কোনো খেলাতেই চূড়ান্ত নয় প্রথমার্ধের ফলাফল || আনিস আহমেদ
প্রথমার্ধই যে শেষ কথা নয় সেই সত্যটি প্রমাণিত হলো গত মঙ্গলবার মিশরের সঙ্গে এক ব্যতিক্রমী রুদ্ধশ্বাস খেলায় আর্জেন্টিনার বিস্ময়কর বিজয়ে। খেলা শুরু হবার আগে পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ভক্তরা প্রায় নিশ্চিত ছিলেন যে এই খেলায় নিশ্চয়ই আর্জেন্টিনাই জয়ী হবে। বিশেষত এর আগে এই শেষ ষোলটি দলের খেলায় ব্রাজিল ও জার্মানির অপ্রত্যাশিত পরাজয়ে হতাশ হয়েছিলেন তাদের ভক্তরা। এমনকি ব্রাজিল ভক্তরাও ভাবছিলেন যে শেষ পর্যন্ত যদি আর্জেন্টিনাই জিতে যায় তাতে অন্তত প্রাক্তন চ্যাম্পিয়নদের মুখ রক্ষা হবে। কিন্তু খেলার শুরু থেকেই মিশরের আধিপত্যে এবং পরবর্তীতে লিওনেল মেসি দু’টি পেনাল্টি কিক মিস করায় মনে হলো যেন সকল আশার গুড়ে কেবলই বালি। মিশরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে প্রথমার্ধে ১—০ গোলে পিছিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। আবার দ্বিতীয়ার্ধে ৬৭ মিনিটে মোস্তফা জিকোর গোলে ব্যবধান দ্বিগুণ করে মিসর (২—০)। এই পরিস্থিতি আর্জেন্টিনার ভক্তদের ক্রমশই হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। এই খেলার শেষের দিকে আর্জেন্টিনা ৭৯ মিনিটের সময় প্রথম গোল করে, তার পর ৮৩ মিনিটের সময়ে আর্জেন্টিনা দ্বিতীয় গোলটি করে খেলায় সমতা নিয়ে আসে এবং আবারও বিস্ময়করভাবে ৯২ মিনিটের (অতিরিক্ত সময়ে) শেষের গোলটি করে আর্জেন্টিনা তার দেশ ও দলকে ফিরিয়ে আনে বিজয়ের বৃত্তে। হয়তো কেউ কেউ আর্জেন্টিনার এই বিজয়কে পছন্দ করবেন না বিভিন্ন কারণে, এদের মধ্যে ব্রাজিল সমর্থকও রয়েছেন। আমি নিজেও ব্রাজিলেরই সমর্থক ছিলাম। কিন্তু ব্রাজিলের পরই আমার পছন্দের দল ছিল আর্জেন্টিনা। অনেকেই রেফারির বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কেও প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, আবার কেউ কেউ হয়ত সম্পূর্ণ ধর্মীয় কারণে মিশরের অন্ধ সমর্থক ছিলেন। কিন্তু ধর্মের সঙ্গে খেলা কিংবা রাজনীতি অথবা যে কোনো জাগতিক ব্যাপারকে আমি একাত্ম করে দেখার পক্ষপাতি নই। সুতরাং মিশর কিংবা যে কোনো দেশকে তার ধর্মের কারণে সমর্থন কিংবা বিরোধিতা করার কোন যুক্তি আমি খুঁজে পাই না। আমি বরঞ্চ আর্জেন্টিনার এই বিজয়কে প্রতীকী অর্থে দেখতে চাই।
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাওয়ার ঘটনা কেবল মাত্র খেলার মাঠে ঘটে না, ঘটে রাজনীতির মাঠেও। ২০২৪ সালের জুলাই—আগস্টে সেই রকমই এক ঘটনা বাঙালি বিমূঢ় বিস্ময়ে দেখেছে। রাজনৈতিক পালা বদলের পাশাপাশি যে দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বিন্যাস করার ঘটনা সেই সময় শুরু হয়েছিল সেটি আমাদের সকলকেই বিস্মিত করেছে এবং ক্ষুব্ধও করেছে। কিন্তু এই ফুটবল ম্যাচের প্রথমার্ধের মতো বাংলাদেশের মানুষ কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। স্বাধীনতার ইতিহাসকে চব্বিশের আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করা, জুলাইয়ের আন্দোলকারীদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ বলে মুক্তিযোদ্ধাদের সমান্তরালে নিয়ে আসা, এ সব কিছুর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ বার বার ফুঁসে উঠেছে। কিন্তু ফুটবল ম্যাচের প্রথমার্ধের মতই প্রথম প্রথম প্রতিকূলতার কারণে বাংলাদেশের মানুষ এগিয়ে যেতে পারেনি। ঠিক এই ৭ জুলাইয়ের ফুটবল ম্যাচে আর্জেন্টিনা দলের মতোই বাংলাদেশের মানুষ ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এখনও হয়ত বিজয় আসেনি কিন্তু বিজয়ের পথেই এগুচ্ছে দেশের মানুষ। এক সময়ে যারা চব্বিশের কথিত ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিল, তারা