ইতিহাস, উত্তরাধিকার ও নৈতিকতা || ড. দীপেন ভট্টাচার্য

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর হলো। গত একশ বছর ধরে পৃথিবীতে রাজনৈতিক অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় একচ্ছত্রভাবে তার প্রভাব বজায় রেখেছে। কিন্তু ঠিক কখন থেকে এই উত্থান শুরু হয়? নিশ্চয় সেরকম কোনো নির্দিষ্ট বছর নির্ধারণ করা সম্ভব নয়, তবে আমার মনে হয় ১৮৯৮ সালটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ওই বছর দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেÑপ্রথমত, আনুষ্ঠানিকভাবে হাওয়াই যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়; দ্বিতীয়ত, স্পেনকে পরাজিত করে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনস, গুয়াম পুয়ের্তোরিকোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। হাওয়াই ফিলিপাইনস পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়ামুখী সামরিক বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের ভিত্তি গড়ে দেয়।

তবে ১৮৯৮ হঠাৎ করে আসেনি। এই সামরিক ভূরাজনৈতিক অভ্যুদয়ের পেছনে ছিল কয়েক দশকব্যাপী অর্থনৈতিক উত্থানের ইতিহাস। ১৮৬৫ সালে মার্কিন গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে পরের তিন দশক (১৮৬৫১৮৯৮) ধরে যুক্তরাষ্ট্র কৃষিনির্ভর দেশ থেকে অন্যতম বড় শিল্পশক্তিতে পরিণত হয়। এই শিল্পায়নের ভিত্তি ছিল রেলপথ, ইস্পাত, তেল, কয়লা, এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা। 

এই সময়ে বড় কর্পোরশনগুলো এই প্রক্রিয়ায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। জন ডি. রকেফেলারের স্ট্যান্ডার্ড অয়েল নামের তেল কোম্পানি, অ্যান্ড্রু কার্নেগির বিশ্বের বৃহত্তম ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কার্নেগি স্টিল কোম্পানি, বিশ্বের বৃহত্তম রেলওয়ে কোম্পানিগুলোর একটি পেনসিলভেনিয়া রেলরোড। এছাড়া ব্যাংকিং খাতে ছিল জে. পি. মরগান অ্যান্ড কোম্পানি। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এই চারটি প্রতিষ্ঠানই হলো উনিশ শতকের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পায়ন, আর্থিক শক্তি বৈশ্বিক উত্থানের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক।

গৃহযুদ্ধের ঠিক পরের সময়টি, ১৮৬৫ থেকে ১৮৭৭ সাল পর্যন্ত, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস পুনর্গঠন পর্ব (জবপড়হংঃৎঁপঃরড়হ) নামে পরিচিত। মুক্তিপাওয়া দাসদের অধিকার সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য তখন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী গৃহীত হয়। ১৮৬৫ সালের ১৩তম সংশোধনী দাসপ্রথা বিলোপ করে; ১৮৬৮ সালের ১৪তম সংশোধনী যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী সকলকে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, আর ১৮৭০ সালের ১৫তম সংশোধনী ঘোষণা করে আগে দাস ছিল এমন কারণে কোনো নাগরিকের ভোটাধিকার অস্বীকার করা যাবে না।

কিন্তু আমরা জানি বাস্তব ইতিহাস ছিল অনেক বেশি জটিল। সংবিধানে অধিকার স্বীকৃত হলেও সেই অধিকার কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। এটি যেমন কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য সত্যি, একইভাবে আদিবাসী আমেরিকান ট্রাইবদের জন্যও সত্যি। ১৮৭৭ সালে যখন পুনর্গঠন পর্ব শেষ হলো তখন দক্ষিণের বহু স্টেটে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী রাজনীতি আবার শক্তিশালী হয়ে উঠল। সেখানে সরাসরি দাসপ্রথা ফিরিয়ে আনা গেল না, কিন্তু নানা আইন, প্রশাসনিক কৌশল সামাজিক সন্ত্রাসের মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের রাজনৈতিক অধিকার বঞ্চিত করা হলো।

এই ব্যবস্থাই পরে জিম ক্রো আইন নামে পরিচিত হয়। ভোটাধিকার বাধাগ্রস্ত করার জন্য সাক্ষরতা পরীক্ষা, ভোটকর (পোল ট্যাক্স), জটিল নিবন্ধননিয়ম, ভয় দেখানো, এবং সরাসরি সহিংসতা ব্যবহার করা হয়। ফলে সংবিধান কাগজে কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকদের স্বাধীনতা, নাগরিকত্ব ভোটাধিকার দিলেও বাস্তবে দক্ষিণের বহু অঞ্চলে তারা দীর্ঘদিন সেই অধিকার থেকে কার্যত বঞ্চিত থাকে। শুধু তাই নয়, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য বজায় রাখতে ১৮৯০এর দশক থেকে ১৯৩০এর দশক পর্যন্ত দক্ষিণে শত শত কৃষ্ণাঙ্গকে বিচারবহির্ভূতভাবে গণপিটুনি ফাঁসির মাধ্যমে হত্যা (লিঞ্চিং) করা হয়।

