মানব সভ্যতায় যুক্তরাষ্ট্রের অবদান ও ক্ষরণ! || ড. আবেদীন কাদের

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার আড়াইশত বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে কয়েকটি বিষয় সমাজবিজ্ঞানীরা খুব বেশি গুরুত্বের সাথে বিচার করছেন। ইংরেজ উপনিবেশিক শাসন উৎখাত করে স্বাধীনতাকামী মানুষরা এই ভূখন্ডে নিজেদের স্বাধীনতা আধিপত্য স্থাপন করেছে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে জগতের সামনে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এখানে যে বিষয়টি সংখ্যাগরিষ্ঠ ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গরা, যারা এদেশ দখল করেছিলো, ক্ষমতা প্রয়োগ করে তারা ইংরেজদের উপনিবেশিক শাসনকে হটিয়েনিজেদেরশাসন প্রতিষ্ঠা করে বটে, কিন্তু এইনিজেরাআসলে কারা! এরা তো এদেশের আদি বাসিন্দা নয়, তারা এই ভূখন্ডের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারী বলে নিজেদেরকে দাবি করতেও পারে না। এখানে যে আদি নেটিভ ইনডিয়ানরা এদেশের মালিক তাদেরকে তো ইউরোপীয় দখলদারিরা বাস্তুহারা করেছে। তাহলে এইস্বাধীনতআসলে কাদের স্বাধীনতা! যদি আদিবাসীরা বা নেটিভ ইনডিয়ানরা শ্বেতাঙ্গদের এদেশ ছেড়ে চলে যেতে বলে, সেটার ন্যায্যতা অনেক বেশি। 

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের পর উত্তর আমেরিকার বাজার ইংরেজ উপনিবেশিক শাসকদের কাছে বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করলো। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উপনিবেশিক শাসকের দাবি অনুযায়ী বিলেতের রাজার সেদেশের শিল্পগুলোর কাঁচামাল, যেমন সূতা তামাক জরুরি প্রয়োজন ছিলো, তেমনি এতো বৃহৎ বাজারের জন্য ইংরেজদের মালিকানায় বিপুল সংখ্যক কারখানাগুলোর শীতবস্ত্র উৎপাদন বাজারজাতকরণের সুযোগ উপনিবেশিক সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে স্ফীতাকারে রূপ দেয়। কিন্তু শ্বেতাঙ্গ শাসকদের বিরুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের মাঝে বিরাট বিরাগ সৃষ্টি হয় তাদের ওপর অত্যাচারের ফলে। এই ইতিহাস সবার জানা, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ফাউন্ডিং ফাদাররা বা প্রথম দিককার নেতারা জানতেন ইউরোপের মতো এখানে এক সময় পুঁজির ক্ষমতা সীমিত হয়ে আসবে। তাই মার্কিন দেশটিতে শ্বেতাঙ্গ ক্ষমতা দখলকারীরা সুদূরপ্রসারী কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করে, এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ছিলো রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করার নিমিত্তে একটি নিশ্ছিদ্র সংবিধান রচনা করা যার কারণে আইন পরিষদকে সবার চেয়ে বেশি মূল্য দেয়া হয়েছে। ইউরোপের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর বিভিন্ন সামাজিক রাজনৈতিক সমস্যার অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদেরকে বিশেষভাবে সতর্ক হতে সাহায্য করে, তাই এখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে যতটা সম্ভব এমনভাবে নির্মাণ করা হয় যাতে সংবিধানের ফাঁক গলিয়ে কোন ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা স্থায়ী হতে না পারে, বা রাষ্ট্রকে বড় ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে না পারে। ফরাসী স্পেনসহ আরও কয়েকটি দেশের ইতিহাস মার্কিন ফাউন্ডিং ফাদার ওয়াশিংটন জেফারসনকে অনেকটাই বিচলিত করে প্রজাতন্ত্রকে নির্বাচিত স্বৈরদানবের হাত থেকে মুক্ত রাখতে। তাই তাঁরা গণতান্ত্রিক সংবিধানকে বিভিন্ন উপায়ে এমনভাবে আইনি ভিত্তি দেন যাতে তারা রিপাবলিকের জনগোষ্ঠীকে এক দীর্ঘমেয়াদী উদারনৈতিক গণতন্ত্র উপহার দিতে পারে। সে কারণে মার্কিন সংবিধানকে জগতের শ্রেষ্ঠ সংবিধানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

