উন্নয়নশীল বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—১৬ || ড. আনিস রহমান  পেনসিলভেনিয়া

. প্রতারণা শনাক্তকরণ: ডিজিটাল নিরাপত্তার আধুনিক প্রহরী

ডিজিটাল লেনদেনের প্রসারের সাথে সাথে আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে যারা প্রযুক্তিতে নতুন, তারা প্রায়ই ফিশিং, আইডেন্টিটি থেফট বা পরিচয় চুরি এবং সিম ক্লোনিংয়ের মতো অপরাধের শিকার হন। প্রথাগত নিয়মভিত্তিক (জঁষবনধংবফ) নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিক অপরাধীদের সূক্ষ¥ কৌশলগুলো ধরতে প্রায়ই ব্যর্থ হয় কারণ সেই নিয়মগুলো স্থির এবং সহজে অনুমেয়। এখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এক অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করে যা রিয়েলটাইমে অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্ত করতে সক্ষম।

. অ্যানোমালি ডিটেকশন অস্বাভাবিকতা শনাক্তকরণ

এআইভিত্তিক প্রতারণা শনাক্তকরণ ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলোঅ্যানোমালি ডিটেকশনবা অস্বাভাবিকতা শনাক্তকরণ। এই সিস্টেমগুলো কোটি কোটি লেনদেন বিশ্লেষণ করে একজন নির্দিষ্ট গ্রাহকের স্বাভাবিক ব্যবহারের প্যাটার্ন বাবেসলাইনতৈরি করে। যখনই কোনো লেনদেন এই স্বাভাবিক প্যাটার্ন থেকে বিচ্যুত হয়, এআই সিস্টেম মুহূর্তের মধ্যে তা শনাক্ত করে সতর্কবার্তা পাঠাতে পারে। অ্যানোমালি বা অস্বাভাবিকতাকে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। প্রথমটি হলোপয়েন্ট অ্যানোমালি’, যেখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট লেনদেনের মান অস্বাভাবিক হয়যেমন একজন গ্রাহক সাধারণত খুব ছোট অংকের লেনদেন করেন কিন্তু হঠাৎ তার অ্যাকাউন্ট থেকে বড় অংকের টাকা স্থানান্তর হলো। দ্বিতীয়টি হলোকনটেক্সচুয়াল অ্যানোমালি’, যা প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভর করেযেমন দিনের বেলা লেনদেন করা স্বাভাবিক হলেও গভীর রাতে বিদেশ থেকে লগইন করার চেষ্টা সন্দেহজনক হতে পারে। তৃতীয়টি হলোকালেক্টিভ অ্যানোমালি’, যেখানে এককভাবে লেনদেনগুলো স্বাভাবিক মনে হলেও একটি গ্রুপ হিসেবে সেগুলো একটি নির্দিষ্ট অপরাধমূলক প্যাটার্ন তৈরি করে।

. আচরণগত বায়োমেট্রিক্স কারিগরি কৌশল

প্রতারণা রোধে এআই বিভিন্ন আধুনিক কৌশল ব্যবহার করে যার মধ্যে অন্যতম হলো আচরণগত বায়োমেট্রিক্স (ইবযধারড়ৎধষ ইরড়সবঃৎরপং) এতে একজন মানুষ কীভাবে ফোনের স্ক্রিন স্পর্শ করেন, কিবোর্ড ব্যবহার করেন বা ফোনটি কত ডিগ্রি কোণে ধরেন তা বিশ্লেষণ করা হয়। যদি কোনো হ্যাকার চুরি করা পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করে, তবুও তার টাইপিং স্পিড বা ফোনের মুভমেন্ট দেখে এআই বুঝে ফেলে যে এটি আসল ব্যবহারকারী নয়। প্রতারণা শনাক্তকরণে গ্রাফ নিউরাল নেটওয়ার্ক (এঘঘ) অত্যন্ত কার্যকর যা জটিল মানি লন্ডারিং চক্র শনাক্ত করতে পারে। এছাড়া ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (ঘখচ) প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফিশিং ইমেইল বা সন্দেহজনক মেসেজ শনাক্ত করা হচ্ছে। পেপ্যাল বা রিভোলুটের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এআই ব্যবহার করে তাদের প্রতারণা জনিত আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৫০ শতাংশ কমাতে সক্ষম হয়েছে।

