৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্প ঃ কেন্টাকি দ্য প্যাট্রন সেইন্ট অব লায়ার্সঃ অ্যান প্যাচেট || আবদুল্লাহ জাহিদ নিউইয়র্ক
কেন্টাকির নিস্তব্ধ পাহাড়ে হারিয়ে যাওয়া এক নারীর গল্প।
ক্যালিফোর্নিয়ার রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশের নিচে একদিন হঠাৎ রোজ ক্লিনটন বুঝতে পারল, সে ভুল মানুষকে বিয়ে করেছে। তার স্বামী টম একজন সৎ, ভদ্র, নিরীহ মানুষ। তবু রোজের মনে হয়, এই সংসার যেন তার জন্য নয়। তার বুকের ভেতর সারাক্ষণ এক অজানা শূন্যতা, যেন সে এমন একটি জীবনে বন্দি হয়ে পড়েছে যা কখনও তার নিজের ছিল না।
ঠিক সেই সময় সে জানতে পারে, সে গর্ভবতী।
অন্য কোনো নারী হয়তো এই সংবাদে আনন্দে কেঁদে ফেলত। কিন্তু রোজের কাছে এই সন্তান যেন আরও একটি শিকল। এক গভীর রাতে কাউকে কিছু না জানিয়ে, স্বামীর জন্য একটি ছোট্ট চিঠি রেখে, সে গাড়ি চালিয়ে পশ্চিম উপকূল থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের কেন্টাকির পথে রওনা দেয়।
তার গন্তব্য কেন্টাকির ছোট্ট গ্রাম হ্যাবিট। সেখানে পাহাড়ঘেরা নির্জনতায় দাঁড়িয়ে আছে সেন্ট এলিজাবেথ নামের এক আশ্রয়কেন্দ্র, যেখানে অবিবাহিত গর্ভবতী নারীরা সন্তান জন্ম দিয়ে নতুন জীবনের সন্ধান পায়। একসময় এটি ছিল ঝর্ণার পাশে নির্মিত একটি বিলাসবহুল হোটেল; পরে তা ক্যাথলিক চার্চের তত্ত্বাবধানে আশ্রমে রূপ নেয়।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, রোজ সেখানে থাকা অন্য মেয়েদের মতো নয়। তারা অবিবাহিত; কিন্তু রোজ বিবাহিত। সে নিজের পরিচয় গোপন করে। মনে মনে ঠিক করে, সন্তান জন্ম দিলেই শিশুটিকে অন্যের হাতে তুলে দেবে। তারপর কোথাও হারিয়ে যাবে।
সেন্ট এলিজাবেথে তার পরিচয় হয় সিস্টার ইভানজেলিনের সঙ্গে। স্নেহময়ী এই সন্ন্যাসিনী রোজের নিঃসঙ্গতা বুঝতে পারেন। আর আছে ‘সন’ অ্যাবট—আশ্রমের নীরব তত্ত্বাবধায়ক। গাছপালা, ভাঙা জানালা, পুরনো ভবনÑসবকিছুর মতো মানুষের ভাঙা মনও যেন সে নীরবে মেরামত করতে জানে।
রোজ ধীরে ধীরে রান্নাঘরের কাজ নিতে শুরু করে। আশ্রমের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে সে মিশে যায়। একের পর এক তরুণী আসে, সন্তান জন্ম দেয়, তারপর শিশুকে রেখে চলে যায়। কিন্তু রোজের বুকের ভেতর অদ্ভুত পরিবর্তন শুরু হয়।
সন্তান জন্মানোর মুহূর্তে সব সিদ্ধান্ত বদলে যায় রোজের। সে বুঝতে পারে, এই শিশুকে সে কাউকে দিতে পারবে না। সে এক কন্যাশিশু প্রসব করে, যার নাম রাখা হয় সিসিলিয়া, সবাই তাকে ডাকে সিসি।
কিন্তু এখন আরেকটি সমস্যা। সে তো এখনও আইনত টমের স্ত্রী। তবু সে কাউকে সত্যি কথা না জানিয়ে সন অ্যাবটকে বিয়ে করে ফেলে।
রোজ যখন সেন্ট এলিজাবেথে আসে, তখন সে মানসিকভাবে ভীষণ একা। সে কারও সঙ্গে সহজে মিশতে চায় না। অন্যদিকে সন অ্যাবটও একজন নিঃশব্দ, সংযত মানুষ। সে আশ্রমের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে। গাছপালা লাগানো, ভাঙা ভবন মেরামত, মাঠ পরিষ্কারÑএসবই তার কাজ।
প্রথমদিকে তাদের মধ্যে খুব বেশি কথা হয় না। বরং নীরবতাই তাদের ভাষা।