ক্রমশই সেখান থেকে বেরিয়ে আসছে। কারণ তারা বুঝতে পারছে এ কেবল একটি বিশেষ সরকার সরানোর আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল পাকিস্তানি মতবাদে দেশের মানুষের মগজ ধোলাইয়ের এক পাঁয়তারা। সৌভাগ্যবশত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এ সত্যটি অনুধাবন করেছে। অনুধাবন করেছে আন্দোলনের শীর্ষে থাকা লোকজনও, যারা পরবর্তীতে এনসিপি বলে একটি দলও গঠন করে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এই আন্দোলকারী দল এনসিপি’র দুর্বল অবস্থান প্রমাণিত হয়েছে। গত সপ্তাহে এনসিপি সাভারে জুলাই উদযাপন করতে গিয়ে তাদের নিজেদের লোকদের দ্বারাই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। সেখানে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। কোনো রকমের আক্রমণকেই সমর্থন করা যায় না, সহিংস হামলাকে তো নয়ই। তাই কোনো রাজনৈতিক দলের সভায় এই ককটেল বিস্ফোরণ সমর্থযোগ্য বিষয় নয়। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে নিয়তির চাকা ধীরে ধীরে ঘুরছে। যারা এক সময় সরকার বদলের আন্দোলনে এগিয়ে এসেছিল তাদের অনেকেই যখন অনুধাবন করলো যে এই আন্দোলনের পেছনে ঘাপটি মেরে আছে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা তখন তারা যে কেবল এই আন্দোলনকারীদের খপ্পর থেকে বেরিয়ে এসেছে তাই নয়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানও গ্রহণ করেছে।
সম্প্রতি এই এনসিপি দলের প্রধান নাহিদ ইসলাম এই ঘটনার জন্য সরকারকে দায়ী করেছেন। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে যে সরকার তো এনসিপি বিরোধী নয়, সরকার তো এনসিপিকে সহযোগিতা দিয়েছে, জামায়েতে ইসলামির মতো আনুষ্ঠানিক বিরোধী দল করে রেখেছে। পরিহাসের ব্যাপার হলো, যে সরকারকে তিনি দোষারোপ করছেন সেই সরকারের কাছ থেকে আবার রক্ষা কবচ চাইছেন নাহিদ। বলছেন তাদের এনসিপি’র সভার সময় সরকারের তরফ থেকে যেন তাদের পুলিশ এবং সৈন্য দিয়ে পাহারা দেয়া হয়। এই যদি হয় এনসিপি’র বর্তমান হাল তাহলে আগামীতে কি হতে পারে? তারা যখন বলেন সেই আর্জেন্টিনার অবস্থার মতো মুক্তিযুদ্ধের স্পৃহা কুপোকাত হয়ে গেছে তারা তেমনই বোকার স্বর্গে বাস করেন, যেমনটি এক সময়ে মিশর মনে করেছিল যে আর্জেন্টিনা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবেই না। ঠিক তেমনটিই মনে করেছিলেন মিশরের সমর্থকরাও। কিন্তু আমরা তো স্বচক্ষেই দেখলাম ঘটনাটি। খেলার বিষয়টি কেবলই উপমা। কিন্তু রাজনীতিতেও খেলা আছে। সেটি ওবায়দুল কাদেরের বলা, ‘খেলা হবে’ জাতীয় বহুল আলোচিত বা সমালোচিত কোনো কথা নয়। রাজনীতির এই খেলা সম্ভবত বড় মাপের। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য প্রতিবাদ সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে বিস্তৃত হয়েছে বাংলাদেশে, তাতে আওয়ামী সমর্থকরা আশা করছেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। আর এই আশাবাদের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে আওয়ামী লীগ নেত্রীর এই বক্তব্যও, যে তিনি এ বছরই বাংলাদেশে ফিরে যাবেন। যদি বাস্তবেই তিনি বাংলাদেশে ফিরে যেতে পারেন, তাহলে ইতিহাসের ওপর যে রিসেট বোতামটা টেপা হয়েছিল, তার বিপরীত বোতামে চাপ পড়বে। তাছাড়া শেখ হাসিনা যে প্রত্যয়ের সঙ্গে দেশে ফেরার কথা বলেছেন, তাতে অনেক বিশ্লেষকই বলছেন যে তাঁর মৃত্যুদন্ডের রায়টি কার্যকর করা সম্ভব নাও হতে পারে, বড়জোর এ নিয়ে আইনী লড়াই অব্যাহত থাকতে পারে, হতে পারে আবেদন, পাল্টা আবেদন।
আসলে প্রতীকী অর্থে বৃহত্তর পরিমাপে রাজনীতিও এক খেলার মাঠ, সেখানে প্রথমার্ধের ফলাফলই চূড়ান্ত নয়। দেখা যাক দ্বিতীয়ার্ধে কী হয়!