গত দুই শতাব্দীতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটে পশ্চিমা বিশ্বে, এর মধ্যে জাতীয় পুঁজির বিকাশের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে বেশি উন্নতি লাভ করে। এখানে জাতীয় পুঁজির বিকাশ ঘটাতে বিভিন্ন বাধা আসেনি তা নয়, তবে তারা সে বাধা সহজেই অতিক্রম করে। কিন্তু অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী এর বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করার পর এই ব্যবস্থার মাঝে অগ্রগতিতে শ্লথ অবস্থা দেখা দেয়। মার্কিন অর্থনীতিতেও তা দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে মহাযুদ্ধের পর। তখনই পুঁজির মালিকরা জগতের সবচেয়ে স্বল্পমূল্যের শ্রম বাজার খুঁজে বের করে এবং উৎপাদিত পণ্যের জন্য নতুন ধরনের বাজার বা উপনিবেশ সৃষ্টি করতে উদ্যোগ নেয়। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন পুঁজি তথা মার্কিন উদারনৈতিক গণতন্ত্র জগতের বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। পুঁজির একমাত্র অন্বেষণ কীভাবে মুনাফাকে বাড়ানো যায় শাসনব্যবস্থা এর অনুকূলে রাখা সম্ভব হয় তেমন ব্যবস্থা সৃষ্টি করা। তাই উনবিংশ শতাব্দীর যে উৎপাদন ব্যবস্থা ছিলো তা গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বদলে যায়। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র শক্তি জয়লাভ করার পর মার্কিন নেতৃত্ব নতুন উপনিবেশিক ব্যবস্থার উদ্ভাবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট তার মিত্র কয়েকটি দেশের নেতারা গোপনে রুশ সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক আধিপত্য থেকে ইউরোপ নিজেদেরকে বাঁচানোর উদ্দেশে নতুন মুদ্রাব্যবস্থা সৃষ্টি করে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিবিদগণ রাজনীতিকরা ফরাসী ইংরেজ নেতৃত্বের সঙ্গে গোপনে নিউইয়র্কেরব্রিটন উডহোটেলে সেরা অর্থনীতিবিদদের নিয়ে আলোচনায় বসে এবং যুদ্ধপরবর্তী বিশ্ব অর্থনীতিকে নিজেদের কব্জায় রাখার জন্য বিশ্বব্যাংক আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল নামক দুটি প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে। যুদ্ধ তখনও শেষ হয়নি, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চায় জগতের মুদ্রাবিনিময় ব্যবস্থা ব্রিটিশ পাউন্ডের পরিবর্তে মার্কিন ডলারের মাধ্যমে বিনিময় করতে জগতের বিভিন্ন দেশকে বাধ্য করে। এটা আসলে দরিদ্র তথা মাঝারি অর্থনীতির দেশগুলোকে বাধ্য করা হয় মার্কিন মুদ্রা বিনিময়ের শর্ত মেনে চলতে। এর অপর নাম আসলে নিওকলোনিয়ালিজম বা নতুন উপনিবেশ সৃষ্টি করা, যার মাধ্যমে কোনো দেশকে দখল না করেও সেদেশের চালিকা শক্তি অর্থনীতির ওপর মার্কিন আধিপত্য সৃষ্টি করা সম্ভব হয়। এটাইযুদ্ধোত্তর উপনিবেশিক ব্যবস্থা বলা যায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সৃষ্টি করেও যুক্তরাষ্ট্র অতীতের মতোই অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের অধীনে রাখে। এই ব্যবস্থা বাঁচিয়ে রাখতে মার্কিন দেশকে সবচেয়ে আগে নিজেকে অপ্রতিরোধ্য শক্তির অধিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে হয় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি সামরিক শক্তিতে। কারণ শেষ বিচারে অন্য ভূখন্ডকে নিয়ন্ত্রণের শেষ উপায়প্রয়োজনে বল প্রয়োগ কিন্তু এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন হয় শিক্ষা বিজ্ঞান গবেষণায় জগতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা। সেটা মার্কিনীরা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে করে আসছে গত এক শতাব্দী ধরে। কিন্তু গত শতাব্দীর সত্তর দশকে স্বল্পমূল্যের পুঁজির সন্ধানে মার্কিন পুঁজি বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোতে ব্যাপক বিনিয়োগ করে, এই ব্যবস্থা তাদের পুঁজির মুনাফা কয়েক গুণ বাড়িয়ে তোলে। সত্তর দশকে এই নীতির প্রসার ঘটিয়েনতুন পুঁজিব্যবস্থারসৃষ্টি করে, অর্থাৎ উৎপাদন বাজার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে মার্কিনীরা, বিশ্বপুঁজির গোলকায়ন বা এষড়নধষরুধঃরড়হ এর মাধ্যমে। বলা যায় আধুনিক সময়ে বিজ্ঞানের প্রযুক্তির অকল্পনীয় উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন পুঁজি বিশ্বে নতুন অর্থভিত্তিক উপনিবেশের সৃষ্টি করে। 