রোজ লক্ষ্য করে, সন কখনো তার অতীত জানতে চায় না। সে রোজকে বিচারও করে না। এই গ্রহণযোগ্যতাই রোজকে ধীরে ধীরে তার দিকে টেনে আনে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা একসঙ্গে কাজ করতে থাকে। কখনও বাগানে, কখনও ভবনের ছোটখাটো কাজে। এই দীর্ঘ সময়ের সহাবস্থান থেকেই তাদের মধ্যে এক ধরনের অন্তরঙ্গতা তৈরি হয়।
এটি কোনো নাটকীয় প্রেম নয়; বরং নিঃসঙ্গ দুই মানুষের ধীরে ধীরে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠা।
সিসি জন্মানোর পর সেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়। সন সিসির প্রতি অকৃত্রিম স্নেহ দেখায়। তখন রোজ তাকে বিয়ে করতে সম্মত হয়।
তবে এই বিয়ের একটি বড় নৈতিক সমস্যা ছিল, রোজ তখনও আইনত টমের স্ত্রী। সে সনকে এই সত্য পুরোপুরি জানায়নি। অর্থাৎ তাদের সম্পর্কের ভিত্তিতেও একটি বড় গোপন মিথ্যা ছিল।
এই নতুন সংসারের ভিত্তি দাঁড়ায় একটি গোপন সত্যের ওপর। রোজ জানে, সে আবার মিথ্যা বলেছে।
এরপর বহু বছর কেটে যায়।
সেন্ট এলিজাবেথে সিসি বড় হতে থাকে। চারদিকে নান, অনাথ শিশু, গর্ভবতী মেয়েদের আনাগোনা, এই আশ্রমই তার পৃথিবী।
কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, রোজ যেন ধীরে ধীরে নিজের সন্তান থেকেও দূরে সরে যেতে থাকে।
সে সিসিকে ভালোবাসে কি নাÑএই প্রশ্নের উত্তর পাঠক কখনও নিশ্চিতভাবে পায় না।
সন্তানের যত্ন নেয় সন। বাবার মতো নয়, যেন এক নিঃশর্ত অভিভাবক। সিসির ছোট ছোট আনন্দ, স্কুল, স্বপ্নÑসবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু সে।
অন্যদিকে রোজ নিজের ভেতর আরও গুটিয়ে যায়। একই চত্বরে থেকেও সে আলাদা বাড়িতে থাকতে শুরু করে। সংসার আছে, কিন্তু সংসারের ভেতরে সে নেই।
বছরের পর বছর ধরে রোজের অতীত তাকে অনুসরণ করে। তার মা মারা যান।
একদিন টম, সেই প্রথম স্বামী, বহু বছরের খোঁজাখুঁজির পর সেন্ট এলিজাবেথে এসে পৌঁছায়। সে প্রতিশোধ নিতে আসেনি। এসেছে শুধু খবর দিতে, রোজের মা আর নেই।
টম ভেঙে পড়েছিল, কিন্তু সে কখনো রোজকে ঘৃণা করেনি।
রোজ একদিন হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ার সময় শুধু একটি ছোট চিঠি রেখে যায়। চিঠিতে প্রায় কোনো ব্যাখ্যাই ছিল না।
টম প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেনি।
তারপর বহু বছর ধরে সে রোজকে খুঁজেছে। সে জানত রোজ গর্ভবতী ছিল। তাই তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল, রোজ ও অনাগত সন্তান বেঁচে আছে কি না।
সে নতুন সংসার করেনি। রোজকে ভুলেও যায়নি।
বহু বছর পর, যখন রোজের মায়ের মৃত্যু হয়, তখন সেই খবর দেওয়ার জন্য টম সেন্ট এলিজাবেথে আসে। এই দৃশ্যটি অত্যন্ত আবেগঘন।
টমের মনে কোনো প্রতিশোধ নেয়ার প্রবণতা নেই।
সে রাগ দেখায় না।
সে শুধু জানতে চায়, রোজ ভালো আছে কি না।
কিন্তু টমের আগমনের খবর শুনেই রোজ আবার পালিয়ে যায়। যেমন একদিন ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়েছিল, তেমনি এবারও কোনো বিদায় না জানিয়ে সে অদৃশ্য হয়ে যায়।
সে যেন সারাজীবনই পালিয়ে বেড়ানো এক মানুষ।
