মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল হাসান কিসলু আমার বাবা দেশপ্রেমের প্রতীক || সৌমিক হাসান
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গর্বের বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আমার বাবা। তিনি আমার বাবা তো বটেই, তার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন মুক্তিযোদ্ধা। যখনই আমি তাঁর জীবনের গল্প শুনি, তখন আমার মনে হয় আমি যেন ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তাঁর সাহস, ত্যাগ এবং দেশপ্রেম আমাকে আজও অনুপ্রাণিত করে। আমি যেমন তাঁর জন্য গর্বিত, তেমনি গর্বিত আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের জন্য। আমার বাবার নাম জিয়াউল হাসান কিসলু।
১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, তখন আমার বাবার বয়স ছিল মাত্র ষোল বছর। আজকের দিনে ষোল বছরের একজন কিশোরকে আমরা স্কুল, বন্ধু কিংবা ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখি। কিন্তু আমার বাবার প্রজন্মের অনেক তরুণের মতো তিনিও এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা এবং দেশের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা তাঁকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করেছিল।
তিনি পরিবারের কাউকে কিছু না বলে বাড়ি (হোসনাবাদ) থেকে বেরিয়ে পড়েন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ভারতে পৌঁছে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেওয়া। সেই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। দীর্ঘ পথ তাঁকে কখনো নৌকায় কখনো হেঁটে অতিক্রম করতে হয়েছে। প্রতিটি মুহূর্তে ছিল পাকিস্তানি সৈনিক ও রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ার ভয়, মৃত্যুর আশঙ্কা এবং অনিশ্চয়তা। প্রায় সাত দিন ধরে নানা কষ্ট সহ্য করে তিনি ভারতের সীমান্তে (যশোরের বাগদা) পৌঁছান। একজন ষোল বছরের কিশোরের জন্য এই যাত্রা ছিল অসম্ভব সাহসিকতার।
ভারতে পৌঁছানোর পর তাঁকে কিছুদিন পরে পাঠানো হয় বিহারের চাকুলিয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। সেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তিনি গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তাঁদের প্রশিক্ষক প্রধান ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা, যার নাম ছিল ক্যাপ্টেন তারা সিং। বাবার মুখে শোনা সেই সময়ের একটি ঘটনা আজও আমার মনে গভীর ছাপ ফেলে। প্রশিক্ষণের সময় তাঁকে একটি এসএলআর (সেল্ফ—লোডিং রাইফেল) দেওয়া হয়েছিল। রাইফেলটি এত বড় ও ভারী ছিল যে সেটি বহন করা বাবার পক্ষে কিছুটা কষ্টকরই ছিলো। সকালে পিটি করার সময় শিখ প্রশিক্ষক নাকি তাঁকে বলতেন, ‘বাচ্চে, তোমারা রাইফেল হামকো দো’। বিষয়টি নিয়ে তারা সিং প্রায়ই মজা করতেন। একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধার হাতে বিশাল সেই রাইফেলের দৃশ্য হয়তো প্রশিক্ষণ শিবিরের অনেকের কাছেই স্মরণীয় ছিল। এই ছোট্ট ঘটনাটি যুদ্ধের কঠিন বাস্তবতার মাঝেও মানবিকতা এবং একটি সুন্দর স্মৃতি হয়ে আছে।
চাকুলিয়ায় প্রায় দুই মাসের কঠোর প্রশিক্ষণের পর তিনি আবার বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হন। সীমান্ত অতিক্রম করেন সাতক্ষীরা দিয়ে এবং হেঁটে হেঁটে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা একসাথে দেশে প্রবেশ করেন। দেশে ফিরে এরপর তিনি যোগ দেন তাঁর এলাকার (গৌরনদী, বরিশাল) মুক্তিবাহিনীতে। তাঁর যুদ্ধক্ষেত্র ছিল ৯ নম্বর সেক্টর, যার অধিনায়ক ছিলেন মেজর এম. এ. জলিল।
দেশের স্বাধীনতার জন্য আমার বাবা অস্ত্র হাতে লড়াই করেছেন, জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিজয়ের স্বপ্ন বুকে ধারণ করে যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন।
আমি যখন ভাবি যে মাত্র ষোল বছর বয়সে একজন মানুষ এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তখন বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যাই। তিনি নিজের নিরাপত্তা, আরাম কিংবা ভবিষ্যতের কথা ভাবেননি। তিনি ভেবেছিলেন দেশের কথা। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ব্যক্তিগত স্বার্থকে ত্যাগ করতে হয়। সেই বিশ্বাসই তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে গিয়েছিল।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জাতির আত্মপ্রকাশের সংগ্রাম। আমার বাবা সেই সংগ্রামের একজন গর্বিত অংশ ছিলেন। তাঁর মতো হাজার হাজার তরুণের আত্মত্যাগ, সাহস এবং দৃঢ়তার ফলেই আমরা আজ একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। যখন আমি বাংলাদেশের পতাকা দেখি, জাতীয় সঙ্গীত শুনি কিংবা স্বাধীনতার ইতিহাস পড়ি, তখন আমার বাবার কথা মনে পড়ে। মনে হয়, এই স্বাধীনতার পেছনে তাঁরও একটি অংশ রয়েছে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিনি অস্ত্রের পথ ছেড়ে জ্ঞানের পথে হাঁটেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা থেকে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক। পরবর্তীকালে তিনি কলেজের শিক্ষার্থীদের বাংলা সাহিত্য পড়াতে শুরু করেন। আমি প্রায়ই ভাবি, একজন মানুষের জীবনে এর চেয়ে সুন্দর রূপান্তর আর কী হতে পারে? যে মানুষ একসময় দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য অস্ত্র ধারণ করেছিলেন, সেই মানুষই পরে দেশের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বাবার জন্য আমি নিজেকে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মনে করি। তাঁর সঙ্গে সময় কাটানো, তাঁর গল্প শোনা এবং তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে শেখা আমার জীবনের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ। আমি তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসি এবং শ্রদ্ধা করি। তাঁর উপস্থিতি আমাকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা কোনো সহজে অর্জিত উপহার নয়; এটি অসংখ্য মানুষের ত্যাগ ও সংগ্রামের ফল।
আমার বাবা আমার কাছে শুধু একজন অভিভাবক নন। তিনি সাহসের প্রতীক, দেশপ্রেমের প্রতীক এবং অধ্যবসায়ের প্রতীক। তাঁর জীবনের গল্প আমাকে গর্বিত করে, অনুপ্রাণিত করে এবং আমার শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমি গর্বিত যে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। আমি গর্বিত যে আমার বাবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। আর আমি গর্বিত যে তিনি আজও আমাদের মাঝে আছেনÑএকজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন শিক্ষক এবং আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হিসেবে।