মানব সভ্যতার ইতিহাসে গত দুতিন হাজার বছরে যে বড় কয়েকটি বাঁকবদল ঘটেছে, বিস্ময়কর কিছু নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে পঞ্চদশ শতাব্দীর মুদ্রণ ব্যবস্থার পর ইন্টারনেট বা ইনফরমেশন টেকনোলজির উদ্ভাবন জ্ঞানের রাজ্যে বিপ্লব এনেছে। এটা মার্কিন প্রযুক্তিবিদদের সৃষ্টি। এছাড়া চিকিৎসা বিজ্ঞান বা ফলিত বিজ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রেও মার্কিনীদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র আড়াইশত বছরে মার্কিনীদের মানব সভ্যতায় অবদান জগতের অন্যদের চেয়ে কম নয়। কিন্তু তাদের করা ক্ষতির পরিমাণও অনেক। নিজের দেশে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি অমানবিক অত্যাচার বৈষম্য সৃষ্টি অন্যতম। পুঁজির স্বার্থে বা মুনাফা অর্জনের নিমিত্তে মার্কিনীরা নিজেদের অস্ত্রকারখানার উৎপাদিত পণ্য বিক্রির উদ্দেশে যুদ্ধ বিগ্রহের সূত্রপাত করে বিভিন্ন দেশের মধ্যে, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে। ভিয়েতনামসহ মধ্যপ্রাচ্য দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য ভূখন্ডে যুদ্ধের সূচনা মার্কিনীদের অত্যাচারের সামান্য নমুনা। তবে ইউরোপের শ্বেতাঙ্গদের দীর্ঘদিনের বিশ্বশাসনের পর বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে গত প্রায় আট দশক যুক্তরাষ্ট্র ভিন্ন অর্থে পৃথিবীকে শাসন করছে নিজেদের মুদ্রা ডলারের আধিপত্য বিস্তার করে। বিজ্ঞান প্রযুক্তি এবং অস্ত্র বিক্রি করে তারা এটা ঘটায়। কিন্তু মার্কিনীদের উদারনৈতিকমানবিকরাজনীতি নিজেদের নাগরিকদের কিছুটা নিরাপত্তা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু জগতের অনেক দেশের জন্যই যুক্তরাষ্ট্র এক বিভীষিকার নাম। দেশটি বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারী। এছাড়া নিজেদের মেধা দিয়ে তারা একটি উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সৃষ্টি করে মানব সভ্যতার ইতিহাসে তাদের উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছে সন্দেহ নেই, কিন্তু আজ প্রায় দুই দশক ধরে বিশ্বের জায়মান কয়েকটি শক্তি যেমন চীন, রাশিয়া বা ভারত অন্যান্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রের একক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ক্ষীয়মান সন্দেহ নেই। হয়তো আগামী তিরিশ বা পঞ্চাশ বছরের মধ্যে এই রাষ্ট্রের বিরোধী শক্তি জগতের নেতৃত্বে আসবে, পুঁজির একক ক্ষমতা মানবের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিকল্প শক্তিগুলো জোটবদ্ধ হয়ে বিশ্বরাজনীতিকে পাল্টিয়ে দিতে সক্ষম হবে। সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়িষ্ণু জীবনব্যবস্থা প্রাচ্যের পুরাতন চীন বা ভারতীয় সভ্যতার কাছেও অনেক কিছু শিক্ষণীয় থাকবে আগামীর মানব সমাজের। মোটাদাগে গত আড়াই শত বছরের যুক্তরাষ্ট্রের জীবনব্যবস্থা মানব সভ্যতায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা অন্যান্য বেশ কিছু ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছে, সেই সঙ্গে যুদ্ধাস্ত্র সৃষ্টি করে তারা মানব জাতির অশেষ ক্ষতিও করেছে সন্দেহ নেই! মোটা দাগে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের আধুনিক সভ্যতায় গত আড়াই শত বছরের অবদান যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সৃষ্টির কলঙ্কিত অধ্যায়ও


Related Posts