এই পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হতে বহু দেরি হয়। ১৯৫০ ১৯৬০এর দশকের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের (ঈরারষ জরমযঃং গড়াবসবহঃ) ফলে ১৯৬৪ সনে ঈরারষ জরমযঃং অপঃ এবং ১৯৬৫ ঠড়ঃরহম জরমযঃং অপঃ ড়ভ ১৯৬৫ পাস হয়। প্রথম আইনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন, হোটেল, রেস্তোরাঁসহ জনজীবনের নানা ক্ষেত্রে আইনগত বর্ণবৈষম্য শেষ করে, আর দ্বিতীয় আইনটি সাক্ষরতা পরীক্ষা, বৈষম্যমূলক ভোটনিবন্ধন অন্যান্য কৌশলের মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার খর্ব করার প্রথা বন্ধ করে; অধিকারগুলোকে স্টেটের বদলে কেন্দ্রীয় ফেডারেল সরকারের সুরক্ষার অধীনে নিয়ে আসা হয়।

নাগরিক অধিকার আন্দোলন যে সফল হলো তার একটি রাজনৈতিক অভিঘাত হলো রিপাবলিকান ডেমোক্রেটিক পার্টির চরিত্র বদল। উনিশ শতকে দাসপ্রথা বিলোপের নেতৃত্ব দিয়েছিল রিপাবলিকান পার্টি। কিন্তু এক শতাব্দী পরে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসনের উদ্যোগে নাগরিক অধিকারের বিলগুলো পাস হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় দক্ষিণের বহু রক্ষণশীল শ্বেতাঙ্গ ডেমোক্রেটিক পার্টি ত্যাগ করে রিপাবলিকান পার্টির দিকে ঝুঁকে পড়ে। রিপাবলিকান পার্টি ক্রমশ রক্ষণশীল হয়ে পড়ে। পরবর্তী কয়েক দশক ধরে এরকম সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থানে এমন এক পুনর্বিন্যাস ঘটল যার ফলে দক্ষিণাঞ্চল ডেমোক্র্যাটদের ঐতিহ্যগত ঘাঁটি থেকে রিপাবলিকানদের অন্যতম শক্তিশালী অঞ্চলে পরিণত হলো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি নির্বাহী আদেশ নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অর্জনকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। বলাই বাহুল্য রিপাবলিকান পার্টির একটি বড় অংশের সমর্থন ট্রাম্পের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

এখানে আবার একটু পেছনে ফিরতে চাই। ১৮৬০এর দশকের গৃহযুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন দাসপ্রথা বিলোপের আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন, কিন্তু একই সময়ে আদিবাসী আমেরিকান জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখেন। একটি উদাহরণ দেবÑ ১৮৬২ সালের ডাকোটা যুদ্ধের পর ৩০৩ জন ডাকোটা যোদ্ধার মৃত্যুদন্ডের আদেশ লিংকনের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। লিংকন অধিকাংশের সাজা কমিয়ে দিলেও ৩৮ জনের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখেন এবং এদের একযোগে ফাঁসি দেওয়া হয়। গৃহযুদ্ধ শেষে পশ্চিমমুখী সম্প্রসারণ আরও ত্বরান্বিত হয়, পরপর বহু আমেরিকানইন্ডিয়ান যুদ্ধ সংঘটিত হয়, আদিবাসীদের বিপুল পরিমাণ ভূমি দখল করা হয়, তাদের বাসভূমি থেকে উৎখাত করে রিজারভেশনে নেওয়া হয়। একদিকে কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের আইনি মুক্তি, অন্যদিকে একই সময়ে নেটিভ আমেরিকান জনগোষ্ঠীর ভূমিহরণ এই দ্বৈত বাস্তবতাই উনিশ শতকের মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম জটিল পরস্পরবিরোধী অধ্যায়।

কোনো সমাজের অতীত নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হইÑ বর্তমানের মানুষ সেই অতীতের কতখানি নৈতিক দায় বহন করে? এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক অভিবাসী সমাজের জন্য। আমি প্রায়ই অভিবাসীদের মুখে দাসপ্রথার অমানুষিকতা, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমিহরণ ধ্বংস, কিংবা মেক্সিকোর বিশাল অঞ্চলÑটেক্সাস, নিউ মেক্সিকো, অ্যারিজোনা ক্যালিফোর্নিয়া অধিগ্রহণের অন্যায্যতার সমালোচনা শুনি। তাঁরা অবশ্য ভুলে যায় যে, তাঁদের নিজের মার্কিন দেশে আগমনও পরোক্ষভাবে সেই ইতিহাসের ওপরই প্রতিষ্ঠিত। যে বিশাল অর্থনীতি তাঁদের আকৃষ্ট করেছে, যে বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রন্থাগার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান সামাজিক সুযোগসুবিধা তাঁদের এখানে নিয়ে এসেছে, তার ভিত্তি গড়ে উঠেছিল উনিশ শতকের শিল্পায়ন, পশ্চিমমুখী সম্প্রসারণ এবং ভূখন্ড বিস্তারের ওপর। রকেফেলার, কার্নেগি কিংবা জে. পি. মরগান যে অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছেন সেটি এই ইতিহাসেরই অংশ। সেই ইতিহাস সম্পূর্ণ ভিন্ন হলে আজকের যুক্তরাষ্ট্রও ভিন্ন হতো, এবং হয়তো অভিবাসনের সুযোগও সৃষ্টি হতো না, আমরাও এখানে থাকতাম না। 

