কাগজের ক্যানভাসে পৃথিবীর গল্প—সতেরো নোটে বঙ্গবন্ধু, গান্ধী, ম্যান্ডেলা || আখতার আহমেদ রাশা নিউজার্সি
ক্ষমতা বদলায়, শাসকের হাতবদল হয়, এমনকি ইতিহাসের বইয়ের পাতাও মাঝেমধ্যে গায়ের জোরে পুনর্লিখন করা হয়। কিন্তু একটা জাতির রক্তের অক্ষরে লেখা ইতিহাস আর তার আত্মপরিচয়ের দলিলকে কি শাসকের গায়ের জোরে এত সহজে মুছে ফেলা যায়? উত্তরটা লুকিয়ে আছে আমাদের পকেটে, রোজকার হাতবদল হওয়া কিছু কাগজের টুকরোয়। আমরা যাকে স্রেফ কেনাবেচার ‘টাকা’ বা কারেন্সি বলি, একজন ইতিহাস—সন্ধানীর কাছে তা আসলে একেকটি নব দিগন্তের জাদুকরী দলিল। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা একেবারেই ভিন্ন তিনটি জনপদ। অথচ টাকা, রুপি আর র্যান্ডের ক্যানভাসে এরা একাকার হয়ে গেছে একই ঐতিহাসিক সত্যে। আজ এই মুদ্রার বুকে আমরা কোনো সংখ্যার হিসাব খুঁজব না; আজ আমরা পাঠ করব গান্ধী, বঙ্গবন্ধু আর ম্যান্ডেলার অবিনশ্বর চেতনার আলোকগাথা।
আমার সংগ্রহের অ্যালবামটি যখন খুলি, তখন চশমা পরিহিত বঙ্গবন্ধুর সেই অকুতোভয় মুখাবয়ব, মহাত্মা গান্ধীর সেই অহিংসার মৃদু হাসিমুখ, আর নেলসন ম্যান্ডেলার বর্ণিল ও ক্ষমাসুন্দর অবয়ব যেন এক সুতোয় গেঁথে দেয় বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসকে। ঘাতক বা সময় তাঁদের শরীরকে কেড়ে নিলেও, এই তিন দেশের সাধারণ মানুষ প্রতিদিন যখন তাঁদের মুদ্রা স্পর্শ করেন, তখন মূলত তাঁরা স্পর্শ করেন তাঁদের মুক্তির ইতিহাসকে। একটি দেশের ব্যাংকনোট হলো সেই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী বিজ্ঞাপন। সাধারণ মানুষের হাতবদল হতে হতে ক্ষয়ে যাওয়া এই কাগজের বুক জুড়েই লুকিয়ে থাকে একটি জাতির আত্মপরিচয়। স্রেফ কেনাবেচার মাধ্যম ছাপিয়ে এই তিন দেশের মুদ্রা কীভাবে এক একটি জাতির সার্বভৌমত্ব ও মুক্তির দলিল হয়ে উঠল, আজ সেই গল্পই বলব।
১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কাগজের মুদ্রা (৫, ১০ ও ১০০ টাকা) যখন বাজারে আসে, তার প্রতিটিতেই সগৌরবে শোভা পাচ্ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি। কারণ তিনি স্রেফ তাঁর বজ্রকণ্ঠে একটি পরাধীন জাতিকে সশস্ত্র বিপ্লবের আগুনে রূপান্তর করে একটি স্বাধীন মানচিত্র এবং এই স্বাধীন মুদ্রা এনে দিয়েছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ১৯৭৫ সালের কালো অধ্যায়ের পর থেকে শুরু করে আজকের বর্তমান প্রেক্ষাপট পর্যন্তÑযখনই বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে, তখনই একদল সুযোগ সন্ধানী গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম, স্মৃতি ও চিহ্ন সম্পূর্ণ মুছে ফেলার এক হীন চেষ্টা চালায়। ইতিহাসকে বিকৃত করার এই নোংরা খেলা আমরা অতীতেও দেখেছি, আজও দেখছি। কিন্তু ইতিহাস কোনো সস্তা দেয়াল লিখন নয় যে চুনকাম করে মুছে ফেলা যাবে। তার সবচেয়ে বড় ও অকাট্য প্রমাণ আমাদের ২০১১ সালের মুদ্রা আইন এবং আমাদের দৈনন্দিন পকেটে থাকা কাগজের টাকা।
আজকের দিনেও ২ টাকা থেকে শুরু করে ১০০০ টাকার প্রতিটি প্রচলিত নোটে বঙ্গবন্ধুর সেই চশমা পরিহিত দৃঢ় ও চিরচেনা প্রতিকৃতি জলছাপ এবং মূল ক্যানভাসে জীবন্ত হয়ে আছে। সাধারণ মানুষ প্রতিদিন যখন বাজারে সওদা করতে বা বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এই মুদ্রা স্পর্শ করেন, তখন শাসকগোষ্ঠী মুখে যাই বলুক না কেন, সাধারণ মানুষের হাতের স্পর্শে বারবার মূর্ত হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে আসা আমাদের মুক্তির ইতিহাস। শাসকের কলমের খোঁচায় ক্ষমতার রঙ বদলাতে পারে, কিন্তু প্রতিটি নাগরিকের হাতবদল হতে হতে ক্ষয়ে যাওয়া কাগজের এই ক্ষুদ্র ক্যানভাস থেকে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে গেঁথে থাকা ‘মুজিব’ নামটিকে মুছে ফেলার সাধ্য কারও নেই।
ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক (জইও) ১৯৯৬ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে সব নোটে এম.কে গান্ধীর ছবি বাধ্যতামূলক করে ‘মহাত্মা গান্ধী সিরিজ’ চালু করে। এর আগে বিভিন্ন নোটে অশোক স্তম্ভ বা অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপনা থাকত। কিন্তু ভারতের মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যময় একটি দেশে এমন একটি ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন ছিল, যা কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারীÑসব ধর্মের, সব ভাষার মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে পারে। গান্ধীর চেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক ও অহিংসার প্রতীক আর কে হতে পারত! ব্যাংকনোটে তাঁর যে মৃদু হাসিমুখের ছবি আমরা দেখি, সেটি কোনো কাল্পনিক স্কেচ নয়; ১৯৪৬ সালে তৎকালীন ভাইসরয় হাউসে (আজকের রাষ্ট্রপতি ভবন) তোলা একটি আসল ছবি থেকে গান্ধীর অবয়বটি কেটে নিয়ে ব্যাংকনোটের ডানপাশে স্থাপন করা হয়েছে। গান্ধী আমাদের শিখিয়েছেন অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে শৃঙ্খল ভাঙা, যার ছবি ভারতের মুদ্রাকে দিয়েছে এক অনন্য নৈতিক মর্যাদা।
২০১২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের মুদ্রার এক ঐতিহাসিক রূপান্তর ঘটায়। দেশটির বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের মহানায়ক নেলসন ম্যান্ডেলার সম্মানে তৎকালীন ৫টি প্রধান নোটের (১০, ২০, ৫০, ১০০ ও ২০০ র্যান্ড) সম্মুখভাগে তাঁর হাস্যোজ্জ্বল প্রতিকৃতি যুক্ত করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষ ভালোবেসে এই নোটগুলোকে বলে “জধহফবষধ” (জধহফ+গধহফবষধ)। নোটগুলোর উল্টো পিঠে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত ‘ইরম ঋরাব’ বন্যপ্রাণী (সিংহ, চিতাবাঘ, গন্ডার, হাতি ও মহিষ)। অর্থাৎ, ম্যান্ডেলার ছবি একদিকে যেমন মানবিক স্বাধীনতার প্রতীক, অন্যদিকে উল্টো পিঠটি আফ্রিকার সমৃদ্ধ প্রকৃতির প্রতীক। ২০১৮ সালে তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে আরও একটি বিশেষ স্মারক সিরিজ আসে, যেখানে ম্যান্ডেলার শৈশব, যৌবনের সংগ্রাম এবং রাষ্ট্রপতি হওয়ার পুরো জীবনটাই নোটের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। ম্যান্ডেলা দেখিয়েছেন দীর্ঘ কারাবাস ও ক্ষমার মাধ্যমে বর্ণবাদের দেয়াল গুঁড়িয়ে দেওয়া যা আজ দক্ষিণ আফ্রিকার নোটে বর্ণিল সংহতির প্রতীক।
ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসে এই তিন মহানায়ক প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের হাতবদল হন, সাধারণ মানুষের শ্রমের ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সঙ্গী হন। শাসকের স্বৈরাচারী দম্ভ কিংবা রাজনীতির জটিল সমীকরণ হয়তো সাময়িকভাবে অনেক কিছু তছনছ করতে পারে, কিন্তু কাগজের ছোট্ট ক্যানভাসে আঁকা এই বীরদের ইতিহাস চিরকাল অমলিন ও চিরঞ্জীব হয়ে থাকে।
