৩০ লক্ষ। বৃদ্ধি পেয়ে খ্রিস্টাব্দে হল ৩০ কোটি, ১৯০০ সালে ১৬০ কোটি এবং ২০০০ সালে ৬০০ কোটি। বর্তমানে প্রতি মিনিটে বাড়ছে ১৪৫ জন মানুষ, বছরে . কোটি। জন্মের পর গত ৪৫৪ কোটি বছরে পৃথিবীর আয়তন বাড়েনি, এই ক্রমবর্ধমান মানবসন্তান তারপর কোথায় কোন নতুন মহাদেশে যাবে? যে প্রাণীটি মাত্র ১০ হাজার বছর আগে গৃহনির্মাণ, ১২৫ বছর আগে আকাশে ওড়া এবং ৪০ বছর আগে ইন্টারনেট শিখল, এমন দ্রুতবেগে যার ক্রমবিকাশ, আগামী ১০০ বা ৫০০ বছরে এই মানুষটির কী হবে

সমস্যা হচ্ছে সর্বভুক এই প্রাণীটি সব খায়Ñযেন পৃথিবী নামক গ্রহটিকে গোগ্রাসে খেয়ে শেষ করার প্রতিযোগিতা চলছে। এই একটি প্রাণীর আরামআয়েশের জন্য পৃথিবীর সকল সম্পদপ্রাণপ্রাণীকে তুচ্ছজ্ঞানে বিনাশ করা হচ্ছে। ভোগের বিস্তৃতি নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধ্বংসাত্মক পর্যায়ে পেঁৗছেছে। এই কলির কালে শুধু সৃষ্টির নয়, ধ্বংসেরও জয় হয়Ñঅন্যায় অসত্য অত্যাচারের জয় হয়। যাক, আজ শুধু জন্মেরই জয় হোক। অনিন্দ্যের জন্মদিনে সৃষ্টির কথা দিয়েই লেখা শেষ করি। পাগল আমি, মৃত্যু যাকে মুছে দিয়েছে, তার করি জন্মের জয়গান!

পৃথিবীতে এতদিবসপালন করা হয়, মহাবিশ্বে মানব জন্মজয়ন্তী পালনের জন্য একটাবিশ্ব মানবজন্ম দিবসথাকলে ভাল হত। . লক্ষ বছর আগে প্রথম যে মানুষটির জন্ম হয়েছিল, তার রক্তপ্রবাহ নিশ্চয় অনিন্দ্যের মধ্যেও ছিল। সেদিনকার সেই দিনটার কথা যেহেতু আজ আর কেউ বলতে পারছে না, আপাতত ২৫ এপ্রিল হোক সবার জন্য শুভ মানবজন্ম দিবস। প্রাণ যদি চিরপ্রবাহমান হয়, আত্মা যদি অমর হয়, যে মৃত্যুহীন প্রাণআত্মা নিয়ে অনিন্দ্য জন্মেছিল, পৃথিবীতে সেই প্রাণাত্মার শুভাগমনদিন তো পালন করতে পারি। আত্মার মতো আমার ইচ্ছাটাও যেন অবিনাশী, তাই যেকোনো যুক্তিতে অনিন্দ্যকে বাঁচিয়ে রাখার এইটুকু ইচ্ছা প্রকাশ করে গেলাম। অনিন্দ্যের জন্মই তার গৌরব, তার অনন্ত অস্তিত্বের স্বাক্ষর। তার জন্মের মহিমায় মৃত্যু হোক লজ্জিত পরাভূত।

Related Posts