বিয়ে করলেন টেইলর সুইফট
সব জল্পনা—কল্পনার অবসান। পূর্ব ঘোষিত তারিখেই এক সুতোয় বাঁধা পড়লেন বিশ্বখ্যাত পপ তারকা টেইলর সুইফট ও মার্কিন ফুটবল তারকা ট্রাভিস কেলসি। ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে বিনোদন ও ক্রীড়া জগতের তারকাদের উপস্থিতিতে অত্যন্ত জমকালো আয়োজনে তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। সুইফটের জনসংযোগ কর্মকর্তা ট্রি পেইন ৩ জুলাই এই বিয়ের খবর নিশ্চিত করেন। জানা গেছে, প্রচলিত বিয়ের রীতি ভেঙে এই তারকা যুগল কোনো ‘ব্রাইডসমেইড’ (কনের সখী) বা ‘গ্রুমসমেন’ (বরের বন্ধুদল) রাখেননি। কোনো রকম আনুষ্ঠানিক বন্ধুদল ছাড়াই তারা বিয়ের মূল পর্বটি সারেন। বিনোদন অঙ্গনে এই আয়োজনকে অনেকেই ‘শতাব্দীর সেরা বিয়ে’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। অনুষ্ঠানে হলিউড ও ক্রীড়া জগতের খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকায় ছিলেন টম ব্র্যাডি, স্টিভেন স্পিলবার্গ, হিউ গ্রান্ট, ক্রিস রক, ব্র্যাডলি কুপার, জিজি হাদিদ, জেসন সুডেকিস এবং বেনসন বুনের মতো তারকারা। কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখতে ভেন্যুর চারপাশে কালো এসইউভি গাড়ি ও বিশাল তাঁবু দিয়ে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়। তবে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের বাইরে বড় পর্দায় ভেসে ওঠা ‘জাস্ট অ্যান্ড টি ম্যারিড’ লেখাটি। এখন পর্যন্ত নবদম্পতির কোনো যুগল ছবি প্রকাশ্যে আসেনি। তবে টেইলরের মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিশেষ এই দিনটিতে তারা বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি ফ্যাশন হাউস ‘ক্রিশ্চিয়ান ডিওর’—এর পোশাক পরেছিলেন। পোশাকটির নকশা তৈরিতে সরাসরি যুক্ত ছিলেন ডিওরের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর জোনাথন অ্যান্ডারসন। এছাড়া তাদের জুতো ছিল নামী ব্র্যান্ড ‘ক্রিশ্চিয়ান লুবোটিন’—এর এবং টেইলর সুইফট সেজেছিলেন ‘কার্টিয়ার’ ব্র্যান্ডের অভিজাত গহনায়।
এই মেগা ইভেন্টকে কেন্দ্র করে ম্যানহাটনের ব্যস্ততম বেশ কয়েকটি সড়ক সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে সময় নিউইয়র্কের তাপমাত্রা ছিল প্রায় ১০০ সেলসিয়াস। কিন্তু তীব্র তাপদাহ উপেক্ষা করেই প্রিয় তারকা যুগলকে একনজর দেখতে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের বাইরে জড়ো হন হাজার হাজার ভক্ত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বেশ বেগ পেতে হয় এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
ব্রেসলেট থেকেই শুরু
২০২৩ সালের জুলাই। টেইলর সুইফট তখন তাঁর বহুল আলোচিত ‘ইরাস ট্যুর’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যস্ত। সেই সময় কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে কনসার্ট দেখতে যান ট্রাভিস কেলসি। কনসার্ট শেষে টেইলরের হাতে নিজের ফোন নম্বর লেখা একটি ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রেসলেট’ তুলে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কনসার্টের পর কণ্ঠ বিশ্রামে থাকায় টেইলর দর্শকদের সঙ্গে দেখা করেননি। পরে নিজের ‘নিউ হাইটস’ পডকাস্টে ট্রাভিস অকপটে সেই ব্যর্থ চেষ্টার কথা জানান।
মজার ছলে বলা সেই গল্পই অপ্রত্যাশিতভাবে ভাইরাল হয়ে যায়। পরে টেইলর নিজেই স্বীকার করেন, ট্রাভিসের সেই খোলামেলা আচরণ তাঁর নজর কেড়েছিল। বিষয়টি তাঁর কাছে অনেকটা পুরোনো দিনের রোমান্টিক সিনেমার দৃশ্যের মতো মনে হয়েছিল।
মাঠে গিয়ে ভালোবাসার প্রকাশ
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে একসঙ্গে দেখা যায় দুজনকে। টেইলর সুইফট উপস্থিত হন কানসাস সিটি চিফসের খেলায়। তিনি বসেছিলেন ট্রাভিসের মা ডোনা কেলসির পাশে।
খেলায় ট্রাভিস টাচডাউন করার পর টেইলরের উচ্ছ্বাস ক্যামেরায় ধরা পড়ে। ম্যাচ শেষে দুজনকে একসঙ্গে স্টেডিয়াম ছাড়তেও দেখা যায়। সেই মুহূর্ত থেকেই কার্যত প্রকাশ্যে আসে তাঁদের সম্পর্ক।
টেইলরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এতটা প্রকাশ্য অবস্থান খুব কমই দেখা গেছে। তাই ভক্তদের কাছেও এটি ছিল একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে টাইম সাময়ীকিতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে টেলর প্রথমবার প্রকাশ্যে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন। একই মাসে বড়দিন একসঙ্গে উদ্যাপন করেন।
ভালোবাসার বার্তা পৌঁছে গেল গানের কথায়
কয়েক মাস পর আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত ইরাস ট্যুরের এক কনসার্টে হাজির হন ট্রাভিস। সেই অনুষ্ঠানে টেইলর তাঁর জনপ্রিয় গান ‘কারমা’—এর একটি লাইন বদলে দেন। মূল গানের পরিবর্তে তিনি গেয়ে ওঠেন—‘কারমা ইজ দ্য গাই অন দ্য চিফসৃ’
হাজারো দর্শকের সামনে ট্রাভিসকে উদ্দেশ করে করা এই পরিবর্তন মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কনসার্ট শেষে টেইলর দৌড়ে গিয়ে ট্রাভিসকে আলিঙ্গন করেন। সেই ভিডিও আজও ভক্তদের কাছে সম্পর্কটির অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
সুপার বোলে আলোচনার কেন্দ্র
২০২৪ সালের শুরুতে সম্পর্কটি আরও বেশি আলোচনায় আসে। কানসাস সিটি চিফস সুপার বোলে ওঠার পর টেইলর মাঠে নেমে ট্রাভিসকে অভিনন্দন জানান। পরে টোকিওতে কনসার্ট শেষ করেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে সুপার বোল ফাইনাল দেখতে যান। চিফস চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর মাঠে দুজনের আলিঙ্গন ও চুম্বনের ছবি বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, টেইলরের উপস্থিতির কারণে এনএফএলের নারী দর্শকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।
টেইলরের গানেও এল সম্পর্কের ছাপ
২০২৪ সালে প্রকাশিত টেইলরের অ্যালবাম ‘দ্য টর্চার্ড পোয়েটস ডিপার্টমেন্ট’—এর কয়েকটি গানে ভক্তরা ট্রাভিসের উপস্থিতি খুঁজে পান। বিশেষ করে ‘দ্য আলকেমি’ গানটিকে অনেকেই তাঁদের সম্পর্কের প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। সুপার বোল জয়ের পর ট্রাভিসের ট্রফি হাতে টেইলরের দিকে ছুটে যাওয়ার দৃশ্যের সঙ্গে গানের কিছু লাইন মিলিয়ে দেখেন ভক্তরা। এই সময় থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের জুটির নতুন নাম হয়ে যায় ‘টেভিস’।
লন্ডনে একসঙ্গে মঞ্চে
২০২৪ সালের জুনে লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ইরাস ট্যুরের একটি অনুষ্ঠানে প্রথমবার ইনস্টাগ্রামে যুগল ছবি প্রকাশ করেন টেইলর। ছবিতে তাঁদের সঙ্গে ছিলেন ব্রিটিশ যুবরাজ উইলিয়াম এবং তাঁর দুই সন্তান। পরদিন কনসার্টে আরও বড় চমক দেন ট্রাভিস। তিনি অতিথিশিল্পী হিসেবে মঞ্চে উঠে টেইলরের পারফরম্যান্সের অংশ হন। এটি ছিল তাঁর প্রথম এবং শেষ মঞ্চ উপস্থিতি হলেও ইউরোপ সফরের বড় অংশেই তিনি টেইলরের সঙ্গে ছিলেন।
প্রচারের আলোয় থেকেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক
টেইলর সুইফটের মতো জনপ্রিয় শিল্পীর সঙ্গে সম্পর্কে থাকা যে কতটা চাপের, সে বিষয়ে ট্রাভিসের বড় ভাই জেসন কেলসিও কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, সাধারণ মানুষের মতো জীবন যাপন করা এই জুটির জন্য সহজ নয়। প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি ছবি, প্রতিটি উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। তবু তাঁর মতে, ট্রাভিস নিজের স্বভাব বদলাননি। সাফল্য ও আলোচনার মধ্যেও তিনি আগের মতোই সাধারণ ও বিনয়ী রয়েছেন।
বাগ্দানের ঘোষণা
২০২৫ সালের আগস্টে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যৌথ পোস্ট দিয়ে বাগ্দানের খবর জানান টেইলর ও ট্রাভিস। এর পর থেকেই তাঁদের বিয়ে নিয়ে জল্পনা আরও বেড়ে যায়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সম্ভাব্য অনুষ্ঠান, অতিথিতালিকা ও পরিকল্পনা নিয়ে নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে দুজনই এ বিষয়ে খুব সংযত থেকেছেন। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি মন্তব্য করেননি।