অবশ্য আমি এটা বলছি না যে, আজকের অভিবাসীরা অতীতের অন্যায়ের জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়ী। বরং প্রশ্নটি হলো, অন্যায়ের উত্তরাধিকার থেকে আমরা কতখানি উপকৃত হচ্ছি, এবং সেই সুবিধা ভোগ করতে গিয়ে সেই ইতিহাসকে কতখানি স্বীকার করছি। অনেক নতুন অভিবাসী মুখে ইষধপশ খরাবং গধঃঃবৎ সমর্থন করেন, কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকায় বসবাস করতে চান না কিংবা তাঁদের সন্তানদের সেখানকার বিদ্যালয়ে পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করেন। নেটিভ আমেরিকানদের দুর্দশা নিয়ে সহানুভূতি প্রকাশ করেন, কিন্তু তারা কারা, তাদের ইতিহাস কী, কিংবা আজ তারা কী অবস্থায় আছেÑএসব জানার আগ্রহ দেখান না।

এই প্রসঙ্গে দস্যু রত্নাকরের কাহিনী উল্লেখ করা যেতে পারে। বলা হয়ে থাকে, রত্নাকর দস্যুবৃত্তি করে পরিবারের ভরণপোষণ করতেন। একদিন ঋষি নারদ তাঁকে প্রশ্ন করলেন, যাদের জন্য তিনি এই পাপ করছেন, তারা কি তাঁর পাপের ভাগ নেবে? রত্নাকর বাড়ি গিয়ে পিতা, মাতা, স্ত্রী পরিবারের অন্যদের একই প্রশ্ন করেন। সবাই উত্তর দেয়Ñ তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব রত্নাকরের, কিন্তু সেই অর্থ কোথা থেকে এসেছে বা তার পাপের দায় তারা নেবে না। এই উপলব্ধির পর রত্নাকর তপস্যায় বসেন এবং পরবর্তীকালে ঋষি বাল্মীকি নামে পরিচিত হন। ঐতিহ্য অনুযায়ী, তিনিই মহাকাব্য রামায়ণের রচয়িতা।

অবশ্য রত্নাকরের পরিবারের সঙ্গে আধুনিক অভিবাসীদের তুলনা হুবহু এক নয়। রত্নাকরের পরিবার জানত যে তারা তাঁর দস্যুবৃত্তির অর্থে জীবিকা নির্বাহ করছে; কিন্তু বর্তমান অভিবাসীরা অতীতের অন্যায়ে ব্যক্তিগতভাবে অংশ নেননি। তাই এখানে প্রশ্নটি অপরাধে অংশীদার হওয়ার নয়, বরং অন্যায়ের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের নবহবভরপরধৎু হওয়ার। আমরা প্রত্যেকেই এমন এক সমাজের সুফল ভোগ করি, যার ইতিহাসে গৌরব যেমন আছে, তেমনি রয়েছে অন্যায় সহিংসতার অধ্যায়ও। সেই ইতিহাস অস্বীকার করে শুধু তার সুফল ভোগ করা নৈতিকভাবে যথেষ্ট নয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে অভিবাসীদের নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখা উচিত। আমরা যে দেশটির সুযোগসুবিধা, শিক্ষা কর্মসংস্থানের সুফল ভোগ করছি, সেই দেশটির ইতিহাস জানার, তার অর্জন ব্যর্থতাÑ উভয়কেই স্বীকার করার, এবং তাকে আরও ন্যায়ভিত্তিক মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বও কি আমাদের ওপর বর্তায় না? আমি অনেক অভিবাসীকেই দেখি এই দেশের প্রায় সব সুযোগসুবিধা ভোগ করলেও, মানসিকভাবে এই দেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে নিজেদের গভীরভাবে সম্পৃক্ত বলে মনে করেন না। যেন যুক্তরাষ্ট্র তাঁদের কাছে একটি বাসস্থান বা কর্মস্থল, এই দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের কোনো ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা নেই। অথচ ইতিহাসের সুবিধা ভোগ করার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের একটি অসমাপ্ত নৈতিক দায়িত্ব রয়ে যায়; ভবিষ্যৎ নির্মাণে সক্রিয় অংশ নেওয়াও সেই দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।


Related Posts