এখানেই টমের চরিত্র সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে রোজকে তাড়া করে না, অপমান করে না, এমনকি নিজের মেয়েকে (সিসি) নিয়েও কোনো দাবি তোলে না। সে নীরবে মেনে নেয়, কিছু মানুষকে ভালোবাসা যায়, কিন্তু তাদের ধরে রাখা যায় না। মায়ের অনুপস্থিতিতে মেয়ে বড় হয়।
সিসি তখন কিশোরী। সে বুঝতে পারে, মা তাকে ফেলে চলে গেছে। কিন্তু কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই।
টমের সঙ্গে তার অদ্ভুত এক সম্পর্ক তৈরি হয়। পাঠক জানে, টমই তার জৈবিক বাবা। কিন্তু সিসি তা জানে না। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসÑদুজন মানুষ রক্তের সম্পর্কে জড়িত, অথচ কেউ তা উচ্চারণ করে না। শেষ পর্যন্ত সিসি সেন্ট এলিজাবেথেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সে বুঝে যায়, মানুষ কখনও কখনও জন্মদাত্রী মায়ের কাছ থেকে নয়, বরং যারা পাশে থাকে তাদের কাছ থেকেই সত্যিকারের পরিবার খুঁজে পায়।
এই উপন্যাসে কেন্টাকি কেবল পটভূমি নয়, যেন একটি জীবন্ত চরিত্র।
নিস্তব্ধ পাহাড়, বিস্তীর্ণ ঘাসের মাঠ, পুরনো ইটের ভবন, চার্চের ঘণ্টাধ্বনি, বর্ষার কাদা, শরতের শুকনো পাতাÑসব মিলিয়ে সেন্ট এলিজাবেথ যেন সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক জগৎ।
এখানে মানুষ আসে হারিয়ে যেতে, আবার কেউ কেউ নিজেকে খুঁজে পায়। রোজ পারেনি।
সিসি পেরেছে।
রোজ এমন এক নারী, যাকে এক কথায় বিচার করা যায় না। সে নিষ্ঠুরও, আবার গভীরভাবে আহতও। সে সন্তানকে ভালোবাসে, কিন্তু মাতৃত্বের দায়িত্ব নিতে পারে না। সে ভালো মানুষদের কষ্ট দেয়, অথচ নিজেও শান্তি খুঁজে পায় না।
উপন্যাস শেষ হওয়ার পরও পাঠকের মনে একটি প্রশ্ন থেকে যায়, মানুষ কি সত্যিই নিজের অতীত থেকে পালাতে পারে? অ্যান প্যাচেটের উত্তর যেন নিঃশব্দে ভেসে আসে কেন্টাকির সেই নির্জন আশ্রম থেকে।
দ্য প্যাট্রন সেইন্ট অব লায়ার্সঃ অ্যান প্যাচেট
দ্য প্যাট্রন সেইন্ট অব লায়ার্স মূলত মিথ্যা, মাতৃত্ব, স্বাধীনতা, অপরাধবোধ এবং ক্ষমার উপন্যাস। অ্যান প্যাচেট কোনো চরিত্রকে নায়ক বা খলনায়ক বানান না। বরং তিনি দেখান, মানুষ কখনও কখনও ভালোবেসেও চলে যায়, সত্য জেনেও মিথ্যা বলে, আবার সারাজীবন সেই মিথ্যার ভার বহন করে।
এই কারণেই উপন্যাসটি শুধু একটি পারিবারিক উপন্যাস নয়; এটি মানুষের অপরাধবোধ, ভালোবাসা, ক্ষমা এবং আত্মপরিচয়ের এক গভীর মনোস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান। এই উপন্যাসের নাম বাংলা করলে দাঁড়ায়— মিথ্যারও যেন এক অভিভাবক আছে।
লেখক পরিচিতি: অ্যান প্যাচেটের জন্ম ২ ডিসেম্বর, ১৯৬৩, লস এঞ্জেলেসে। তিনি সমকালীন আমেরিকান সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক। জন্ম ক্যালিফোর্নিয়ায় হলেও তিনি শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি অংশ কাটিয়েছেন টেনিসির ন্যাশভিলে। পরবর্তীকালে এই শহরই তাঁর সাহিত্যজীবনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
১৯৯২ সালে প্রকাশিত তাঁর এই প্রথম উপন্যাসটি বিশেষভাবে সমাদৃত হয়। এরপর বেল ক্যান্টো, স্টেট অব ওয়ান্ডার, কমনওয়েলথ, দ্য ডাচ হাউজ এবং টম লেক তাঁকে সমকালীন কথাসাহিত্যের প্রথম সারির লেখকদের কাতারে প্রতিষ্ঠিত করে।