. বাংলাদেশ প্রেক্ষিত: এটুআই ফিনটেক বিপ্লব

বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের অন্যতম পথিকৃৎ হলোঅ্যাসপায়ার টু ইনোভেট’ (ধ২র) প্রোগ্রাম। ডিপিআই এবং এআই প্রযুক্তির সমন্বয়ে এটুআই নাগরিক সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করছে। এটুআইএর মূল দর্শন হলোসার্ভিস@ডোরস্টেপসযেখানে প্রযুক্তির মাধ্যমে সরকারি সেবা পাওয়া সহজ, দ্রুত এবং সাশ্রয়ী করা হয়েছে।

. একপে (বশচধু) এবং আর্থিক সেবার একীকরণ

এটুআইএর অন্যতম সফল উদ্যোগ হলোএকপে’ (বশচধু), যা দেশের প্রথম এবং বৃহত্তম ন্যাশনাল পেমেন্ট এগ্রিগেটর। এটি মূলত একটি সমন্বিত ডিজিটাল পরিকাঠামো যা ব্যবহার করে নাগরিকরা বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফি সহ শত শত সরকারি বেসরকারি সেবা একটি মাত্র প্ল্যাটফর্ম থেকে পরিশোধ করতে পারেন। একপে মাধ্যমে আন্তঃব্যবহারযোগ্যতা (ওহঃবৎড়ঢ়বৎধনরষরঃু) নিশ্চিত করা হয়েছে, যার ফলে বিকাশ, নগদ বা যেকোনো ব্যাংক অ্যাপ ব্যবহার করে নিরবচ্ছিন্নভাবে সরকারি পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে। ২০২৩২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একপে প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বার্ষিক ৯০০ কোটি টাকারও বেশি লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে যা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্নীতির সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া সারাদেশে ,০০০এর বেশিডিজিটাল সেন্টারগ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে এই সেবাগুলো পৌঁছে দিচ্ছে যা সাধারণ মানুষের সময় খরচ গড়ে যথাক্রমে ৭৮ শতাংশ এবং ১৬ শতাংশ সাশ্রয় করছে।

. ভয়েস এআই হিশাব (ঐরংযধন): ডিজিটাল সাক্ষরতার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব। অনেক মানুষ বিশেষ করে গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ডিজিটাল ইন্টারফেস বা স্মার্টফোন ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। এই সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশী এআই স্টার্টআপহিশাব’ (ঐরংযধন) এক যুগান্তকারী সমাধান নিয়ে এসেছে। হিশাব মূলত একটি টেলিফোনচালিত কনভারসেশনাল এআই ইঞ্জিন যা জেনারেটিভ এআই এবং আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

হিশাবএর সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক দিক হলো এটি ব্যবহারের জন্য স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের প্রয়োজন নেই। যেকোনো সাধারণ বাটন ফোন থেকে কেবল মুখে কথা বলে বা ভয়েস কমান্ডের মাধ্যমে ব্যাংকিং লেনদেন করা সম্ভব। হিশাব বর্তমানে মাইক্রোফিন্যান্স সেক্টরের মিলিয়ন গ্রাহককে লেনদেনের তথ্য জানতে সাহায্য করছে এবং সোনালী ব্যাংক মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (গঞই) সাথে যুক্ত হয়ে ভয়েসঅ্যাসিস্টেড ব্যাংকিং সেবা চালু করেছে। এর মাধ্যমে একজন নিরক্ষর মানুষও তার নিজের ভাষায় কথা বলে টাকা পাঠাতে পারেন যা ডিজিটাল সাক্ষরতার ব্যবধান ঘুচিয়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।


Related Posts